ভাগবত পুরানে ‘গজেন্দ্র মোক্ষ লীলা’ নামে একটি উপাখ্যান বর্ণনা করা আছে। গল্পটি একটি পুণ্যবান হস্তীর যে পরম বিষ্ণুভক্ত ছিলো। বিষ্ণুর চরণে মন রেখে নিত্যদিন যাপন করতো। যে বনে সে থাকতো তার ধার দিয়ে একটি নদী বয়ে যেতো। একদিন সেই নদীতে পরিবার ও অন্যান্য পশুসহ স্নান করতে এলে সেখানে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর কুমির হস্তীটির পা কামড়ে ধরে তাকে জলের গভীরে টেনে নিয়ে যায়! বহুক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে ক্লান্ত বিদ্ধস্ত রক্তাক্ত হস্তী আকুল হয়ে বিষ্ণু কে ডাকতে শুরু করে! সেই আর্তনাদ প্রভুর প্রাণে বাজে। তিনি শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম নিয়ে গরুড়ে সওয়ার হয়ে হস্তীর উদ্দ্যেশে উড়ান ভরেন। কুমির রূপী ষঢ়রিপুর বিনাশ করেন ও গজেন্দ্রকে রক্ষা করেন।
কিন্তু ঈশ্বরের আপন দেশে সকল মানুষ যে ঐশ্বরিক নয় সেটা বুঝে উঠতে পারেনি ঝাড়গ্রামের এক অবলা হাতি। গত স্বাধীনতা দিবসের কথা। ঝাড়গ্রাম গ্রামীণ এলাকার ধরমপুর হয়ে হাতির একটি দল ঢুকে পড়ে ঝাড়গ্রাম শহরে। একটি হাতি বাদ দিয়ে শাবক-সহ চারটি হাতি নতুন জেলা কালেক্টরেটের পাশে ঝোপ-জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে হাতি দেখার জন্য দিনভর মানুষজন চারিদিক থেকে ছুটে আসে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়লে হুলা পার্টির দলকে ডেকে হুলা জ্বালিয়ে হাতিকে সরানো প্রক্রিয়াও শুরু হয়।
চারটি হাতির মধ্যে একটি হাতি তাড়া করে হুলা পার্টির লোকজনকে। প্রথমে একটি হুলা ছুড়ে মারা হয় ওই হাতিটির দিকে, যদিও সেটি গায়ে লাগে নি। কিন্তু পরে ভিড়ের মধ্যে কেউ হাতির পিঠে জ্বলন্ত হুলার রড গেঁথে দেয়। তীব্র যন্ত্রনায় প্রবল আর্তনাদ করতে থেকে হাতি। বন দপ্তরের আধিকারিকরা এসে হাতিটিকে অজ্ঞান (ট্র্যাঙ্কুলাইজ) করে। শুক্রবার ভোরে হাতিটিকে ঝাড়গ্রাম জুলজিক্যাল পার্কে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। মৃত্যু হয় হাতিটির। ময়না তদন্তের রিপোর্টে জানা যায় নিহত হাতিটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল, এমনকি প্রেগনেন্সির এ্যাডভান্স স্টেজেও ছিল।
খবর জানাজানি হতেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে রাজনীতি, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সর্বত্র। কুড়মিরা বলেন, তাঁরা প্রকৃতির সন্তান। হাতির হামলায় তাদের ঘরবাড়ি, ফসলের প্রভূত ক্ষতি হয়, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও ঘটে। তবুও জঙ্গলমহলের মানুষেরা হাতিকে ঠাকুর রূপে পূজা করেন।
হাতি হত্যার প্রতিবাদ জানাতে ‘কুড়মি সমাজ পশ্চিমবঙ্গ’ মিছিলের ডাক দেয়। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় পতাকা এবং রং ভুলে ঝাড়গ্রাম শহরের রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিলে পা মেলান লাল-গেরুয়া-হলুদ-সবুজ সব শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা।

অন্তঃসত্ত্বা হাতির পিঠে জ্বলন্ত শলাকা বিদ্ধ করে হত্যার ঘটনার বিচার চেয়ে সড়ব হল দেশের সর্ববৃহৎ পশুর সুরক্ষা সংস্থা ফিয়াপো (The Federation of Indian Animals Protection Organisations -FIAPO) সংস্থাটি বনদপ্তরে গাফিলতি কথা উল্লেখ করে রাজ্য সরকার এবং বনদপ্তরের কাছে তদন্ত কমিটি গঠনের আর্জি জানিয়েছেন। অনেক আগেই সুপ্রিম কোর্ট হাতি তাড়াতে জ্বলন্ত শলাকা বা বর্শা চালানো নিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। ওই সংস্থাটি মূলতঃ তিনটি দাবি জানিয়েছেন —
১) হাতি মৃত্যুর তদন্তে সরকার অবিলম্বে একটি কমিটি গঠন করুক।
২) হাতি মানুষের সংঘর্ষ মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ সমন্বয় কমিটি গঠন করুক অন্যান্য রাজ্য (যাঁরা এর আগে এই সমস্যার সমাধান করেছেন) ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকে নিয়ে।
৩) বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নতুন প্রটোকল তৈরি না হওয়া পর্যন্ত হুলা কমিটির কাজ স্থগিত রাখতে হবে।
সমস্যা হলো, হাতি তাড়ানোর জন্য ঝাড়গ্রাম বনবিভাগের কাছে পর্যাপ্ত বনকর্মী নেই। ফলতঃ নির্ভর করতে হয় হুলা পার্টির উপরে। অনেক সময় হাতি তাড়াতে গিয়ে হুলা পার্টির সদস্যদেরও হাতির হানায় মৃত্যু ঘটেছে। সদস্যদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সেফটি কিটস্ এর জন্য আগে তারা দাবি জানিয়েছিলেন বনদপ্তরকে কিন্তু তা পূরণ হয়নি। আজকেও ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ১১০টি বুনো হাতি বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি করেছে।
১৯৮৬ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ ভারতীয় হাতিকে (এলিফাস মাঙ্কিমাগ ইনডিবাস) ‘এনডেঞ্জার স্পিসিস’ ঘোষণা করে। কারণ হাতির সংখ্যা তখন প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে অনেক পর্যালোচনার পরে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার নিয়ে আসে ‘প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট’। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ঝাড়খণ্ড, কেরালা, কর্ণাটক, মেঘালয়, মহারাষ্ট্র, নাগাল্যান্ড, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু ) নিয়ে শুরু হয় হাতি সংরক্ষণ ও তার মানোন্নয়ন।
এর আগেও বিস্ফোরক ঠাসা আনারস খেয়ে কেরলের অন্তঃসত্ত্বা হাতির মৃত্যু ঘটে। মেইনলি গ্রামে খাবার পাওয়া যাবে একটু বেশি, এই আশাতেই লোকালয়ে এসেছিল ১৫ বছর বয়সী হাতিটি। খাবারের আশায় মৃত্যুকে বরণ করতে হয় মা হাতিকে।
সারাদেশে নিরীহ প্রাণহত্যার মাশুল গুনতে হয়েছে বহু সারমেয়কে। পর্যটকদের অতি আমোদিনী স্বভাবের নিদর্শন হয়ে থাকে জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা খাবারের প্লাস্টিক যা অবোধ গন্ডার, হাতিগুলো খাবার হিসাবে খেয়ে ফেলে এবং ভোগে পেটের অসুখে। পাড়ার কুকুরের লেজে কালিপটকা বেঁধে দেওয়ার ঘৃণিত মজা এখনও দেখা যায়। আর দোলের সময় অবলা প্রাণীগুলো নিয়ে আল্লাদিপনা, সেটাই বা কম কী। চিড়িয়াখানায় শিম্পাঞ্জির ডিগবাজী দেখার জন্য ঢিল ছোড়াটা কি খুব স্বাভাবিক? এন আরএস হাসপাতালে ১৬টি কুকুর ছানাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা মনে আছে?
কিছু দিন আগে আমেরিকায় এক গবেষণার মাধ্যমে এফবিআই (মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা) এর কাছে এক অদ্ভুত তথ্য আসে। তারা বেশ কিছু ক্রাইমের উপর গবেষণা করে জানতে পারেন যে, প্রায় যে কোনো বড় ধরনের ক্রাইমের সূত্রপাত হয় পশুর উপর নৃশংস হওয়ার অভ্যস্ততা থেকে। তাদের ধারণা, পশুর উপর বর্বরতা বন্ধ করতে পারলেই ভবিষ্যতে মানুষের উপর বর্বরতাকে কমিয়ে আনা সম্ভব।
পশু-প্রাণীর উপরে অত্যাচার, হত্যার বিরুদ্ধে যে আইন রয়েছে তা বহু পুরনো। আইন আরও কড়া হলে তবেই অবলা জীবদের উপরে অত্যাচার বন্ধ হবে। অবলা জীবগুলি কে রক্ষা করতে হলে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।।
তথ্যঋণ : বিভিন্ন সংবাদপত্র, নিউজ মিডিয়া এবং অন্যান্য।
মর্মস্পর্শি ঘঠনা।
ঈশ্বরের আপন দেশে সকল মানুষ যে ঐশ্বরিক নয় সেটা বুঝে উঠতে পারেনি ঝাড়গ্রামের ওই
অবলা হাতি।