অনেক তো হল। স্বাধীনতার পর পার হয়ে এলাম এতগুলো বছর। অনেক দেখা হল কুস্তি আর ডিগবাজি আর লেংগিবাজি। উত্তর-দক্ষিণ, ডান-বাম, গরমপন্থী-নরমপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী-হিন্দুত্ববাদী, লাল-নীল-সবুজ-গেরুয়া অনেক দেখলাম। অনেক তর্ক, অনেক আলোচনা, অনেক পরিসংখ্যান, অনেক মতাদর্শ, অনেক নির্বাচনী লড়াই, অনেক প্রতিশ্রুতি। তবু তো গেল না বৈষম্য আর বিভাজন। সে সব রয়েই গেল ভোটব্যাঙ্কের গোপন টানে। নারী ও পুরুষের, শিক্ষিত আর অশিক্ষিতের, অভিজাত ও অনভিজাতের, ব্রাহ্মণ আর শূদ্রের, শোষক ও শোষিতের, এক ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার, রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের, এক রাজ্য ও অন্য রাজ্যের বিভেদ ও বৈষম্য বেশ বজায় আছে। সেই বিভেদ মাঝেমধ্যে তীব্র গতিবেগ সঞ্চয় করে ভূমিকম্প ঘটায়। তখন নেতারা তড়িঘড়ি সংহতি মঞ্চ তৈরি করেন, কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে করতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারততীর্থ’ আবৃত্তি করেন আবেগঘন কণ্ঠে। কিন্তু দেশ যে নিছক একটা ভৌগোলিক সত্তা নয়, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে না পারলে যে দেশকে ভালোবাসা যায় না, এই বোধ তাঁদের জন্মায় না। দেশের মানুষও দেশকে জ্ঞানে-প্রেমে-কর্মে আপন করে নেবার শিক্ষা লাভ করে না। তার প্রমাণ পাই আন্দোলনের নামে দেশের সম্পদ বিনষ্ট করা; নিজের বাসস্থান বাদে অন্য সমস্ত স্থানকে পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদ অনুভব না করার মধ্যে।
ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে প্রচুর ঢক্কানিনাদ করা হয়। সব রাজনৈতিক দলই না কি গণতন্ত্রের পূজারি। কিন্তু দোয দেন বিপরীত পক্ষকে। শাসক বলেন বিরোধীরা ধ্বংস করছে গণতন্ত্র; বিরোধী বলেন গণতন্ত্রের নামাবলি পরে শাসক আসলে পুষ্ট করছে পরিবারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রকে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র আমাদের এই ভারতেই আছে। দৃশ্যত গণতন্ত্র আছে বটে, তার মধ্যে বহাল তবিয়তে যা আছে তার নাম দলতন্ত্র। দল যস্য, বল তস্য। দলের সত্যটা যেন দেশের সাধারণ সত্য। সব দলই জনমতের দোহাই দেন। ভোটে পরাজিত হলে কারচুপি বা রিগিং-এর কথা ওঠে। যে দল ৪০% ভোট পেয়ে বিজয়ী হয় সে যে ৬০% মানুষের সমর্থন পায় নি, সে কথা মনে রাখা হয় না।
মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচন করে জনপ্রতিনিধি। এটা গণতন্ত্রের অঙ্গ। কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কতটা সক্রিয় থাকে নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি? প্রার্থী নয়, দলকে দেখে ভোট দেয় মানুষ। দলের যদি মোদি বা মমতার মতো জবরদস্ত নেতা থাকেন, তাহলে দল সেই নেতার ভাবমূর্তিকে ভোটের কাজে লাগায়। যে সব ভোটপ্রার্থী ফৌজদারি মামলার আসামি, তাঁরাও মানুষের ভোটে জিতে আসেন, গ্যাঁদাফুলের মালা পরে জনগণেশের সামনে আসেন। জনপ্রতিনিধিদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন প্রশ্ন নেই। ধর্মীয় সংস্কারের মতো রাজনৈতিক সংস্কারও আছে। দলের নীতি ও অনুশাসন ক্যাসাবিয়াঙ্কার মতো অন্ধভাবে অনুসরণ করে চলেন, অন্য দলের সব কিছুই মন্দ বলে চোখ বুজে রায় দেন। আবার দেখুন, দলের নীতি নির্ধারণ করেন স্বল্প কিছু উপরতলার নেতা, আর সেটা চাপিয়ে দেওয়া হয় দলের সমস্ত সদস্যদের উপর। নানা ধরণের আধুনিক প্রচারযন্ত্র দিয়ে, উৎকোচ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করে রাজনৈতিক দলগুলি। এত কিছুর পরে নির্বাচনে জনমতের সত্যকার কিছু প্রতিফলন হয় কি?
গণতন্ত্রের অন্যান্য অঙ্গগুলি বহুলাংশে পঙ্গু। আদালতে মামলার পাহাড় জমে থাকে বছরের পরে বছর। আইনের বহু ফাঁক থাকে, যার ফলে ধনবান অপরাধীরা সেই ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে যেতে পারেন। গরিব মানুষ সুবিচার পান না। বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হয়ে সুফলের প্রত্যাশা সুদূরপরাহত। বিচারালয় ও বিচারকের অসদ্ভাব। হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ফাইলবন্দি। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। তারপরে আছে সংবিধানের গোলোকধাঁধা। সাধে কি ব্রিটিশ আইনজীবী ভারতের সংবিধানকে ‘আইনজীবীদের স্বর্গ’ বলেছিলেন! আইনজীবীরা আইনের ফাঁক-ফোকোরকে সুবিধামতো নিজেদের কাজে লাগাতে পারেন। সংবাদ মাধ্যমও নিরপেক্ষ নয়। এক ঘটনার বয়ান বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পরিবেশিত হয় বিভিন্নভাবে, বিচিত্র কায়দায়। তার মধ্যে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা — জান সাধু যে বুঝ সন্ধান।
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী লিখেছিলেন এক উলঙ্গ রাজার কথা। রাজাকে উলঙ্গ জেনেও অধিকাংশ মানুষ কুলুপ এঁটেছিল মুখে। তারা স্বার্থপর, ভিতু, আত্মবিক্রয়কারী, ধান্দাবাজ। তবে সেই ভিড়ের মধ্যে সাহসী একটি ছেলেও ছিল। এ যুগে এ রকম সাহসী ছেলে যে নেই তা নয়। তবে একান্তই সংখ্যালঘুতারা ব্যর্থ হচ্ছে দুটি কারণে। শাসকশ্রেণি তাদের ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়ে সহজেই বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারছে জনজীবন থেকে। দ্বিতীয়ত, বিরোধীরাও তাকে দেখছে সন্দেহের চোখে। তোতাপাখির মতো তাদের কথা আওড়াচ্ছে না বলে ‘গন্ধটা কেমন সন্দেহজনক’ বলে মনে হচ্ছে। সংখ্যালঘু এই ছেলেদের বাইরে সংখ্যাগুরু যে ছেলেরা আছে, তারা জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিযোগিতার ঘোড়দৌড়ে হারিয়ে ফেলছে নিজেদের, ভয় পাচ্ছে ঝুঁকি নিতে, চারদিকে যে দুর্নীতির বাঁকা জল করিছে খেলা তার দিকে তাকিয়ে যোদ্ধা হবার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। আমাদের সমাজ, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্রমশ একটা বদ্ধ জলায় পরিণত হতে চলেছে এবং সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে। তবু মানুষের বৃথা আশা মর মর করলেও মরে না। মানুষ আশা করে থাকে সেই ছেলের, যে রাজার সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে বলবে : রাজা তোর কাপড় কোথায়?
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক