ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির চিত্রটা ক্রমেই হতাশাব্যঞ্জক হয়ে উঠছে। চলতি অর্থবর্ষের একেবারে শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে এই নিরাশার ছবিটাই ক্রমে ছেয়ে ফেলছে ব্যাবসা বাণিজ্য, বিনিয়োগ তথা অর্থনীতির সর্বত্র। ২০২১ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হিসেব সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বৃদ্ধির আগের পূর্বাভাসের থেকে বেশ খানিকটা কম হারেই বাড়ছে ভারতের সামগ্রিক উৎপাদন। সরকারি তথ্যেই জানা যাচ্ছে, ওই সময়ে মাত্র ৫.৪ শতাংশ হারে বেড়েছে ভারতের জিডিপি। এই হারই বজায় থাকলে কোভিড পূর্ববর্তী স্তরেই থেকে যাবে ভারতের উৎপাদন, আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে এমনই।
২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে দেশে বাড়তে শুরু করেছিল কোভিড সংক্রমণ। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে হঠাৎই জারি করা হয়েছিল লকডাউন। প্রায় চার মাস সার্বিক লকডাউন চলার ফলে গত আর্থিক বছরে, অর্থাৎ ২০২০-২১ সময়পর্বে ভারতের জাতীয় উৎপাদন সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। গত বছরের শেষ দিকে বলা হয়েছিল সংকোচন হয়েছে ৭.৩ শতাংশ হারে। পরে এই হিসেব পাল্টে ফেলা হয়। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী সংকোচনের পরিমাণ ৬.৬ শতাংশ। অর্থাৎ তার আগের বছরের তুলনায় ২০-২১ অর্থবর্ষে কমে গিয়েছিল ভারতের জিডিপি। টাকার অঙ্কে সংকোচনটা কেমন তা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে।

ভারতের জাতীয় উৎপাদন – ২০১৯–২১
২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে, অর্থাৎ পয়লা এপ্রিল ২০১৮ থেকে ৩১ মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত এ দেশের মোট উৎপাদন হয়েছিল ১৪০.০৩ লক্ষ কোটি টাকা।
পরের বছর ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল ১৪৫.৬৯ লক্ষ কোটি টাকা। সুতরাং, ২০১৮-১৯ সালের তুলনায় এই বৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।
এর পরেই এসেছিল কোভিড সংক্রমণ। যার ফলে ২০২০-২১ সালে জাতীয় উৎপাদন সংকুচিত হয় ৬.৬ শতাংশ। টাকার অঙ্কে ২০২০-২১ সালে জাতীয় উৎপাদন ছিল ১৩৫.৫৮ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকা কম।
এই নীচু ভিতের উপর দাঁড়িয়ে চলতি বছরে বৃদ্ধি ৯.২ শতাংশ হবে বলে আশা করা হয়েছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসছে কেন্দ্র। সর্বশেষ অনুমান অনুযায়ী চলতি বছরে এই বৃদ্ধি ৮.৯ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে জাতীয় উৎপাদন হতে হবে ১৪৭.৭২ লক্ষ কোটি টাকা, যেটা ২০১৯-২০ সালের প্রায় সমান। কিন্তু সেটাও কি হবে? সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। কেন? তাহলে দেখতে হবে চলতি বছরের ত্রৈমাসিকগুলোতে জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ কত।

চলতি বছরে ভারতের জিডিপি
বছরটা শুরু হয়েছিল অনেক আশাবাদ দিয়ে। খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পারিষদবর্গ বলেছিলেন, এবার ১১ বা ১২ শতাংশ বৃদ্ধি হবে। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিতে নানা বাগাড়ম্বরের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। গত বছরের সংকোচনের উপরে এ বছরে যে প্রায় সাত শতাংশ বৃদ্ধি না হলে কোভিড পূর্ববর্তী স্তরেও পৌঁছনো যায় না, সেটা বলা হচ্ছিল না। বছরটা যতই গড়ালো, ভাষণের চাকচিক্য মলিন হতে থাকল।
২০২১-২২ – প্রথম ত্রৈমাসিক
চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ ৩২.৩৮ লক্ষ কোটি টাকা, যেটা লকডাউনের সময় থেকে ২০.১৩ শতাংশ বেশি ছিল। মনে রাখতে হবে, লকডাউনের ত্রৈমাসিক অর্থাৎ, ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ তার আগের বছরের থেকে ২৪.৪৩ শতাংশ কমে গিয়েছিল। তাহলে কী দাঁড়ালো? প্রথম ত্রৈমাসিকেই অর্থনীতির ট্রেনের গতি স্লথ হয়ে এল। ২০১৯-২০-র প্রথম ত্রৈমাসিকের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের উৎপাদন ৯.২২ শতাংশ কম হলো।

২০২১-২২ – দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক
২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট উৎপাদন হলো ৩৫.৭৩ লক্ষ কোটি টাকা, যেটা তার আগের, অর্থাৎ লকডাউনের সময় একই ত্রৈমাসিকের তুলনায় ৮.৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট উৎপাদন হয়েছিল ৩২.৯৬ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু কোভিড পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় শূন্য, মাত্র ০.৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি।
২০২১-২২ – তৃতীয় ত্রৈমাসিক
সর্বশেষ এই তথ্যই আমাদের হাতে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, সমস্ত পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণিত করে বৃদ্ধির হার কমে গেল। আগে ভাবা হয়েছিল, তৃতীয় ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ ২০২১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় উৎপাদন বাড়বে ৬.২ শতাংশ হারে। তার বদলে বেড়েছে হতাশাজনক ৫.৪ শতাংশ হারে। এই সময়ে মোট জাতীয় উৎপাদন হয়েছে ৩৮.২২ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ঠিক এই সময়ে জাতীয় উৎপাদন হয়েছিল ৩৬.২৬ লক্ষ কোটি টাকা।

চলতি বছরের তিনটি ত্রৈমাসিক একত্রে জাতীয় উৎপাদন হয়েছে ১০৬.৩৩ লক্ষ কোটি টাকা। এই সংখ্যা করে আরও কমতে পারে। আমরা বারাবার দেখছি, মোদি সরকারের আমলে সংখ্যা প্রথম একরকম বলা হয়; অনেক পরে, যখন ওই বিষয়টা নিয়ে সাধারণ মানুষের স্তরে হইচই কমে যায়, তখন সংখ্যা পরিবর্তন করা হয়। যাই হোক, আপাতত আমাদের ধরে নিতে হবে, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম তিনটি ত্রৈমাসিকে মোট উৎপাদন হয়েছে ১০৬.৩৩ লক্ষ কোটি টাকা। বাকি রয়েছে কেবল চতুর্থ ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ সময়কাল। আমরা দেখেছি, লকডাউনের বছরে জাতীয় উৎপাদন ছিল ১৩৫.৫৮ লক্ষ কোটি টাকা। আরও প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকা চলতি ত্রৈমাসিকে উৎপাদন হলে লকডাউনের বছরের তুলনায় কিছুটা এগনো যাবে। সেটা হয়তো হবে। কিন্তু লকডাউনের আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৪৫.৬৯ লক্ষ কোটি টাকা। সেটা ধরতে গেলে চলতি ত্রৈমাসিকে প্রায় ৪০ লক্ষ কোটি টাকা হওয়া দরকার। হবে কি? হলেও হতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা কেবল কোভিড পূর্ববর্তী বছরের স্তরেই পৌঁছব। অর্থাৎ টানা দু’বছর ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্যারেড করছি আমরা। আর যদি চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৪০ লক্ষ কোটি টাকা উৎপাদন না হয়, তার থেকে কম হয়, তাহলে বলতে হবে, সব ভাষণ সত্ত্বেও আমাদের হাতে রইল সংকোচনের লজ্জা।
জিডিপি বৃদ্ধি – মূল্যায়ন সংস্থাগুলির মতামত
আর ক’দিন পরেই শেষ হবে চলতি অর্থবর্ষ। আশা করা হয়েছিল, ১ এপ্রিল ২০২১ থেকে ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত চলতি অর্থবর্ষে গত বছরের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে এগনো যাবে বৃদ্ধির স্বস্তিতে। তা যে হচ্ছে না, সেটা পরিষ্কার। এবারের জিডিপি ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের জিডিপি-র কম হলে তা সত্যিই আশঙ্কার। মরার ওপরে খাঁড়ার ঘায়ের মতোই নানা আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থা বৃদ্ধির অনুমান ক্রমেই কমাচ্ছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের ইউ এন কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্প্রতি ভারতের বৃদ্ধির হার কমিয়ে দিয়েছে। আগে তারা বলেছিল, বৃদ্ধি হবে ৬.৭ শতাংশ, এখন বলছে তা হবে মাত্র ৪.৬ শতাংশ।
মূল্যায়ন সংস্থা মুডি’জ আগে ভেবেছিল বৃদ্ধি হবে ৯.৫ শতাংশ। বর্তমানে তারা এই বৃদ্ধির হার কমিয়ে করেছে ৯.১ শতাংশ।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মূল্যায়নটি সত্যি হলে ভারতের জাতীয় উৎপাদন ২০১৯-এর থেকেও কমে যাবে। দেশে অভূতপূর্ব ভাবে বাড়ছে জিনিসের দাম। ফেব্রুয়ারি মাসে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৬.০৭ শতাংশ হারে। পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি এর দ্বিগুণ। চলতি মাসে পরপর পেট্রোল-ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, শাক-সবজি থেকে রোজকার দরকারি জিনিসের দরদাম সাংঘাতিক ভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে কর্মহীনতার হারও। এই পরিস্থিতিতে ভারত এক পা এগোতে গিয়ে দু’পা পিছিয়ে আসছে কি-না, উঠছে সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
দেশের শ্রমজীবী মানুষ দু’দিনের ধর্মঘট করছেন। কেউ তা সমর্থন করতে পারেন, কেউ না-ও পারেন। ধর্মঘট কতটা সফল বা ব্যর্থ, চলতে পারে তা নিয়ে বিতর্ক। কিন্তু এই কর্পোরেট বান্ধব, গরিব বিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদটাকে সম্মান না জানিয়ে কোনো উপায় থাকে কি?