গান্ধিজির আন্দোলন জুড়ে চরকার একটা বিশেষ স্থান আছে। চরকার মূল কথা হচ্ছে তার চাকা। আর এই চাকার ধারণা মানুষের অগ্রগতির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত। চাকা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ দ্রুত গতিতে তাদের সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটিয়েছে। সেই ধারণা থেকেই বোধহয় গান্ধিজি চরকাকে ভারতবাসীর সার্বিক উন্নয়নের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসেই গান্ধিজি ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে একটি পুস্তিকা লিখেছিলেন। এখানে তিনি শাশ্বত সত্যের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র সমাজ বা রাষ্ট্রের কল্পনা করেছিলেন। তিনি এই সমাজের নাম দিয়েছিলেন ‘রামরাজ্য’। তাঁর লেখা থেকেই বোঝা যায় এই রাম কোনো ইতিহাস বা রামায়ণের ব্যক্তিরাম নয়, এই রাম সত্য এবং অহিংসার প্রতীক। গান্ধিজির এই রামরাজ্যের প্রতিটি মানুষ সত্যবাদী, অহিংস, আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মনির্ভরশীল। টলস্টয় যে রাজ্যকে বলেছিলেন ‘কিংডম অফ গড’। গান্ধিজি এই রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম এবং তার প্রতীক হিসাবে ভেবেছিলেন চরকাকে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ার্ধা জেলে গান্ধিজি প্রথম চরকায় সুতো কেটেছিলেন। ‘হরিজন’ পত্রিকায় তিনি একবার লিখেছিলেন ‘আমি চরকাকে সৌর জগতের কেন্দ্র বিন্দুতে সূর্যের স্থান দিয়েছি এবং কুটির শিল্পকে দিয়েছি গ্রহ-উপগ্রহের স্থান।’ চরকার মাধ্যমে পল্লিগ্রামের কপর্দকহীন মানুষ তাদের অবসর সময়ে বিশেষত বাড়ির মহিলারাও কিছু রোজগার করতে পারত। যদিও সামান্য সেই রোজগার তবু তার উপর দাঁড়িয়ে তারা কিছুটা স্বনির্ভর হতে পারত। এর চেয়েও বড়ো কথা চরকাকে কেন্দ্র করে তারা একতাবদ্ধ হাতে পারত, সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে গ্রামের উন্নয়নের কাজ করতে পারত। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার গান্ধিজির ‘চরকা দর্শন’ কে সমালোচনা করে বলেছিলেন ‘চরকা আন্দোলন হল বিজ্ঞান
বিমুখতার নিদর্শন এবং দারিদ্র্য ও কৃপণতাকে পূজা করারই নামান্তর স্বরূপ। গান্ধিজি উত্তরে বলেছিলেন — ‘রবীন্দ্রনাথ বাস্তবকে এড়িয়ে পশ্চিমি ভঙ্গিতে দেখছেন ভারতবাসীকে। কোটি কোটি ভারতবাসী যেখানে অন্নহীন, বস্ত্রহীন, বৃত্তিহীন সেখানে পশ্চিমি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চিন্তা কেবল স্বপ্ন দেখা মাত্র এবং এর থেকে নেমে আসবে হতাশার নিঃসীম অন্ধকার। কারণ পশ্চিমি সভ্যতার ধর্ম হল বিশ্বকে শোষন করে বেঁচে থাকা, এই মিথ্যা ধর্ম চিরকাল টিকবে না এবং একদিন তা মুখ থুবড়ে পড়বেই। চরকা অন্দোলন শুধু তো সুতো কাটার মধ্যেই থেমে থাকবে না। চরকার অবিচল ঘূর্ণনকে ঘিরে গড়ে উঠবে উন্নয়নের নানা কর্মসূচি। পারস্পরিক সহযোগিতার আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ মিটিয়ে ফেলবে নানা গ্রামীণ বিবাদ। চরকাকে ঘিরে গড়ে উঠবে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম।’ আমরা আগেই জেনেছি গান্ধিজির এই চরকা আন্দোলনের মাধ্যমে গ্রাম পুনর্গঠনের কর্মসূচির মধ্য দিয়েই আরামবাগ মহকুমায় গান্ধিবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বন্যাত্রাণে এসে তিনি আরামবাগ থেকে আর ফিরে গেলেন না। বড়ডোঙলে গান্ধি আশ্রম স্থাপন করে সেখানেই রয়ে গেলেন। শুরু হল আরামবাগের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়, চরকার প্রচারের মাধ্যমে। স্থানীয় বেশ কিছু মানুষ এগিয়ে এলেন সহযোগিতার জন্য। এঁদের মধ্যে কাছড়ার মুকুন্দ পণ্ডিত, হুগলি বিদ্যামন্দির থেকে আসা সাগরলাল হাজরা, ধান্যঘোরির কালীপদ দাস কর্মকার, মানিকপাটের অনুকূল চক্রবর্তী, নাঙ্গুলপাড়ার প্রাণকৃষ্ণ মিত্র, বড়ডোঙলের হরিনারায়ণ রায়, নরেন্দ্রনাথ হাজরা, ডহরকুন্ডুর রামপদ বেরা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। প্রথমে খানাকুল থানার দুয়াদন্ডে এবং তারপর গোঘাট থানার নকুন্ডা গ্রামে খাদিকেন্দ্র স্থাপন করা হল। জোরকদমে শুরু হল খাদির কাজ। দুঃস্থ মহিলাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চরকা চালানোর প্রশিক্ষণ দিতে লাগল স্বদেশি কর্মীরা। প্রধানত, নকুণ্ডা এবং দুয়াদণ্ড এই দুই খাদিকেন্দ্র থেকে দুঃস্থ মহিলাদের তুলো দেওয়া হত। গ্রামীণ ভাষায় তাকে বলা হত ‘রুয়ো’। এই রুয়ো দিয়ে চরকায় সুতো কেটে তারা খাদিকেন্দ্রে জমা দিত এবং মজুরি নিয়ে যেত। যারা সুতো কাটত গ্রাম্য ভাষায় তাদের বলা হত ‘কাটুনি’।
মুকুন্দ পণ্ডিতকে প্রায়ই দেখা যেত বিরাট আকারের তুলোর বস্তা নিয়ে দূর দূর গ্রামে কাটুনিদের কাছে তুলো পৌঁছে দিতে। তখনকার দিনে সুতো কাটার সময় বেশ কিছু চরকার গান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। যেমন — চরকা আমার ভাতার পুত/ চরকা আমার নাতি / চরকার দৌলতে মোর / দুয়ারে বাঁধা হাতি।’ আরো একটি জনপ্রিয় গান — ‘মা জননী চরকা কাটো/ বাবা পিতা তুলো ধুনো রে।’ চরকাকেই দুর্দিনের সহায় বুঝে নিয়ে সহায় সম্বলহীন মানুষ চরকার কাজে লেগে গেল মহা উৎসাহে। কিছু কিছু রোজগার হাতে পেয়ে একটু স্বস্তির মুখ দেখল তারা। ক্রমশ বাড়তে থাকল কাটুনির সংখ্যা। রুয়ো নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে গেল তাদের মধ্যে। তখন আরামবাগ মহকুমায়, বিশেষ করে খানাকুল, গোঘাট এবং আরামবাগ অঞ্চলে প্রতিবছর চরকা সম্মেলন হত। এই রকম এক সম্মেলনে আসার অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে রতণমণি চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “পরদিন সকালবেলা সুতা কাটিতেছি। একজন স্ত্রীলোক ডাকিল, ‘হ্যাঁ গো বাবা।’ মুখ তুলিয়া বলিলাম, ‘কী গা।’ ‘তুলো এসেছে কিগা বাবা?’ ‘হ্যাঁ গো এসেছে’। শুনিয়া তাহার মুখ হর্ষোৎফুল্ল হইল। ‘এখনি আসছি বাবা একটু ঘুরে।’ তারপর একজন, দুইজন করিয়া আসিতে লাগিল। সকলেই স্ত্রীলোক, সকলেই গরিব, সকলেই তুলোর খোঁজে। সকলেরই পরনে ময়লা ছেঁড়া কাপড়, সকলেরই রুক্ষ কেশ, মলিন মুখ। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, ইহারা সকলেই মুসলমানের ঘরের। একটা ছোট্ট মেয়ে বয়েস নয় কি দশ। বড়ো লাজুক। নিজ হাতে কাটা সুতার গোছা কত যত্ন করিয়া আঁচলে বাঁধিয়া আনিয়াছে। সমুখে তুলার বস্তার দিকে চাহিয়া তাহার বড়ো বড়ো চোখ দুটি আনন্দে ছলছল করিতে লাগিল। একজন বৃদ্ধা আসিল সকলের শেষে। বলিল, ‘আহা বাবা, তুলো এসেছে শুনে এলুম।’ ‘বোসো বাছা, তোমার ঘরে কে আছে?’ ‘কেউ নেই বাবা, আমার পোড়া কপাল।’ ‘ছেলেপুলে আপনার জন কেউ নেই?’ ‘একটা গোরু বাছুরও নেই। তোমরা যা এই তুলোটুকু দাও, তাই সুতো কেটে আনি। আর দু-এক পয়সা মজুরি যা পাই, তাতে কোনো মতে পেটটা চলে যায়। তোমরাই ভরসা গো বাবা ঠাকুর।’ ইহাদের সকলকেই একে একে তুলো ওজন করিয়া দেওয়া হইল। সূতা কাটার মজুরি যার যাহা পাওনা খুশি হইয়া লইয়া গেল। মজুরির পয়সা হইতে দু-পয়সার তেল, আধ পয়সার নুন, এক পয়সার কেরোসিন, এই সব কেনাকাটা করিয়া ইহারা ঘরে ফিরিবে। সপ্তাহে চারটে ছটা পয়সা মজুরি লইবার জন্য ইহারা বর্ষাকালে এক কোমর জল ভাঙিয়া আসে। ইহার অভাবে এদের দিন যাত্রা অচল।
এদিকে প্রফুল্লচন্দ্র সেন এবং তাঁর সহকর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চরকা কেমন করে আরামবাগের অসহায় মানুষ জনের ত্রাণের কাজে লেগেছিল মহাত্মা গান্ধিজি সম্পাদিত ‘ইয়ং ইণ্ডিয়া’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় ভূপেন্দ্রনারায়ণ সেনের একটি চিঠি এবং মহাত্মাজির মন্তব্য উল্লেখ করে তা বর্ণনা করা হয়েছে। “হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমায় দুয়াদন্ড নামে একটি গ্রাম আছে। সেটি রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থান রাধানগরের প্রায় ৭ মাইল পশ্চিমে। ১৯২২ সালের জুন মাসে এই জায়গায় দ্বারকেশ্বর নদের প্রবল প্লাবন আসে। হুগলি জেলা কংগ্রেস কমিটি বন্যা পীড়িত অঞ্চলে ত্রাণের কাজের জন্য আমার বন্ধু প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে পাঠান। প্রফুল্ল যখন বন্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উপায় হিসাবে চরকা বিতরণের কথা বলে, তখন বন্যাত্রাণ কমিটি তাঁকে উপহাস করেছিল। তার যুক্তি ছিল বন্যাকে অনুসরণ করে দুর্ভিক্ষ আসে, এই চরকাই হবে বন্যা এবং দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে জীবনবিমার মতো। উপহাসে নিরুৎসাহিত না হয়ে আমার বন্ধুটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল যে সে আরামবাগের মতো হুগলি জেলার এই অনগ্রসর অঞ্চলে চরকাকে সফল করে তুলবেই। তিনজন মাত্র সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে সে তার কর্মস্থলের সংলগ্ন গ্রামগুলির ঘরে এক বস্তা তুলো নিয়ে, একটি চরকা নিয়ে এবং অন্যান্য সাজ সরঞ্জাম নিয়ে ঘুরতে আরম্ভ করল। যারা যুবক তারা ওর মুখের উপরেই উপহাস করতে লাগল।
কিন্তু বয়স্করা সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে মন্তব্য করল যে গ্রাম জীবনে অবশ্যই একটা সময় ছিল যখন গানের মতো চরকা গুঞ্জনেও গ্রামের জীবন মুখরিত হতো। অবশেষে তারা প্রায় ১২টি চরকা চালু করার কাজে সফল হল এবং কাটুনিদের নিয়মিতভাবে তুলো এবং মজুরি দিয়ে যেতে আরম্ভ করল। যাতে করে এরা পর্যাপ্ত পরিমাণে সুতো কেটে, তাঁত বুনে নিতে পারে, সেজন্য প্রফুল্ল তাদের মজুরির বিনিময়ে আরো তুলো দিত। পাঁচ তোলা সুতোর পরিবর্তে একজন কাটুনি পেত ১০ তোলা তুলো। আর যারা অভাবী তাদের সে প্রতি তোলা সূতো কাটার জন্য ৩ পয়সা করে দিত। ধুনাই-এর কাজ কাটুনিরা নিজেরাই করে নিত। এই ১২ জন কার্টুনির অবিচলতা এবং আগ্রহ এবার যুবক এবং বৃদ্ধ উভয় প্রজন্মকেই আকৃষ্ট করল। যে সব লোকেরা এতদিন চরকা দেখলে নাসিকা কুঞ্চন করতো এখন তারাই মেয়েদের নিজের হাতে তৈরি সূতো থেকে নিজেদেরই তাঁতে বোনা সুন্দর সুন্দর খদ্দরের শাড়ি দেখে অবাক হয়ে গেল। আবার যারা এগুলি করে মজুরি পাচ্ছিল তাদের ভাগ্যকে হিংসে করতে লাগল। এরা এখন আমার বন্ধুর কাছে চরকা চাইতে এল এবং প্রতিজ্ঞা করল তারা নিয়মিতভাবে চরকা চালাবে। তিন চার মাসের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১০০তে গিয়ে পৌঁছাল। এইভাবে আমার বন্ধুর সংগঠন ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে সর্বোত্তম কাজ আদায় করল। এরা সবাই খদ্দরের ব্যবহার শিখল। আর এই ভাবেই আমার বন্ধুর সাংগঠনিক শক্তি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হল। এই চরকা সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে প্রথম এগিয়ে এলেন মুসলমান মহিলারা। অবশ্য তাদের হিন্দু ভগিনীরাও অনতিবিলম্বে এই নবজাগরণের শামিল হল। এখন এই সংখ্যা ২০০-র বেশি।
‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকাতে গান্ধিজি যে মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেছিলেন তার মূলে ছিল ভূপেন্দ্রনারায়ণ সেনের তাঁকে লেখা একটি চিঠি। সেই চিঠিটিও তিনি ঐ পত্রিকাতে প্রকাশ করেছিলেন। ওই পত্রের একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ নীচে দেওয়া হল। “এই খাদি কর্মসূচিতে অথবা গ্রামের কাজ করার ব্যাপারে আমার যে পরিবর্তন তা হয়তো আপনাকে কিছুটা আগ্রহী করতে পারে। আমি কলকাতায় জোড়াবাগান কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক হিসাবে কাজ করছিলাম। আমার বন্ধু প্রফুল্লর আমন্ত্রণে তার কাজ দেখতে আমি এখানে এসেছিলাম। আর এইখানেই শুধুমাত্র এইখানে এসেই জাতীয় জীবন গঠনে চরকার সম্ভাবনা সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত হলাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবিশ্রান্তভাবে এখানে যুবক এবং বৃদ্ধ সবাই সুতো নিয়ে আসছে। হয় তারা এর পরিবর্তে দ্বিগুণ তুলো চায় অথবা বুননির চাহিদা অনুযায়ী তারা এগুলি বিক্রি করে মজুরি পেতে চায়। বয়স্ক কাটুনিরা প্রত্যেকেই তাদের নিজেদের হাতে কাটা খদ্দরের সুতোর শাড়ি বুনে তা পরে আসে। আগে যাদের মুখ দেখতাম ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর, এখন দেখি সেই মুখ আনন্দে ঝক্ঝক্ করছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম এবং বুঝলাম, আমার বন্ধুর কাজের ফলে ক্ষুধার নেকড়েরা তাদের দরজা থেকে সরে গেছে, যে সব মহিলারা আগে ভিক্ষা করত এখন তাদের অবস্থা ভালই। তুলো ধোনা, সুতা কাটা ইত্যাদি কাজে সারাদিন ব্যস্ত থাকার দরুন তাদের আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করার সময় নেই। এদের স্বামীরাও আর এদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। কেননা, তারা দেখছে যে তাদের স্ত্রীরা পরিবারের অর্থ জোগানোর ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছে। আর এই ভাবেই তাদের ইজ্জত রক্ষা পাচ্ছে। আমি এত কথা এই জন্য জানতে পারলাম কারণ এখানে আমার পরিচয় দেওয়া হল একজন খাদি কর্মী হিসাবে। তা নাহলে এইসব পরদানশীল মহিলারা কিছুতেই বিদেশির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলতেন না। সন্ধে হয়ে এল, গ্রামাঞ্চলের পুরুষেরা একে একে খাদি কেন্দ্রে এসে জুটতে লাগল আমার বন্ধুর কথাবার্তা শোনার জন্য এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে আলাপ আলোচনার জন্য তারা নিয়মিত এবং প্রতিদিনই আসত।
এরা সবাই এই কর্মসূচির প্রতি তাদের গভীরতম সহানুভূতি জানায় এবং প্রার্থনা করে, এমন কাজ চিরকাল চলুক। এই সান্ধ্য সমাবেশ দেখে আমার মনে হল আপনারই একটি সুন্দর কথা — সরকারের সঙ্গে অসহযোগ করা হবে জনসাধারণের সঙ্গে অধিকতর সহযোগের জন্য। আমার মনে হল আপনার কথা সফল করার জন্য এই পথই সবচেয়ে সঠিক। এই পত্রটি উদ্ধার করার পর গান্ধিজির মন্তব্য: এই চিঠি থেকে বোঝা যায় একটি ছোটো সংগঠন কত বড়ো কাজ সার্থকভাবে করতে পারে এবং যদি তাদের কাছে ঠিকমত ভাবে উপস্থাপিত করতে পারা যায় তাহলে কত সহজে জনসাধারণ চরকাকে গ্রহণ করে নেয়। এই চরকা, যারা নিজেদের বাঁচার জন্য ভিক্ষে করত, তা তাদের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিল্পীতে পরিণত করবে, এদের একতায় দৃঢ়বন্ধ শিক্ষিত অথবা, অশিক্ষিত, ধনী অথবা দরিদ্র যাই হোক না কেন করবে, আর অন্য কিছুই এটা করতে পারবে না।” প্রসঙ্গত, খানাকুল থানার কুমারহাটের একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী বাদলচন্দ্র মাজির কথায় — তখন বোধ হয় ১৯৩৩-৩৪ খ্রিস্টাব্দ হবে। মেজদা কালীপদ মাজির একটি দর্জির দোকান ছিল খানাকুলে। সেখানেই কাজ করতেন তিনি। দাদা দুয়াদণ্ড থেকে খদ্দরের কাপড় নিয়ে আসতেন প্রায়োজন মতো জামা প্যান্ট ইত্যাদি তৈরি করে আবার সেখানে দিয়ে আসতেন, সেখান থেকে এইসব পোশাক বিলি বা বিক্রি করা হত। কালক্রমে এই দেওয়া নেওয়ার কাজে তাঁকে যুক্ত হতে হয়। স্বদেশি কর্মীদের সঙ্গে পরিচয় হতেই তাঁদের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন এবং পরবর্তীকালে জরুর গ্রামের কালীপদ সিংহরায়ের অনুপ্রেরণায় সরাসরি স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে গান্ধিবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। কালীপদ সিংহরায়ের নেতৃত্বে খানাকুলের দক্ষিণ অংশ জুড়ে এই সময় ব্যাপকভাবে চরকা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বাদলচন্দ্র চরকার প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্যদের চরকা শেখাতেন। সেই সময় কুমার হাটে চরকা তৈরিও হত।
বাদলবাবুর মতে গ্রামের দরিদ্র মানুষরা যে গান্ধিজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবে সবাই চরকা কাটত এমন নয়। প্রথমে তারা নিজেদের প্রয়োজনে, কিছু রুজি রোজগারের জন্যই চরকা হাতে নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এই কাজ করতে করতে নিজেদের প্রয়োজনেই তারা সংঘবদ্ধ হল এবং ক্রমশ প্রফুল্লচন্দ্র বা অন্যান্য নেতাদের সংস্পর্শে এসে অনেকেই গান্ধিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। তখন খানাকুলের এই সব এলাকায় চরকার কাজ পরিচালনা করা হত দুয়াদন্ড খাদিকেন্দ্র থেকে। পরবর্তীকালে খানাকুলে আরো কয়েকটি খাদিকেন্দ্র খোলা হয়েছিল। প্রফুল্লচন্দ্র সেন তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, “আমরা তখন চরকার কাজ আরম্ভ করেছি, সুতো কাটার কাজ। তার সঙ্গে সঙ্গে ওখানে নীচের দিকে বিশেষ করে ‘সিডিউলড কাস্ট’ এলাকায় প্রাইমারি পড়ানোর কাজ শুরু করি। আমরা সবশুদ্ধ পনেরো-ষোলোটি প্রাইমারি স্কুল করেছিলাম।চরকা তিনশো- চারশোটি। আরামবাগে চরকার খুব নাম হয়েছিল, খদ্দের হত খুব। আমরাও শুরু করি সূতো কাটা, তার থেকে খাদি কাপড় তৈরি করে কলকাতায় বিক্রি করে আসতাম।”তৃতীয়বার জেলে যাবার বার সময়ে পুলিশ আমাদের দুয়াদণ্ড চরকা কেন্দ্র সার্চ করতে আসে।তখন দারোগাও সেখানে আসে। যারা সব কাটুনি তারাও সব এসে উপস্থিত হল। গরীব মুসলমান চাষি মেয়েরাও উপস্থিত। পুলিশ তাদের কাছেও চা খাবার জন্য দুধ চাইল। তখন তারা বলল, ‘তোমরা আমাদের সর্বনাশ করতে এসেছ। তোমাদের দুধ দেব না। তোমাদের ছাই দেব।’
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে খানাকুল থানার সাবলসিংপুরে একটা চরকা সম্মেলন হয়েছিল। ধান্যঘোরির কালীপদ দাসকর্মকার আর সুন্দরপুরের জমিদার এবং বিশিষ্ট কংগ্রেস কর্মী গোপালচন্দ্র কর্মকার ছিলেন এই সম্মেলনের মূল উদ্যোক্তা। এখানে হাতেনাতে তুলো পেঁজা, ধোনাই করা, পাঁজ তৈরি করা, সুতো কাটা এইসব শেখানো হয়েছিল। প্রখ্যার কংগ্রেস নেতা রতনমনি চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র লাহা প্রমুখ এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এখানে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক নিজের কাপড় নিজেই তৈরি নেবার প্রতিজ্ঞা করে। সম্মেলনের পর বাস্তবিকই চরকার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। চরকার আকার প্রকারেরও প্রভূত উন্নতি হতে আরম্ভ করে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে। বক্সচরকা থেকে অম্বরচরকা প্রভৃতি উন্নত শ্রেণির চরকা শুরু হয়ে যায়। প্রায় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে সমস্ত আন্দোলনের সময়টাকেই একটা শক্ত সুতোর বাঁধনে বেঁধে রেখেছিল এই চরকা। চরকা আন্দোলনের সূত্র ধরেই
নানারকম গঠনমূলক কাজ এবং সর্বোপরি স্বাধীনতার যুদ্ধ সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে চলেছিল আরামবাগ মহকুমা জুড়ে। চরকা এই এলাকার দীনতম কুটিরগুলোতে যে শুধু স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছিল তাই নয় এখানকার হতভাগ্য লাঞ্ছিত মুখে ভাষা এনে দিয়েছিল। যা দুরন্ত প্রতিবাদের ভাষা। বুকে এনে দিয়েছিল দুর্বার সাহস,যা ছিল আরামবাগের স্বাধীনতা সংগ্রামের চালিকা শক্তি। এই চালিকা শক্তির পিছনে যাঁরা ছিলেন তাঁরা আজও স্মরণীয় ও বরণীয়। স্বাধীনতা দিবসে তাঁদের নতমস্তকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতেই হয়।
তথ্য সূত্র : স্বাধীনতা আন্দোলনে আরামবাগ — দেবাশিস শেঠ।