“কলকাতায় তখন সাহেবদের বড়ো দোকান (আজকাল যাকে বলে ডিপার্টমেন্ট স্টোর) ছিল হোয়াইটআওয়ে লেইডল। …বিশাল দোতলা দোকানের পুরো দোতলাটা বড়োদিনের কটা দিন হয়ে যেত টয়ল্যান্ড। একবার মার সঙ্গে গেলাম এই টয়ল্যান্ড দেখতে। তখন দেশে সাহেবদের রাজত্ব। হোয়াইটআওয়ে সাহেবদের দোকান। বিক্রেতারা সব সাহেব। যারা খদ্দের তাদেরও বেশিরভাগই সাহেব মেমসাহেব।”
‘যখন ছোট ছিলাম’ এর স্মৃতিকথায় সত্যজিত রায় যে সাহেবি দোকানের কথা বলেছেন, সেই হোয়াইটএওয়ে এন্ড লেইডল ছিল কলকাতার সেরা এম্পোরিয়ামগুলির অন্যতম, যাকে ইংল্যান্ডের হ্যারডস্ এর সঙ্গে তুলনা করা হতো। আর যে বাড়িটির দোতলায় ছোট্ট সত্যজিত গিয়েছিলেন, সেটি বর্তমানে মেট্রোপলিটন বিল্ডিং নামে পরিচিত। কলকাতার তৎকালীন বিখ্যাত নির্মাণসংস্থা ম্যাকিনটশ বার্ণ এন্ড কোং ১৯০৫ সালে নির্মাণ করেছিল হোয়াইটএওয়ে, লেইডল এন্ড কোং এর প্রধান শাখার প্রাসাদোপম বাড়িটি। চৌরঙ্গী রোড আর সুরেন ব্যানার্জী রোডের সংযোগস্থলে বারোক স্টাইলে নির্মিত এই অনবদ্য গঠনশৈলীর বাড়িটিতে একতলা ও দোতলায় ছিল এম্পোরিয়াম আর তিনতলা ও চারতলায় ছিল বাসগৃহ আর অফিস (ভিক্টোরিয়ান চেম্বার্স)। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, হোয়াইটএওয়ের বাড়িতেই আরেক বিখ্যাত ডিপার্টমেন্ট স্টোর “হল এন্ড অ্যান্ডারসন” কয়েক বছর ছিল।

রবার্ট লেইডল ছিলেন বৃটেনের একজন সফল ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিক। লিবারেল পার্টির এম.পি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ব্যবসার সূত্রে ১৮৭৭ সালে ভারতে এসে কলকাতায় প্রায় কুড়ি বছর থেকে গিয়েছিলেন। ১৮৮২ সালে রবার্ট লেইডল কলকাতায় ব্যবসা শুরু করলেন। তাঁর ব্যবসায়ে অংশীদার হয়েছিলেন এডওয়ার্ড হোয়াইটএওয়ে। এডওয়ার্ড হোয়াইটএওয়ে কাজ করতেন কলকাতার তদানীন্তন বৃহত্তম কাপড় ব্যবসায়ী (draper) সংস্থা ফ্রান্সিস, হ্যারিসন হাথাওয়ে অ্যান্ড কোং তে।
যাত্রা শুরু করল প্রখ্যাত ‘হোয়াইটএওয়ে, লেইডল এন্ড কোং’ , যার চেয়ারম্যান ছিলেন লেইডল। পরে ১৮৯৯ সালে কোন কারণে হোয়াইটএওয়ে ব্যবসা থেকে সরে গেলেও লেইডল-এর নেতৃত্বে ব্যবসা এগিয়ে চলতে থাকে। সারা ভারতে এই প্রতিষ্ঠানটির শাখা ছিল (তৎকালীন) বম্বে, মাদ্রাজ, লাহোর, সিমলা প্রভৃতি বিভিন্ন শহরে। এমনকি ভারতের বাইরে কলম্বো, সিঙ্গাপুর, সাংহাই, কুয়ালালামপুরেও শাখা খুলে ফেলেছিল।

হোয়াইটএওয়ে, লেইডল এন্ড কোং এর বিশেষত্ব ছিল যে এখানে ধারবাকীর কোন কারবার ছিল না। ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতিতে বিশ্বাসী এই স্টোরটির ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল “Right away and paid for”। আরেকটি বিশেষত্ব ছিল এদের সাহেবিয়ানা। সম্পূর্ণ ইউরোপীয় রুচি পছন্দের দ্রব্যসামগ্রী এখানে পাওয়া যেত ,যার ফলে প্রধানত সাহেব-মেমরাই এখানে ক্রেতা ছিলেন। ক্রিসমাসের সময়ে এদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন সাহেব পরিবার সাগ্রহে সংগ্রহ করতেন এদের ক্যাটালগ, ক্রিসমাসের বিশেষ কালেকশন থেকে বাছাই করে কেনাকাটার জন্য।
সাহেব মেমসাহেবদের ঘর-সংসারের জন্য যাবতীয় সামগ্রী, ক্রকারি, কাটলারি বেছে বেছে আমদানি করা হতো খাস বিলেত থেকে। যেমন ছুরি আসত শেফিল্ড থেকে। পোশাকের বিভাগের সঙ্গে ছিল টেইলরিং বিভাগ। এদের তৈরী পোশাকের বিশেষ সুনাম ছিল। বিজ্ঞাপনী প্রচারের কৌশল হিসেবে হোয়াইটএওয়ে লেইডল যে পিকচার পোস্টকার্ড ছাপাত , সেরকম একটি পোস্টকার্ডে দেখা যায় যে একদিকে ছাপা দোকানের ‘আইকনিক’ বাড়িটির ছবি, অন্যদিকে লেখা — “Whiteaways have up-to-date departments where every article of ready-to-wear clothing may be had for Ladies and Men. Suits or dresses made to order in 24 hours”

এখানে আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘টি রুম’। এই চা-ঘরে বিভিন্ন স্বাদগন্ধের চা পরিবেশিত হতো এবং সে চা আসতো দার্জিলিঙে রবার্ট লেইডল’র নিজস্ব চা বাগান মেরীবংগ ও গুম্বা চা বাগান থেকে। সুসজ্জিত টি রুমে মনোরম পরিবেশে দার্জিলিঙ চা সেবন করার জন্য সুসজ্জিত সাহেব মেমরা ভীড় করতেন, বিশেষ করে রবিবারে।
সেই সময়ে হোয়াইটএওয়ে লেইডল-এর কলকাতার দোকানটি খুব নামী ও দামী দোকান হিসেবে গণ্য হতো। সাহেব অফিসাররা এখানেই কেনাকাটা করতে পছন্দ করতেন।

হোয়াইএওয়ে লেইডল-র দিন ফুরোল ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে। সাহেবরা দলে দলে চলে যাওয়ায় এবং স্বাধীন দেশের নতুন সমাজে ক্রেতাদের রুচি-পছন্দ ক্রমে পালটে যাওয়ায়, এদের ব্যবসায়ে ভাঁটা পড়ে গেল। যদিও স্বাধীনতার পরে পনের বছর অবধি হোয়াইটএওয়ে লেইডল কলকাতায় টিঁকে ছিল, কিন্তু 1962 সালের পর এরা কলকাতা তথা ভারত থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলল। মুছে গেল হোয়াইট ,লেইডল এন্ড কোং এর সাইনবোর্ড।
তথ্য : Institutional Repository NBU, যখন ছোট ছিলাম : সত্যজিৎ রায়, Article by DBH Ker at Flicker.com