সুকুমার সেন তাঁর ‘কলিকাতার কাহিনী’ বইয়ে বলেছেন, “কপালিটোলা ছিল তুকতাক, জড়িবুটি, ওষুধবিক্রেতা তান্ত্রিকদের আড্ডাঘর।”
কপালিটোলা জায়গাটি কোথায়? এটি কসাইটোলার (অধুনা বেন্টিংক স্ট্রিট) পাশে। ওয়েস্টন স্ট্রিট, বেন্টিংক স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে কপালিটোলায় মিশছে। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউয়ের অফিসের গা দিয়ে কপালিটোলায় পৌঁছানো যাবে। সেখানে দেখা যাবে কপালিটোলা পার্ক ও লাইব্রেরি। দাসপরিবারের অতিপ্রাচীন ব্রজেশ্বর শিবমন্দির এখানেই অবস্থিত। দাসপরিবারের দুর্গাপূজাও দুশো বছর অতিক্রম করেছে। ফরোয়ার্ড ব্লকের একসময়ের রাজ্যসভাপতি প্রয়াত অশোক ঘোষের বাড়িও এখানে।
কপালি কারা?
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ জানাচ্ছে, কৃষিজীবী সম্প্রদায়বিশেষ।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালাভাষার অভিধান জানাচ্ছে, কপালি মানে শূদ্র জাতিবিশেষ।
সুভাষ ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘সংসদ বাংলা অভিধান’-এ পাচ্ছি কপালির দুটি অর্থ, —
১. ধীবরের ঔরসে ও ব্রাহ্মণকন্যার গর্ভজাত বাঙালি জাতিবিশেষ,
২. শণদড়ি প্রস্তুতকারক ও বিক্রয়কারী জাতি।
সংসদ বাংলা অভিধানে কপালির প্রথম অর্থটি স্বভাবতই ধরছি না। ধরলে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যাবে।
আমার মতে, দু-নম্বর অর্থটি কলকাতার গড়ে ওঠার সময় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শণপাটের দড়িপ্রস্তুতকারী ও বিক্রেতারা পুরনো কলকাতার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কপালিদের ছিল খুব নামডাক।
শণপাটের দড়ি পুরনো কলকাতায় বহুকাজে লাগত। এখান থেকে জাহাজ ও নৌকার দড়ি চলে যেত বাবুঘাট, আর্মেনিয়ানঘাট, কয়লাঘাট, ব্যাঙ্কশালঘাট ও চাঁদপালঘাটে। জাহাজে পালের দড়ি, নৌকার গুন টানার দড়ি এখান থেকেই যেত। সারা বাংলায় কপালিটোলার শণপাটের দড়ির সুনাম ছিল।
প্রাচীন কলকাতায় চাঁদপাল ঘাটের কাছ থেকে গঙ্গার একটি ধারা হেস্টিংস, বেন্টিংক স্ট্রীট হয়ে ক্রিক রো, ওয়েলিংটন স্কোয়ার হয়ে বেলেঘাটার ভিতর দিয়ে ধাপার কাছে লবণহ্রদে মিশত। এই জলপথ দিয়ে নৌকা করে বাণিজ্যও হত। কপালিটোলার শণের দড়ি মাঝিরা ব্যবহার করত। পরে শহর কলকাতার বর্জ্য পদার্থ দিয়ে খালটি বুজিয়ে দেওয়া হয়। যদিও কোথাও কোথাও এর ক্ষীণ চিহ্ন রয়ে গেছে।

কপালিটোলার পাশেই ছিল কসাইটোলা। সেখানে যে পশুবধ হত, সেই পশুকে বাঁধার জন্যেও দরকার হত প্রচুর দড়ি। দড়ির প্রয়োজন হত হরেকরকম কাজে। তা বলে শেষ করা যাবে না। সাতের দশকের শেষের দিকে মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ দিয়ে হেঁটে এসপ্ল্যানেড যাওয়ার সময় অনেকবার শর্টকাট করেছি কপালিটোলা লেন দিয়ে।
এখন কপালিটোলার কী চেহারা হয়েছে তা জানি না। মেট্রো রেলের কাজের সময় কপালিটোলার নাম শুনিনি।
শণদড়ি তো তৈরি হত কপালিটোলায়। শণপাট কোথা থেকে আসত? খোদ কলকাতায় একসময় শণপাটের চাষ হত বলে জানা যায় কোম্পানির দলিলদস্তাবেজ থেকে। ১৭০৭ সালের হিসেবে পাটচাষের, ধানচাষের জমির উল্লেখ আছে। হুগলি ও বর্ধমান থেকেও আমদানি হত শণপাট।
কপালিটোলার কপালিরা গেলেন কোথায়?