রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দু’দফায় বাড়িয়েছে রেপো রেটের হার। এবার কি বাড়বে স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ? দিন তিনেক পরেই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে কেন্দ্র। স্বভাবতই সুদ বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসের জন্য স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার ৩০ জুন বিকেলে ঘোষণা করবে কেন্দ্র। স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার তলানিতে এসে ঠেকেছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির ফলে। কেভিপি, মাসিক আয় প্রকল্প বা টাইম ডিপোজিট, জনপ্রিয় সব সঞ্চয় প্রকল্পেরই সুদের হার বিগত বছরগুলিতে কমানো হয়েছে নির্মম ভাবে।

দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে
যতদিন যাচ্ছে্, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, দারিদ্র্য, বৈষম্য ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। সেসব ঢাকা দিতে জোরদার সাম্প্রদায়িক তাস খেলা চলছে। আসলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাটাই গভীর দুশ্চিন্তার। ফেলে আসা অর্থবর্ষে জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধির হার আগের পূর্বাভাস থেকে অনেকটাই কম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের আর্থিক বিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস কন্ফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেবেলপমেন্ট ভারতের বিগত বছরের (২০২১-২২ বা ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত) জিডিপি বৃদ্ধি পূর্বাভাস ছেঁটেছে। পূর্বাভাস কমিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা এনএসও বা আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থা মুডিজ-ও। মনে রাখা দরকার, করোনা হানা এবং আগে থেকেই চলে আসা আর্থিক দুর্বলতার কারণে ২০২০-২১ সালে ভারতীয় অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছিল। প্রথমে এই সংকোচনের হার ৭.৩ শতাংশ বলা হলেও পরে তা সামান্য কমিয়ে ৬.৬ শতাংশ বলা হচ্ছে। এর অর্থ হলো, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে তার আগের বছরের তুলনায় জাতীয় উৎপাদন অন্তত ৬.৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এই কমে যাওয়া ভিতের উপর দাঁড়িয়ে যদি বড় বৃদ্ধি না হয়, তবে জাতীয় উৎপাদন সেই ২০১৯ সালের স্তরেই আটকে থাকবে। চলতি অর্থবর্ষ (২০২২-২৩)-এর বৃদ্ধি নিয়ে যতই বাগাড়ম্বর করা হোক না কেন, গত বছরের থেকে তা কম হবে বলেই মনে হয়। ভারতের অর্থনীতির উপর ভরসা করতে না পেরে চলতি বছরে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বিদেশি ফাটকা পুঁজি ভারত ছেড়েছে।

দেশে কর্মহীনতার হার যে ভাবে বেড়েছে, তাতে আশঙ্কা আরও বাড়ছে। যাদের কাজ আছে, বা আগে কর্মরত ছিল বলে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডে বা ইপিএফ-এ কিছু টাকা জমা রয়েছে, আঘাত আসছে তাদের উপরও। সম্প্রতি কমানো হয়েছে ইপিএফ-এ জমা টাকার সুদের হার। এক কথায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।
সুদের হার তলানিতে — কমেছে পিপিএফ-এর সুদও
২০১৪ সালের এপ্রিলে কিষান বিকাশ পত্র বা কেভিপি-র সুদ ছিল ৮.৭ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে কেভিপি-র সুদের হার হয়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ বা ১২৪ মাসে ম্যাচিওরিটি।
মোদি জমানার ঠিক আগে পাঁচ বছরের মাসিক আয় প্রকল্পে সুদ মিলত ৮.৪ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৬.৬ শতাংশে।
সুদ কমানো হয়েছে ১, ২, ৩ ও ৫ বছরের টাইম ডিপোজিট বা স্থায়ী আমানতে, রেকারিং ডিপোজিট, ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট বা এনএসসি, সিনিয়র সিটিজেনস্ সেভিংস স্কিম, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড ও সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনাতে।

বিপুল হারে সুদ কমানো হয়েছিল ২০২০-র এপ্রিলে, যখন করোনা লকডাউনে মানুষের দুর্দশা চরমে। পরবর্তীতে জিনিসপত্রের চড়া দাম সত্ত্বেও সুদ বাড়ানো হয়নি।
অনেকটা কমে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৭.১ শতাংশ।
১, ২ ও ৩ বছরের টাইম ডিপোজিটে সুদ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫.৫ শতাংশ। ৫ বছরের টাইম ডিপোজিটে সুদ মিলছে ৬.৭ শতাংশ।
৫ বছরের রেকারিং ডিপোজিটে ৫.৮ ও ৫ বর্ষীয় এনএসসি-তে ৬.৮ শতাংশ সুদ মেলে। বয়স্কদের সঞ্চয় প্রকল্পে ৭.৪ ও সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় সুদ মেলে ৭.৬ শতাংশ।
ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে কমানো হয়েছে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদ। সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে অনেকটা ছেঁটে তা করা হয়েছে ৮.১ শতাংশ। অথচ মাথা চাড়া দিয়েছে দারুণ মূল্যবৃদ্ধি।

মূল্যবৃদ্ধি লাগাম-ছাড়া
এপ্রিলে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১৫.০৮ শতাংশ। মে মাসে বেড়ে হয়েছে রেকর্ড ১৫.৮৮ শতাংশ।
এপ্রিলে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৭.৭৯ শতাংশ, মে-তে হয়েছে ৭.০৪ শতাংশ।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতি অনুযায়ী ৪ শতাংশ খুচরো মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় বলে ধরা হয়। এর থেকে ২ শতাংশ কম-বেশি হলে চরম সহনসীমা বলে মনে করা হয়। চলতি বছরে দীর্ঘ সময় জুড়ে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৬ শতাংশের অনেকটা ওপরে। বাধ্য হয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দু’দফায় রেপো রেট ৯০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে। কিন্তু কোনো অদ্ভুত কারণে ব্যাঙ্কগুলো ফিক্সড ডিপোজিটে সুদ তেমন বাড়াচ্ছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে টাকা জমা রাখলে তা আসলে কমে যাচ্ছে। কারণ, যে হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, দাম বাড়ছে তার থেকে বেশি গতিতে। কেন্দ্রের উপর চাপ বাড়ছে সুদের হার বাড়ানোর। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার ঘোষণা হবার কথা ৩০ জুন বিকেলের দিকে। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদ কমা, ব্যাঙ্কে সুদ না বাড়ায় দানা বাঁধছে আশঙ্কাও। কেন্দ্র কি করে, তা দেখতে দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা চলছে সুদ-নির্ভর জনতার। যারা স্বল্প সঞ্চয়ে বিনিয়োগ করবেন, সম্ভব হলে অপেক্ষা তারা করে দেখে নিতে পারেন আর তিনটে দিন। যদি সুদ কিছুটাও বাড়ে সামান্য স্বস্তি মিলবে আম-জনতার।