এ রাজ্যের দুয়ারে দাঁড়ানো বিধানসভা ভোটে এখন পর্যন্ত সব থেকে বেশি নজর কেড়েছে নন্দীগ্রাম। নন্দীগ্রাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নির্বাচন কমিশন ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি করার আগেই। ভোটযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই রাজ্য রাজনীতির উত্তাপে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ‘হটসিট’ বলে আখ্যায়িত হয়েছে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২১০ তম আসন নন্দীগ্রাম।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এই বিধানসভা কেন্দ্রটির মধ্যে রয়েছে নন্দীগ্রাম ১ এবং নন্দীগ্রাম ২-এর বিস্তীর্ণ এলাকা। স্বাধীন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকেই কেন্দ্রটি রয়েছে, তবে নন্দীগ্রাম নামটি ২০০৬ সালের আগে পর্যন্ত জেলার বাইরের মানুষের কাছে তেমন পরিচিত ছিল না। বলা যেতে পারে বাম জমানার শেষ পর্যায়ে নন্দীগ্রাম রাজ্য রাজনীতির ঐতিহাসিক আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে। বিশেষত যখন থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর নেতৃত্বাধীন বাম সরকার এখানে রসায়ন শিল্প গড়ার জন্য জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিল। যদিও নন্দীগ্রামের কপালে কোনও শিল্পই আজ পর্যন্ত জোটেনি। তবে রাজ্যপাটে পরিবর্তনের আন্দোলনে হুগলির সিঙ্গুরের মতো পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামও যে একটি স্মরণীয় নাম তা মানতেই হবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও হুগলির সিঙ্গুরের জমিবিরোধী আন্দোলনের পথ ধরেই বামফ্রন্টের ৩৪ বছর শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় এসেছিল। প্রসঙ্গত, নন্দীগ্রাম আসনটি প্রথম দখল করেছিল কংগ্রেস। তখন অবশ্য নন্দীগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুটি কেন্দ্র। ১৯৫১-৫২ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নন্দীগ্রাম উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়ী হন কংগ্রেসের সুবোধ চন্দ্র মাইতি। নন্দীগ্রাম দক্ষিণ থেকে জয়ী হন কংগ্রেসের প্রবীর চন্দ্র জানা। একটা দীর্ঘ সময় ধরে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র দুটি ছিল কংগ্রেসের দখলে। ১৯৬৭ সাল থেকে নন্দীগ্রাম উত্তর এবং নন্দীগ্রাম দক্ষিণ জুড়ে একটি কেন্দ্র হয় আর সেবারই নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৫৭ সালে নন্দীগ্রাম উত্তর কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের সুবোধ চন্দ্র মাইতি জয়ী হলেও নন্দীগ্রাম দক্ষিণ কেন্দ্রটি কংগ্রেসের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় সিপিআই। সেবার জয়ী হন ভূপাল চন্দ্র পন্ডা। কিন্তু ১৯৬২-র নির্বাচনে ফের নন্দীগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ কেন্দ্র দুটি কংগ্রেসের দখলে চলে যায়। জয়ী হন সুবোধ চন্দ্র মাইতি ও প্রবীর চন্দ্র জানা। ১৯৬৭-র নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনটি আবার দখল করে সিপিআই। জয়ী হন ভূপাল চন্দ্র পন্ডা। এরপর তিনি পরপর তিনবার ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হন। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে অবশ্য নন্দীগ্রাম আসনটি জনতা পার্টি দখল করে। সেবার জয়ী হন প্রবীর জানা।
নন্দীগ্রামের পরপর তিনবারের বিধায়ক ভূপাল চন্দ্র পন্ডা ১৯৮২তে ফের নন্দীগ্রামে জয়ী হলে আসনটি সিপিআই-এর দখলে আসে। সেই দখলদারি তারা ধরে রাখে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৭ এবং ১৯৯১ সালে অবশ্য নন্দীগ্রামে বিধায়ক হন শক্তি বল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে নন্দীগ্রাম আসনটি বামেদের হাতছাড়া হয়। সেবার এই কেন্দ্রে জয়ী হন কংগ্রেসের দেবী শঙ্কর পন্ডা। কিন্তু পরবর্তীতে বামেরা আসনটির ফের দখল নেয়, ২০০১ এবং ২০০৬ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে জয়ী হন সিপিআই প্রার্থী মহম্মদ ইলিয়াস।
কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়ার পর মহম্মদ ইলিয়াস বিধায়ক পদ ছাড়তে বাধ্য হন। ২০০৯-এর উপনির্বাচনে এই কেন্দ্রে জয়ী হন তৃণমূলের ফিরোজা বিবি। এরপর ২০১১ সালেও তিনি জয়ী হন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অবশ্য তৃণমূল ফিরোজা বিবিকে মনোনয়ন না দিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করে। শুভেন্দু অধিকারী বামফ্রন্ট প্রার্থী সিপিআইয়ের আবদুল কবীর সেখকে বহু ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। এবারও এই আসনে শুভেন্দু লড়ছেন তবে তিনি এবার বিজেপি প্রার্থী। আগেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন এই আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়লে তিনিও লড়ে দেখাবেন ও মমতাকে হারাবেন। এখন দেখার এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে কে বাজিমাত করেন।
Lekhati theke nandigram samparke anek katha janlam, thnx to tmc & pagefour
নন্দীগ্রাম কেন্দ্র নিয়ে বিস্তারিতভাবেই আলোচনা করেছেন কোনও রাজনৈতিক বিতর্ক ছাড়া, এতে অনেক তথ্য সামনে এসেছে। কিন্তু কেন কেন্দ্রটি নজর কাড়ছে তা কি বিতর্ক এড়িয়ে আলোচনা করা সম্ভব?
Lekhati khub tathya samriddha, tabe lekhak nandigram ghire rajnitir katha ektu balle valo korten.
লেখাটা ১৪মার্চ-এর কথা মাথায় রেখে না ভোটের আগে কেন্দ্রটি সম্পর্কে একটা ধারণা দিয়ে রাখা, যাই হোক ভাল লেখা, অন্য কেন্দ্র নিয়ে জানার ইচ্ছে রইল।
রাজ্যে নন্দীগ্রামের মতো গুরুতবপূর্ণ আরও কয়েকটি কেন্দ্র তো রয়েছে; সেগুলি সম্পর্কে যদি লেখেন তো খুব ভাল হয়য়। ধন্যবাদ