Whataboutery . এখন এই শব্দটা বেশ ঘুরছে। বিরোধী দলের মুখে, সাংবাদিকদের মুখে। বলা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তাঁর দলের লোকেরা whataboutery শুরু করেছেন। অভিধানে এ শব্দের অর্থ হল : The practice of repeatedly blaming the other side and referring to events of the past, অর্থাৎ নিজের দোষ খণ্ডনের জন্য পূর্বসূরীর ঘাড়ে সে দোষ চাপিয়ে দেওয়া। অভিধানবিদ বেন জিমারের মতে ১৯৭০ সালে উত্তর আয়ার্ল্যাণ্ডে এই শব্দের জন্ম। ‘দ্য আইরিশ টাইমস’ পত্রিকায় জনৈক ইতিহাসের শিক্ষকের একটি চিঠি প্রকাশ পায়। যে সমস্ত মানুষ আই আর এ-কে সমর্থন করেছিলেন তাঁদের সম্পর্কে সেই শিক্ষক whereaboutery শব্দটি প্রয়োগ করেন। — “I would not suggest such a thing were it not for the Whereaboutery.” দিন তিনেক পরে সেই পত্রিকায় জন হেলি তাঁর একটি লেখায় শব্দটি প্রয়োগ করেন — “As a correspondent noted in a recent letter to this paper, we are very big on Whataboutery Morality.”
গত ৯ বছরে মোদি ও তাঁর সরকার এই whataboutery-র অজস্র নিদর্শন রেখেছেন। যখনই তাঁদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলা হয়, তখনই তাঁরা জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, সনিয়া গান্ধী, মনমোহন সিং-এর দিকে আঙুল তোলেন, পরিবারতন্ত্রের কথা বলেন। এইজন্যই ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ বলেছেন, ‘ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের জন্য কংগ্রেসের টিকে থাকাটা জরুরি। কিন্তু গান্ধী পরিবারকে ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। নইলে যতদিন গান্ধী পরিবার কংগ্রেসের ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন বিজেপি whataboutery-র সহজ সুযোগ পেতে থাকবে। কোন কিছু ঘটলেই বলবে, আরে ইন্দিরা গান্ধীর সময় তো এই হয়েছিল, নেহেরুর সময় তো ওই হয়েছিল।’
কিন্তু মণিপুরের ঘটনায় নরেন্দ্র মোদি আর তাঁর দল দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে whataboutery করতে গিয়ে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে।
গত মে মাস থেকে মণিপুর অশান্ত। মেইতেই ও কুকি এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ। এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ ছিল, কিন্তু প্রশাসন সেই বিভেদকে বাড়িয়ে তুলেছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পদে মেইতেইদের সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। বিজেপির বীরেন সিং সরকার হিন্দু ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সৃষ্টি করেছে বিভেদ। কুকিরা নিজেদের জাতিগত বিদ্বেষের শিকার বলে ভেবেছে।
তিন তিনটি মাস অতিক্রান্ত হল, অথচ বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার সংঘর্ষ থামাতে পারল না। দুই কুকি নারীকে নগ্ন করে হাঁটানোর ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ায় দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিন্দার ঝড় শুধু দেশে নয়, বিদেশেও দেখা যাচ্ছে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘নিউইয়র্ক টাইমস’, ‘ফ্রাঙ্কফার্টার অ্যালগেমাইন’ প্রভৃতি পত্রিকায় সমালোচনা করা হয়েছে মোদি সরকারের। বলা হয়েছে ভারতে জাতিগত সংঘর্ষে যৌন হেনস্থার মর্মান্তিক ঘটনা কালিমালিপ্ত করছে নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি। প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি বিরোধীরা দাবি করলেও তিনি পালন করে গেছেন এক বিস্ময়কর নীরবতা।
সংসদে বিরোধীরা অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন। মণিপুরের ঘটনায় মুখর হয়েছেন। সংসদে এসে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রথম দেড়ঘন্টা অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে বলেছেন। বিরোধীরা বিরক্ত হয়ে সংসদ ত্যাগ করে চলে যাবার পর মাত্র তিন মিনিট তিনি মণিপুরের কথা বলেছেন। গোদি মিডিয়া একেই বলেছেন মোদির মাস্টারস্ট্রোক। কি বলেছেন প্রধানমন্ত্রী? বলেছেন, ‘আমি সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি, মা-বোনেদের রক্ষার জন্য কঠোরভাবে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা কায়েম রাখুন, ঘটনা রাজস্থানের হোক বা ছত্তীশগড়ের হোক কিংবা মণিপুরের হোক।’
এখান থেকেই প্রধানমন্ত্রী whataboutery শুরু করেছেন।
লক্ষ্য করুন রাজস্থান ও ছত্তীশগড়ের পর মণিপুরের উল্লেখ। অন্যস্থানের ঘটনা যেন মণিপুরের মতোই।
বাবু যত বলে পারিষদদলে বলে তার শতগুণ। মোদির দেখানো পথে এগিয়ে চললেল অনুরাগ ঠাকুর, স্মৃতি ইরানি আর অভিনেত্রীকুল চূড়ামণি লকেট চট্টোপাধ্যায়। এঁরা বললেন বিজেপি শাসিত মণিপুরকে দেখালে তো হবে না, দেখতে হবে কংগ্রেস শাসিত রাজস্থান, মহাগঠবন্ধন শাসিত বিহার আর তৃণমূল শাসিত বাংলাকেও। সেখানেও নারী নির্যাতন হচ্ছে। তার বেলা? হিমাচলের বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর বলেন, ‘মণিপুরের মতোই নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান, বিহারে।’ স্মৃতি ইরানি আবার রাহুল গান্ধীর ‘ফ্লাইং কিস’ নিয়ে নিন্দায় মুখর। তবে আমাদের লকেটের মতো স্মৃতির অভিনয়েও খামতি ছিল। সকলের চোখে ধরা পড়ে গেছে সেই খামতি। একটু বলি লকেটের কথা। পাঁচলার নারী নির্যাতনের কথা বলে সাংবাদিক সম্মেলনে কেঁদে ভাসিয়েছেন লকেট। বলা যেতে পারে নাকের জলে চোখের জলে হয়েছেন। তবে রুমাল দিয়ে তাঁকে শুধু নাক মুছতেই দেখা গেছে। রাজ্য পুলিশ লকেটকথিত নারী নির্যাতনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আরও একটা কথা। পাঁচলায় যদি পঞ্চায়েত ভোটের দিন বা গণনার দিন নারী নির্যাতন ঘটে থাকে, তাহলে তার দশ দিন বাদে কেন কান্না পেল অভিনেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের?
মশাই, whataboutery-র সময় এসব ভাবলে চলে না।
কিন্তু ভাবালেন সুপ্রিম কোর্ট।
সুষমা স্বরাজের কন্যা, আইনজীবী বাঁশুরি স্বরাজ আদালতে মণিপুরের ঘটনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান, ছত্তীশগড়ের নারী নির্যাতনের কথা তুলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় থামিয়ে দিলেন তাঁকে। বলে দিলেন, অন্যান্য রাজ্যের নারী নির্যাতনের কথা তুলে ধরে মণিপুরের ঘটনার সাফাই দেওয়া যায় না। মণিপুরে যা ঘটেছে তা নজিরবিহীন। মণিপুরে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪ মে। জিরো এফ আই আর করা হয়েছে ১৮ মে। কেন পুলিশ ১৪ দিন সময় নিল এফ আই আর করতে? কেন তারা এতদিন অপেক্ষা করছিল? কেন নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এফ আই আর করে নি? সরকার ব্যবস্থা না নিলে, আদালতই এবার ব্যবস্থা নেবে।
মণিপুর নিয়ে বিজেপির whataboutery চুপসে আমসি হয়ে গেল।
পিkচার আভি বাকি হ্যায়। আসছে CAG রিপোর্ট। তখন আবার শুরু হবে বিজেপির whataboutery। তাঁরা বলতে শুরু করবেন কংগ্রেস আমলের দুর্নীতির কথা। রাফালের কথা বললে বলবেন বোফর্সের কথা।
কিন্তু সাধারণ মানুষ এবার ধরে ফেলছেন বিজেপির whataboutery-র কৌশলটা।