কেবল ২য় দফা নয়, নন্দীগ্রাম একুশের বিধানসভা ভোটের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এখানে লড়াই প্রেস্টিজের; যার মাত্রা বাকি ২৯৩ টি আসনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ২০১১ সালে বাংলার রাজনীতিতে পালা বদল ঘটিয়েছিল যে নন্দীগ্রাম, এক দশক পর সেই নন্দীগ্রামই হতে পারে নিয়ন্ত্রক।
উল্লেখ্য; শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগদানের পর পূর্ব মেদিনীপুরের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই ঘোষণা করেন নন্দীগ্রামে তিনিই প্রার্থী হবেন। সেদিন দক্ষিণ কলকাতায় কার্যত মমতার গড়ে জনসভা করেন পালটা শুভেন্দু জানান, মমতার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তিনি নন্দীগ্রামে সভা করে দেবেন।
২০০৭-এর ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিখোঁজ হয়েছিলেন বেশ কিছু মানুষ। তারপর থেকেই নন্দীগ্রামকে রাজ্য রাজনীতির প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছিলেন মমতা। সেদিন তাঁর প্রধান সেনাপতি ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
২০১১-র পর রাজ্যে একটি বিধানসভা ও দুটি লোকসভা নির্বাচনে মমতা পূর্ব মেদিনীপুরে কেবল শুভেন্দু নন গোটা অধিকারী পরিবারকেই সব ক্ষমতা সঁপে দিতেন। এমনকি সভা করলেও শুভেন্দুকেই সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এবার সেই শুভেন্দু বিজেপির হয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে নন্দীগ্রাম চ্যালেঞ্জও বটে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যোগ হবে আরও কয়েকটি শব্দবন্ধ। মমতা দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ ৫০ বছর পর মেদিনীপুর থেকে ভোটে লড়ছেন। তাঁর আগে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন-এ মেদিনীপুরের তমলুক কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। তিনি এ রাজ্যের প্রথম অকংগ্রেসি ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি রাজ্যের চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী হন, উপমুখ্যমন্ত্রী হন জ্যোতি বসু। একাধিক কারণ সেই সরকার এক বছর কালও টেকেনি। অজয় মুখোপাধ্যায় অন্তর্বর্তী নির্বাচনেও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
স্বাধীন দেশে ১৯৫২ সালে দেশের প্রথম সাধারণ উপনির্বাচনে অজয় মুখোপাধ্যায়কে জাতীয় কংগ্রেস তমলুক বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করে। সেই ভোটে তিনি লড়েছিলেন নিজের ভাই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। ভোটে জিতে অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সেচ ও জলপথ বিভাগের মন্ত্রী হন।
তারও আগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তমলুকে ১৯৪২-এর ১৭ ডিসেম্বর ‘মহাভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ ঘোষণা করেছিলেন। অজয় মুখোপাধ্যায় ছিলেন তার অন্যতম কান্ডারি। তাম্রলিপ্ত সরকারের সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে তিনি হন দ্বিতীয় সর্বাধিনায়ক। পরে অবশ্য তিনিও গ্রেফতার হন।
অজয় মুখোপাধ্যায় নিজের সরকারকে ‘অসভ্যের সরকার’ আখ্যা দিয়ে ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলা কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে কার্জন পার্কে অনশন সত্যাগ্রহে বসেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার উন্নতি না হলে ছেঁড়া জুতোর মতো মন্ত্রিত্ব ছেড়ে চলে যাব। তবুও আদর্শভ্রষ্ট হব না’। পদত্যাগ করে বেতার ভাষণে বলেছিলেন, ‘এই অবস্থায় গদি আঁকড়ে থাকার চেষ্টা মানে জনসাধারণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা’।
তমলুক ছাড়াও অজয় মুখোপাধ্যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বরানগর কেন্দ্র থেকে। ১৯৭১ সালে এই কেন্দ্রে তিনি লড়েছিলেন নিজের মন্ত্রিসভার উপমুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে। তবে বরানগর কেন্দ্রে তিনি জ্যোতি বসুর কাছে পরাজিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, কিন্তু সেবারও সরকারের পতন হয় দ্রুত। মাত্র ৮৩ দিনে। এরপর অজয় মুখোপাধ্যায় ফিরে গিয়েছিলেন কংগ্রেসে।
১৯৭২ সালে ফের তাঁকে তমলুক থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী করা হয়। সেবারও তিনি জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক কাজকর্ম থেকে অজয় মুখোপাধ্যায় ক্রমশ সরে যাচ্ছিলেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে স্বাধীনতা আন্দোলনের সহযোদ্ধা সতীশ সামন্ত সুশীলকুমার ধাড়ার কাছে পরাজিত হলে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন।
পাঁচ দশক পর একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেদিনীপুরের মাটি থেকে ফের ভোটের লড়াইয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল দলনেত্রী। গত ১৮ জানুয়ারি দু-দিনের জেলা সফরে নন্দীগ্রামের জনসভামঞ্চ থেকে ওই কেন্দ্রে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণা করার পর থেকেই জোর জল্পনা শুরু হয় রাজ্য রাজনীতির ময়দানে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে মেদিনীপুরে মুখ্যমন্ত্রী আস্থাভাজন শুভেন্দু যাতে বেশি সুবিধা না করতে পারে তার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত। শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নিজে লড়াইতে নেমে যাওয়ায় দল বাড়তি শক্তি পাবে বলেও মনে করছেন অনেকে। আসল কথা হল বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে ইতিহাস সমৃদ্ধ মেদিনীপুর, বাংলার রাজনৈতিক পালা বদলে স্মরণীয় নন্দীগ্রাম থেকে দ্বিতীয় বার কোনও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে জয়ী হলে তা বাংলার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
একটু ইতিহাসের পাতা উলটেই জ্যোতিষীদের মতো বলে দিলেন নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বাংলায় নতুন ইতিহাস রচনা
করবেন-এটা কি একটা রাজনৈতিক লেখা হল?
আপনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত থেকেও বলছি জেলা হিসাবে মেদিনীপুর পরে নন্দীগ্রাম ১ ও ২ এবং তার
পরবর্তীতে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর একটু গোলমাল বেঁধেছে।
রাজনীতির লেখা কিন্তু একটু অন্যভাবে দেখা-ভাবা, ভালো লাগলো পড়তে।
তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২১০ তম আসন হল নন্দীগ্রাম। ১৯৬৭ সালের আগে পর্যন্ত ছিল
নন্দীগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুটি কেন্দ্র। ১৯৬৭ সাল থেকে নন্দীগ্রাম উত্তর এবং নন্দীগ্রাম দক্ষিণ জুড়ে একটি কেন্দ্র হয়।
মেদিনীপুরের তমলুক কেন্দ্র থেকে জিতে অজয় মুখোপাধ্যায় রাজ্যের চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী হলেও সেই সরকার এক বছরও
টেকেনি, ফের সেই জেলার নন্দীগ্রাম থেকে যদি মুখ্যমন্ত্রী জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন; সেই সরকার
টিকবে তো, নাকি আরেকটা ইতিহাস সৃষ্টি হবে?
পালা বদলের পাঁচ দশক পর দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী পেতে ভোটের আগে পরে কেশপুর, নন্দীগ্রামে যা যা ঘটল তা কি
বাংলার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে না? তবে লেখাটি বেশ।