| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সহবাস-সম্মতি বিলে (১৮৯১) সম্মতি কি ছিল? : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

Reporter
স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ১৪৯৯ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৩

ঘটনাটি ঘটেছিল হরিমোহন মাইতির বালিকা বধূ (Child-wife) ফুলমণির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। স্বামী হরিমোহন এসেছিল শ্বশুরবাড়ি রাত কাটাতে। গভীর রাত। হঠাৎ ফুলমণির করুণ আর্তনাদে বাড়ির সকলেই জেগে ওঠে। কে আর্তনাদ করে? ফুলমণি না? ত্রস্ত পায়ে মা ছুটে যায় ফুলমণির শোবার ঘরে। গিয়ে দেখে ফুলমণির কাপড়-বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। শুয়ে ছটফট করছে ফুলমণি। একি হলো! এমন করছে কেন মেয়ে? পাশে বসে থাকা জামাই হরিমোহনকে জিজ্ঞেস করলো শাশুড়ি– ওর কি হয়েছে, বাবা? হরিমোহন নির্বাক, নিশ্চল – যেন পাথর। কোনো উত্তরই তার মুখে জোগালো না।

সে রাতেই সবাই জানলো ঘটনাটি। কোবরেজ-বদ্দি এলো বাড়িতে। কিন্তু না, ফুলমণিকে বাঁচানো গেল না। পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসের স্বামী হরিমোহনের সঙ্গে দশ-এগারো বছরের বালিকা ফুলমণির সহবাসের নিদারুণ পরিণতি। থানার দারোগা এলো। ডাইরি লিখলো। কেস উঠলো কোর্টে। সরকার বনাম স্বামী-আসামী হরিমোহন। হরিমোহনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অঋতুমতী বালিকার সঙ্গে সহবাস। হরিমোহন কাঠগড়ায় উঠে সহবাসের কথা অস্বীকার করলো। বললো, গরমের রাত। আমার স্ত্রী ফুলমণি ঘরের বারান্দায় তার বোনদের সঙ্গে ঘুমুচ্ছিল, আমার পাশে নয়। হঠাৎ গভীর রাতে সে রক্তাপ্লুত অবস্থায় ছুটে আসে ঘরে এবং আমার বিছানায় শুয়ে পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। জুরিরা আসামীর কথা বিশ্বাস করেনি। ফুলমণির মাকে সাক্ষী দিতে ডাকা হয়েছিল আদালতে। সাক্ষ্যে মা বলেছিল, তার জামাই-ই মেরে ফেলেছে তার মেয়েকে। ‘বালিকার মাতা বলিয়াছে যে, কৈবর্ত্তজাতির বালিকাদিগের যৌবনের পূর্বে স্বামীর শয়নগৃহে পাঠাইবার রীতি নাই। বালিকাটি গ্রীষ্মনিবন্ধন বারান্দায় তাহার আর দুইটি ভগিনীর সহিত শয়ন করিয়াছিল। রাত্রি দুই প্রহরের সময় চিৎকার শুনিয়া তিনি দেখিলেন, ফুলমণির স্বামীর বিছানা রক্তে ভাসিতেছে। সে ছটফট করিতেছিল।’ (নব্যভারত, শ্রাবণ ১২৯৭)।

সময়টি ইংরেজির ১৮৯১ সাল। টনক নড়লো ইংরেজ সরকারের। এ তো শুধু একজন মাত্র ফুলমণির ব্যাপার নয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোটা হিন্দু সমাজের ব্যাপার। ফুলমণি তো গোঁড়া হিন্দু সমাজের ‘চাইল্ড-ওয়াইফ’-এর প্রতীক। এগিয়ে এলেন বড়লাট লর্ড ল্যান্সডাউন। বললেন, হিন্দুসমাজে এ প্রথার সংস্কারসাধন করা উচিত। ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দের আইন সংশোধন করে সরকার তাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ‘সহবাস সম্মতির বয়স আইন’ (The Age of Consent Bill) পাস করাতে। প্রস্তাবটি তুললেন সরকারের পক্ষে স্যার এনড্র স্কোবল (Sir Andrew Scoble)। বললেন, এতদিন মেয়েদের বিয়ের বয়স ছিল দশ, এখন থেকে কম পক্ষে বারো বছর করতে হবে। কিন্তু প্রচলিত সমাজ-ব্যবস্থায় আঘাত করবেন কি করে ! বাল্যবিবাহের পরিণাম যতই ভয়াবহ হোক না কেন, অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে, ভালোভাবে খুঁটিয়ে না দেখে হিন্দু সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানবেন না ল্যান্সডাউন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না। শোনামাত্র গোঁড়া হিন্দুসমাজ উদ্দাম হয়ে উঠলো। তাঁরা কিছুতেই ‘সহবাস-সম্মতি বিল’ পাস হতে দেবেন না। স্বভাবতই বিলের পক্ষে এবং বিপক্ষে দুটি দল গড়ে উঠলো। বিপক্ষে গেলেন একদল প্রাচীনপন্থী গোঁড়া হিন্দু – বিশেষ করে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ পণ্ডিতসমাজ, আর পক্ষে রইলেন প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারকের দল। প্রথম পক্ষে যোগ দিলেন স্যার রমেশচন্দ্র মিত্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন, রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র, পণ্ডিত শশধর তর্কচূড়ামণি, চন্দ্রনাথ বসু, পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিংহ প্রমুখ ব্যক্তি এবং বঙ্গবাসী, দৈনিক অমৃতবাজার, হোপ, অনুসন্ধান, হিন্দুরঞ্জিকা, ঢাকাপ্রকাশ প্রভৃতি পত্রপত্রিকা। এঁরা বললেন, বিল হিন্দুশাস্ত্রবিরোধী। রঘুনন্দনের স্মৃতিশাস্ত্রে গর্ভাধান ব্যবস্থার যে বিধি আছে তারও বিরোধিতা করছেন সরকার। অতএব শুরু হলো বিল-বিরোধীদের তুমুল আন্দোলন। ল্যান্সডাউনকে এঁরা ‘ব্রিটিশ আওরঙ্গজেব’ নামে আখ্যাত করলেন।

অন্যদিকে দাঁড়িয়ে গেলেন প্রগতিশীল নব্য সংস্কারকের দল। এঁরা রায় দিলেন বিলের সপক্ষে। শুধু রায় দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। এঁরা ‘ক্যালকাটা কমিটি ইন সাপোর্ট অব দি এজ অব কনসেণ্ট বিল’ গঠন করলেন, এবং আট হাজার ব্যক্তির স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ‘মেমোরিয়্যাল টু হিজ একসেলেন্সি দি ভাইসরয় অ্যাণ্ড গভর্নর জেনারেল’ পাঠিয়ে দিলেন। এই সমিতির পক্ষ নিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাসবিহারী ঘোষ, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, প্রমুখ। এই কমিটির প্রাণপুরুষ ছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত ও সংস্কৃত কবি রামনাথ তর্করত্ন। পক্ষ-বিপক্ষ — দুই দলই চেষ্টা করতে লাগলেন তাঁদের ঈপ্সিত কামনার সাফল্যের জন্য। উভয় পক্ষেরই প্রচার পূর্ণ উদ্যমে চলতে লাগলো। উভয়সংকটে পড়লেন বড়লাট ল্যান্সডাউন। তাঁর নির্দেশে ১৮৯১ খ্রীস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি গভর্নমেন্টের চীফ সেক্রেটারি স্যার এডগার এই বিলের শুভ-অশুভ নিরূপণ করার জন্য মতামত চেয়ে এক চিঠি লিখলেন বিল-বিরোধী রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও বিদ্যাসাগর এবং বিল-পক্ষীয় রামনাথ তর্করত্নের কাছে।

বিলকে স্বাগত জানালেন পণ্ডিত রামনাথ। তিনি সব শাস্ত্রগ্রন্থ বিচার করে সরকারকে জানালেন—’স্ত্রীর ষোল বৎসর ও পুরুষের পঁচিশ বৎসর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত উহাদের সংযোগে যে গর্ভসঞ্চার হয় তাহা বিপন্ন হইয়া থাকে। যদিও বিনষ্ট না হয়, তথাপি সন্তান দীর্ঘজীবী ও বলিষ্ঠ হয় না।’ তিনি মনুসংহিতা, সুশ্রুতসংহিতা, আয়ুর্বেদশাস্ত্র এবং রঘুনন্দনের স্মৃতিশাস্ত্র থেকে পাঠ উদ্ধৃত করে তার ব্যাখ্যা করে দেখালেন যে, সরকার যে সংস্কার করতে চলেছেন তা শাস্ত্র বা ধর্মবিরোধী তো নয়ই পরস্তু ধর্মশাস্ত্র এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্র এই সংস্কারকে সমর্থন করে। শ্রীনাথ দত্ত ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ‘নব্যভারত’-এর সংখ্যায় তাঁর অগ্রহায়ণ ‘মনুসংহিতানুসারে অরজস্কা স্ত্রীসহবাস দণ্ডনীয় কিনা’ নিবন্ধে বললেন : ‘মহর্ষি মনু যেন ভবিষ্যৎ দর্শনবলে বঙ্গদেশের বর্তমান অবস্থা জানিতে পারিয়াই শাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছিলেন। অনৃতুমতী সহবাসে অস্মদ্দেশে স্ত্রীলোকের নিতান্ত কষ্টদায়ক দুশ্চিকিস্য রোগ জন্মিতেছে, প্রাণবধ পর্যন্ত হইতেছে। শিশু বালিকাশ্রেণীর দুর্দশার একশেষ হইতেছে ; কোথায় বালিকারা মাতার স্নেহে পরিবর্ধিত হইয়া সুখে গৃহকার্য শিক্ষা করিবে, না কোথায় অকালে স্বামীসহবাস করিতে শ্বশুরগৃহে আনীত হইয়া কতপ্রকার যন্ত্রণাই সহ্য করিতেছে। অনেকে ইহজীবন ভারবহ মনে করিয়া আত্মহত্যা পর্যন্ত করিতেছে। বস্তুত সবল ব্যক্তিরা শাস্ত্রের মস্তকে পদার্পণপূর্বক জঘন্য কামরিপুর বশবর্তী হইয়া শূলে মৎস্য ভাজিবার ন্যায় দুর্বলা অসহায়া বালিকা স্ত্রীদিগকে ভাজাপোড়া অনূতুমতী করিতেছেন।’

রমেশচন্দ্র মিত্র, বিদ্যাসাগর এবং রাজেন্দ্রলাল এই বিলের বিরোধিতা করায় অনেকেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। প্রকৃতই যে ঈশ্বরচন্দ্র সমাজসংস্কারক হিসেবে সাধারণের মনে গভীর রেখাপাত করেছিলেন তিনি সমাজের এই কল্যাণকর বিলের বিরোধিতা করলেন কেন? তিনি সরকারের চিফ সেক্রেটারি এডগারের পত্রের উত্তরে ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি যে অতিমত প্রকাশ করেছিলেন তাতে দেখা যায় `conflicting with religious usage` এবং `interfering with a religious observance- এর কারণই তাঁকে এই বিলের বিরোধী করেছে।

বাল্যবিবাহের পক্ষপাতী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) কিন্তু মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাঁর যুক্তি, তঁর বিচার আইন প্রবর্তিত হওয়া-না হওয়ার বহু ঊর্ধ্বে। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ২৯ আশ্বিন তিনি যে চিঠিখানি লিখেছিলেন ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায়কে তা উদ্ধারযোগ্য : ‘… বিবাহিতাদিগের সম্মতির বয়ঃক্রম সম্বন্ধে যে আন্দোলন হইতেছে, আমি ইহাকে কতকটা বৃথাড়ম্বর মনে করি। যতদূর জানি, এদেশীয়া বালিকারা দ্বাদশ বৎসরের পূর্বে সচরাচন ঋতুমতী হয় না। এবং হরি মাইতির ন্যায় পাষণ্ড বড় বিরল। সুতরাং এ বিষয়ে কোন আইনের প্রয়োজন আছে বলিয়া আমার বিশ্বাস নাই। তবে, ইহাও বক্তব্য যে, দ্বাদশ বৎসর সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে বালিকাদিগের স্বামীসংসর্গ অবিধেয়, এবং ইহা আমাদিগের দেশের প্রাচীন রীতিবিরুদ্ধ। তাহার নিষেধজন্য, যদি কোন আইন হয়, তাহাতে আমি ক্ষতি দেখি না। ঈদৃশ রাজনিয়ম প্রাচীন দেশাচারবিরুদ্ধ হইবে না, কাজেই তাহাতে কোন আপত্তি উত্থাপিত করাও আমার মত নহে। এক্ষণে আইনমতে সম্মতিদানের বয়স দশ বৎসর; দশ বৎসরের স্থানে বারো বৎসর হয়, ইহা আমার অভিমত নহে। কিন্তু বারো বৎসর অধিক হওয়া কোনক্রমেই উচিত নহে। বাল্যবিবাহের আমি পক্ষপাতী। কিন্তু বাল্যবিবাহ অর্থে বাল্যকালে বয়সের অনুচিত সংসর্গ বুঝি না। তাহার পক্ষপাতী নহি। কোন কোন বালিকা দ্বাদশ বর্ষ পূর্ণ হইবার পূর্বেই ঋতুমতী হইয়া থাকে। তাহাদের সম্বন্ধে কোন শাস্ত্রোক্তি যে লঙ্ঘিত হইবে না, এমন কথা বলা যায় না। … আমার মতে, আইন হইবার প্রয়োজন নাই। হইলেও বিশেষ কোন ক্ষতি নাই।”

এখানে উল্লেখ করতে বাধা নেই, সহবাস-সম্মতি নিয়ে, এদেশে যখন তুমুল আন্দোলন চলছে, বঙ্কিমচন্দ্র তখনও সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত। ১৮৯১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি সরকারি দপ্তর থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

সম্মতির বয়স ‘বারো বৎসরের অধিক হওয়া কোনক্রমেই উচিত নহে’ — বঙ্কিমের এ উক্তি কিন্তু ‘সহচর’ পত্রিকা মেনে নেয়নি। মৃত ফুলমণির কথা মনে করিয়ে দিয়ে সহসব বলছে, ‘ আমরা পূর্বে বলিয়াছি, পুনরায় বলিতেছি, দ্বাদশ বৎসরে ফল হইবে না। এই বালিকাটির (ফুলমণির) দ্বাদশ পৎসরের কয়েক মাস মাত্র বাকী ছিল। আমরা মাত্র বাকী ছিল। দশ ও বারোর মধ্যে প্রভেদ এই, বারো বৎসরে বিপদের সম্ভাবনা কিঞ্চিৎ — কিঞ্চিৎ মাত্র কমে। কিন্তু সে কোথায়? স্বামীর বয়স ১৭/১৮ বৎসর হইলে। কার্যত এই বয়সের প্রভেদ নাই। যথার্থ যৌবন চতুর্দশ বৎসরের পূর্বে আরম্ভ হয় না। অতএব যথার্থ কাজ করা যদি ব্যবস্থাপক সভার গভীর ইচ্ছা থাকে, তবে সম্মতির বয়েসের ঐ সীমা করিতে হইবে। গভর্নমেন্ট সমাজের উপর হস্তক্ষেপ করিতেছেন। তথাপি পরম্পরা সম্বন্ধে বাল্যবিবাহ কুপ্রথার মূলে আঘাত লাগিবে। লাগাও উচিত।’ বলা বাহুল্য প্রভাবপ্রতিপত্তিশালী ও সমাজের নেতৃস্থানীয় বিদ্যাসাগর-রাজেন্দ্রলালের সমর্থনে বিলের বিরোধীপক্ষ সরকারের বিরোধিতায় অসীম জোর পেয়েছিলেন। অন্য পক্ষে বিলের সমর্থনকারীরা ও প্রচণ্ড উৎসাহে প্রচারে নেমেছিলেন।

১২৯৭ বঙ্গাব্দের ‘নব্যভারত’ পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় সম্মতির বয়স স্বদেশীয়গণের নিকট নিবেদন’-এ বললেন, ‘যদি গভর্নমেন্ট ও ইংরাজ জাতির দুরভিসন্ধি থাকিত, তাহা হইলে ত আমাদিগকে দুর্বল রাখা তাঁহাদিগের স্বার্থ হইত। অতএব স্বদেশীয়গণ! কুসংস্কার ও কাল্পনিক ভয়ের বশবর্তী হইয়া আপনাদিগের যথার্থ স্বার্থ হারাইও না। কার্যত এক্ষণে ব্রাহ্মণ কায়স্থ কন্যাগণের ১২/১৩/১৪ বৎসরে বিবাহ হইতেছে। কিন্তু নিম্নশ্রেণীর লোকেরা ৫/৬/৭ বৎসরের অধিক ঘরে অবিবাহিত কন্যা রাখে না। এই সকল লোকের প্রতি কটাক্ষ করা কি আমাদিগের কর্তব্য নহে? হিন্দুধর্মের যথেষ্ট স্তিতিস্থাপকতা গুণ আছে। আমাদিগের শাস্ত্রকারেরা নির্বোধ ছিলেন না। যদি প্রাচীনকালের অষ্টাদশ বিংশতি বৎসর পর্যন্ত অবিবাহিত থাকিয়া ধর্ম রক্ষা করিতে পারিতেন, এখনও তাহা হইবে না কেন? এক্ষণে সতীত্বের কি এত কম মূল্য হইয়াছে? তাহা নহে। অকালে বালিকাদিগকে কিলাইয়া কাঁঠাল পাকান হয় বলিয়া এক্ষণে অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সী স্ত্রীলোকেরা পুরুষের আস্বাদ পাইতেছেন। অতএব সাহস ও অধ্যাবসায় অবলম্বন কর। … পরের মুখে ঝাল খাইও না।’না। পরের মুখে ঝাল খাওয়া প্রতিরোধ করতে পারলেন না নবীন সমাজসংস্কারকের দল। বিলের সপক্ষে রামনাথের বক্তব্য সরকারের হাতে পেঁৗছাবার পর সনাতনপন্থীর দল বিরাট প্রতিবাদসভা ডাকলেন কলকাতার গড়ের মাঠে (১৪ ফাল্গুন, ১২৯৭, বুধবার)। প্রখ্যাত বঙ্গবাসী পত্রিকার যোগেন্দ্রনাথ বসু, কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ ছিলেন এই প্রতিবাদসভার মুখ্য আহ্বায়ক। লক্ষাধিক মানুষ এই সভায় যোগ দেয়।

এই সভাকে অনেকেই বলেছেন ‘ভারতের প্রথম বৃহৎ জনসভা’।বিরাট এই জনসভায় এরা ঘোষণা করলেন, হিন্দুধর্ম আজ বিপন্ন। আসন্ন এই বিপদের মূর্খ থেকে হিন্দুধর্মকে রক্ষা করতেই হবে। কিছুতেই ধর্মের ওপর এই আঘাত আমরা সহ্য করব না। অবশেষে ১৮৯১-এর ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার বড়লাটের আইনসভায় এই বিলের বিতর্কের দিন স্থির হয়। এ সংবার শুনেই রক্ষণশীল প্রাচীনপন্থীরা ১৫ মার্চ রবিবার কালীঘাটে গিয়ে কালীমন্দিরে পুজো দেন। প্রার্থনা করেন সহবাস-সম্মতি বিল যেন পাস না হয়। নিজেদের নামে স্বতন্ত্র ‘সংকল্প করে পৃথক পৃথক পূজা দেন। বঙ্গবাসী পত্রিকা, রমানাথ ঘোষ এবং রাজা ইন্দ্ৰচন্দ্ৰ সিংহ। দু’-তিন মণ সন্দেশ ও বাতাসা হরির লুঠ’ দেওয়া হয়। পঞ্চাশটি সংকীর্তনের দল কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করে ভবানীপুরে স্যার রমেশচন্দ্র মিত্রের বাড়ি যায়, তারপর কালীঘাটে এসে মিলিত মহাপূজা-প্রাঙ্গণে। এখানেও উপস্থিতির সংখ্যা কয়েক হাজার।এই সব রাজসিক আয়োজন দেখে স্বভাবতই শংকিত হয়ে পড়লেন নব্য সংস্কারপন্থীরা। এদের সকলেরই মনে এক ভয়, তা হলে কি আইন পাস হবে না? বাল্যবিবাহের এই কুপ্রথা কি সমাজের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে থাকবে? না। তা হলো না। কালীঘাটের মা-কালী প্রসন্ন হলেন না বিল-বিরোধীদের ওপর। ইতিপূর্বে রামনাথ তর্করত্ন-লিখিত বাংলা অভিমতটি রংরেজিতে অনুবাদ করে ভারতের অন্যান্য প্রদেশে পাঠানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য, এই বিলের পক্ষে জনমত গঠন করা। এই পেছনে ছিলেন রাসবিহারী ঘোষ (১৮৪৫-১৯২১)। দেখা গেল, উক্টর আর জি ভাণ্ডারকর, জাস্টিস তেলং, দেওয়ান রঘুনাথ রাও প্রমুখ ব্যক্তি বিলের পক্ষে রায় দিলেন। ব্যবস্থাপকসভায় বিল ১৯ মার্চেই বিলটি পাস হয়ে গেল। গভর্নর-জেনারেলের উপস্থিত হলে স্যার স্কোবল বলেছিলেন, “এক পক্ষে আইন ও আচার অনুসারে বারো বৎসর কাছাকাছি সময়কে সহবাসের গড় বয়স বিবেচনা করা যাইতে পারে এবং আর এক পক্ষে শারীরিক যোগ্যতা সম্বন্ধে ঐ সময়কে সর্বাপেক্ষা কম নিরাপদ বয়স বিবেচনা করা যাইতে পারে। অতএব আমি বিবেচনা করি যে, ঐ বয়সটিকে সীমা করিলে সমাজের কোনো অংশের কোনো আস্থাযোগ্য সামাজিক রীতির বা ধর্মব্যবস্থার করা হইবে না।’বিরোধী পক্ষের এত সভাসমিতি, হোম-পুজো- সবই ব্যর্থ হলো। চাপা আক্রোশে এরা ফুঁসতে লাগলেন। বললেন, ঠিক আছে, এর প্রতিকারের জন্যে বিলেত যাবো।

এই উপলক্ষে রাজসাহীতে বিরাট ধর্মসভা বসলো। রাজা শশিশেখরেশ্বর রায় প্রস্তাব করলেন, এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে প্রতিকার চাইতে কয়েকজন সদস্য বিলেতে যাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া বিদ্যাসাগর এবং রাজেন্দ্রলাল এই বিল পাস হওয়ার চার মাসের মধ্যে মারা গেলেন। ফলে প্রাচীনপন্থীদের ‘খুঁটির জোর’ অনেকটা কমে এসেছিল। এর ওপর আবার ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা ইংরেজচরিত্র এবং সভ্যতা নিয়ে নানান কটাক্ষ প্রকাশ করতে লাগলো। ফলে রাজরোষ প্রত্যক্ষভাবে ‘বঙ্গবাসী’র ওপর গিয়ে পড়লো। যে ‘বঙ্গবাসী’ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে সরকার রাজদ্রোহিতার অভিযোগ এনে এই আন্দোলনকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে এই অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিল ‘বঙ্গবাসী’। এখানে উল্লেখ্য, সহবাস-সম্মতি বিল পাস হয়ে গেলে তার উত্তাল ঢেঊ ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দুধর্ম ও সমাজজীবনেই শুধু নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও আছড়ে পড়েছিল নির্মমভাবে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছিল বহু নাটক, গল্প-উপন্যাস। সে আলোচনার অধ্যায় স্বতন্ত্র। বলা প্রয়োজন, যখনই ছেলে-মেয়ের বিয়ের বয়স নিয়ে সরকার আইন করতে গেছেন, তখনই পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বাদানুবাদের ঝড় বয়ে গেছে। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও নারী মন কী চাইছে তা সমাজ ভেবে দেখেনি। এখনো সময় আসেনি এই কথা বলার — ‘নিষেধের গণ্ডীটাকে পেড়িয়ে উড়ে যাও… কখনো ধরা দিও না।’ তবে আশা রাখি — ‘এক দিন দেখব আলো আঁধারের শেষ যেখানে… আসবেই দক্ষিণ বাতাস আকাশের বার্তা নিয়ে…।’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev