কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করেন নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার দাঁড়িয়ে আছেন হাতজোড় করে। কি বলবেন কর্তা। কর্তা হলেন মোদি-শাহ। রাজীবকুমার, জ্ঞানেশকুমার থাকেন হুকুমের অপেক্ষায়। চলছিল বেশ। ২০২৪এর নির্বাচনে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। এবার ভোটচুরির অভিযোগে উত্তাল দেশ। বেশ কিছু কাগুজে প্রমাণ হাতে নিয়ে জনসভা কাঁপাচ্ছেন বিরোধী নেতা। শুধু বিরোধী রাজনৈতিক নেতা নন, শীর্ষস্থানীয় আমলারাও বলছেন ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও এখন তাঁরা শাসক দলের অনুগত প্রতিষ্ঠানের মতোই কাজ করছেন। প্রাক্তন সচিব, রাষ্ট্রদূত, পুলিশ প্রধান ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মতো ৬৬ জন আমলা রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশনের ‘নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব ও মেরুদণ্ডহীনতা’র অভিযোগ করে চিঠি লিখেছেন।
এই পরিস্থিতিতে মনে পড়ে যায় তিরুনেল্লাই নারায়ন আইয়ার শেসানের কথা। রাজনৈতিক নেতাদের স্বেচ্ছাচার, ভণ্ডামি আর ছলনায় মানুষ যখন তিতিবিরক্ত, ঠিক সেই সময়ে তারা শুনতে পেল এক বাঘের হুংকার। মুণ্ডিত মস্তক, আকারে-প্রকারে বিশাল সেই বাঘ বলছেন, ‘গাজরের মতো আমি রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতাদের চিবিয়ে খাই।’
সেই বাঘের নাম টি এন শেসান।
তাঁর হুংকার শুনে সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরে গুঞ্জরিত হয়ে উঠল একটা স্বপ্ন। পারবেন, ইনি পারবেন। পারবেন অসাধ্য সাধন করতে। আমাদের যাঁরা টাইট করে রেখেছেন, তাঁদের ইনি পারবেন টাইট করতে। ইনি তো এলেবেলে সাধারণ নন। যেমন চৌখশ ছাত্র, তেমনি দুঁদে আমলা। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুই স্তরে পদার্থবিদ্যায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। আই পি এস ও আই এ এস-দুটোতেই সর্বোচ্চস্থানাধিকারী। বুদ্ধিমান, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন। কর্মজীবনে বড় বড় পদের অভিজ্ঞতা। পরমাণু দপ্তরের ডিরেক্টর, মহাকাশ গবেষণা দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব, পরিবেশ ও বণ্যপ্রাণী দপ্তরের সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, ক্যাবিনেট সচিব, যোজনা কমিশনের সদস্য। অবশেষে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার।
তখনকার প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের দূত হয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী সুব্রহ্মনিয়াম এই প্রস্তাব নিয়ে রাত একটার সময় হাজির হয়েছিলেন শেসানের বাড়িতে। শেসান প্রথমে রাজি হন নি। রাজীব গান্ধীর পরামর্শে রাজি হয়েছিলেন বলে জানতে পারি সাংবাদিক কে গোবিন্দন কুট্টির লেখা থেকে। শেসানের আগে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার ছিলেন সুকুমার সেন (১৯৫০-১৯৫৮), কল্যাণ সুন্দরম (১৯৫৮-১৯৬৭), এস পি সেন (১৯৬৭-১৯৭২), নগেন্দ্র সিং ( ১৯৭২-১৯৭৩), টি স্বামীনাথন (১৯৭৩-১৯৭৭), এস এল শক্তিধর (১৯৭৭-১৯৮২), আর কে ত্রিবেদী (১৯৮২-১৯৮৫), আর ভি এস পেরি শাস্ত্রী (১৯৮৬-১৯৯০), ভি এস রমাদেবী (১৯৯০ নভেম্বর থেকে ১৯৯০ ডিসেম্বর)। কিন্তু এঁরা কেউ শেসানের মতো ঝড় তুলতে পারেন নি।
আদর্শ আচরণবিধি তৈরি করলেন শেসান। সে বিধি লঙ্ঘন করলেই গ্রেপ্তার। যে সব অফিসারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তাঁদের সাসপেণ্ড করলেন। এমন কি ছাড় পেলেন না প্রধানমন্ত্রীও। মন্ত্রীসভার দুই সদস্য ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বলে তাঁদের সরিয়ে দেবার নির্দেশ দেওয়া হল, প্রার্থীদের ব্যয়ের সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হল, ভোটারদের ভয় দেখানো বা ঘুষ দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হল, শতাধিক নির্বাচনী অনিয়ম চিহ্নিত করা হল, চালু হল ভোটার আই ডি। ব্যয়ের হিসেব জমা দিতে ব্যর্থ বলে ১৪৮৮ প্রার্থীকে তিন বছরের জন্য অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হল। ১৯৯২ সালে বাতিল করা হল বিহার ও পঞ্জাবের নির্বাচন। মোট কথা নির্বাচন কমিশন যে এক স্বাধীন সত্তা, কোন রাজনৈতিক দলের লেজুড় নয়, সে কথা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন টি এন শেসান। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টও বলেছিলেন যে শেসানের আমলে নির্বাচন কমিশন জনগণের যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এভাবেই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন টি এন শেসান। কিন্তু সে স্বপ্ন তিনি নিজেই ভেঙে দিলেন।
১৯৯৬ সালে নির্বাচন কমিশন থেকে বিদায় নিলেন তিনি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন রাজনৈতিক নেতারা। ১৯৯৭ সালে শেসান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হয়ে ঘুরতে লাগলেন রাজ্যে রাজ্যে। শোচনীয় পরাজয় হল তাঁর। ততদিনে রাজনীতি তাঁকে চিবিয়ে খেতে শুরু করেছে। ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে গান্ধিনগরে কংগ্রেস দলের প্রার্থী হলেন। আবার শোচনীয় পরাজয়।
শেসানের পরিণতি নিয়ে আমাদের এক বন্ধুর ছড়া :
কে কাকে চিবিয়ে খায় শ্রীযুক্ত শেসন।
রাজনীতি কি জিনিস বুঝ বাছাধন।।
নাগরদোলায় তার চড়েছ এবার।
ঘুরপাক খেয়ে যাও চারদিকে তার।।
শুধু এই মন্ত্র বলো হবে হবে হবে।
ভোট দিলে জয়ী হয়ে মন্ত্রী হব তবে।।
একবার মন্ত্রী হলে ঝাড়িব ভাষণ।
ভাষণের চোটে শান্ত হয়ে যাবে মন।।
এখনকার নেতানেত্রীরা যথেষ্ট বিচক্ষণ, যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী।তাঁরা আইন, আদালত, সর্বোচ্চ আদালত, নির্বাচন কমিশন সকলকে বুড়ো আঙুল দেখানোর ক্ষমতা রাখেন। এক বিচারক দুর্নীতির ঢাকনা খুলে সাধারণ মানুষের মনে অনেক আশার সঞ্চার করার পর রাজনীতির ঘোলা জলে সাঁতার কাটছেন।