‘পাপ্পু’ কথাটার সঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নাম জড়িয়ে গেছে। তার জন্য তিনি নিজেও কিছুটা দায়ী। নিজেকে তিনি ‘পাপ্পু’ বলে উল্লেখ করতেন সভ্য-ভব্য রাজনীতির প্রতীক হিসেবে। ২০০৭ সালের সম্মেলনে তাঁকে কংগ্রেসের মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা ও কাজকর্মের মধ্যে মুখপাত্রের গাম্ভীর্য (seriousness) দেখা যায় নি। কংগ্রেসের অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন যে রাহুল পার্টটাইম রাজনীতিক। তাই ২০১২ সালে দিগ্বিজয় সিংহ বলেন যে রাহুল ছাত্র ও যুব রাজনীতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল রাহুল নয়া দিল্লিতে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজে বক্তৃতা করেন। সেদিন টুইটারের বিষয় হল pappuCII. বিজেপির আইটি সেল তৎপরতার সঙ্গে রাহুলের নামের সঙ্গে ‘পাপ্পু’ শব্দটি জুড়ে দেয়। ব্যঙ্গার্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। বলতে চাওয়া হয়েছিল যে রাজনীতিতে রাহুল অপরিণত, নির্বোধ এবং বোকা-হাঁদা।
এতদিন চলছিল এসব। কিন্তু ২০২২-২৩-এর লোকসভা বিতর্কে (additional grants for 2022-23) তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র ‘পাপ্পু’ শব্দটা সেঁটে দিলেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সাগরেদদের গায়ে। মহুয়া তাঁর ভাষণে ৫ বার প্রশ্ন করেছেন : এখন পাপ্পুটা কে (Who’s Pappu Now?)।
বক্র ব্যঙ্গে শাণিত সেই ভাষণের আগে মহুয়া মৈত্রের কথা একটু বলা যাক। মহুয়া মৈত্র কোন দলের সে কথা বড় নয়, বড় কথাটা এই যে বহুকাল বাদে আমাদের সংসদে একজন যথার্থ সাংসদকে আমরা দেখলাম। এই সাংসদ তাৎক্ষণিক ভাষণ (extempore speech), দেন না, রীতিমতো হোম ওয়ার্ক করে আসেন। তাঁর ভাষণে তথ্যের সমারোহ, যুক্তির ক্রম, নানা রেফারেন্স, এবং সেই সঙ্গে তির্যক মন্তব্য আকৃষ্ট করে মানুষকে। তাঁকে পছন্দ না করতে পারেন, কিন্তু তাঁকে উপেক্ষা করতে পারবেন না। অমর্ত্য সেনের মন্তব্য ধার করে বলতে পারি : সাংসদ হিসেবে মহুয়া মৈত্র আর্গুমেন্টেটিভ ইণ্ডিয়ান। অবশ্যই বিরল প্রজাতির। কারণ ইদানীং সংসদটা অন্ধভক্তের গলাবাজি ও বাহুবলীর আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
তাঁর অনেক ভাষণের মধ্যে একটির কথা মনে থাকবে বহুকাল। অসমে এন.আর.সি প্রয়োগ করার বিষয়ে বলতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি কিভাবে ফ্যাসিবাদকে আহ্বান করে আনছে দেশে, তিনি সাতটি সূত্রে তা তুলে ধরেছিলেন। মানবাধিকারকে উপেক্ষা করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করে তাদের নিজের আওতায় আনা, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা, বিরোধী মতামতকে দমন করা, বুদ্ধিজীবীদের ঘৃণা করা, নির্বাচনী পদ্ধতির স্বাধীনতা হরণ করার মধ্যে মোদি সরকারের সেই ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এবার ‘পাপ্পু’ প্রসঙ্গ।
মহুয়া মৈত্র তাঁর ভাষণে বলতে চেয়েছেন অন্য দলের এক নেতাকে মোদিরা ‘পাপ্পু’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন; কিন্তু বাস্তবে তাঁরাই তো আসল ‘পাপ্পু’। শ্রীমতী মৈত্র সেই শব্দের অর্থ করেছেন অন্যভাবে। তাঁর মতে ‘পাপ্পু’ হল মিথ্যেবাদী, মিথ্যাচারী, সর্বনাশ আনয়নকারী।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রগতি নিয়ে ডাহা মিথ্যে বলে চলেছে বিজেপি সরকার। ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিসের তথ্য উদ্ধৃত করে সরকারের মিথ্যাচার প্রমাণ করেছেন মহুয়া। তিনি বেকারত্বের উদাহরণ দিয়েছেন, নোটবন্দির অসারতার কথা বলেছেন, বলেছেন ভারতের এই অবস্থার জন্য ১২.৫ লক্ষ ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন অন্য দেশে। জোনাথন সুইফটের একটি উদ্ধৃতি তুলে তিনি বিজেপির মিথ্যাচারের স্বরূপ উদ্ঘাটন করে দিয়েছেন : “As the vilest writer has his readers, so the greatest liar has his believers” — বাজে লেখকের যেমন পাঠক আছে তেমনি মিথ্যাবাদীকে বিশ্বাস করারও লোক আছে। হিটলারের জিগরি দোস্ত গোয়েবলস বলতেন, বার বার মিথ্যে বলে গেলে লোকে মিথ্যেটাকেই সত্য বলে মনে করবে। জোনাথন সুইফট আরও বলেছেন, “And it often happens, that if a lie be believed only for an hour, it has done its work, and there is no farther occasion for it. Falsehood flies and truth comes limping after it.” — মাত্র ঘন্টাখানেক মিথ্যা বিশ্বাস করলেই কেল্লা ফতে; মিথ্যা ওড়ে কিন্তু সত্য আসে ধীর পদক্ষেপে।
ভাষাতত্ত্বে আমরা শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারা পড়েছি। নানা কারণে শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়। আগামী দিনে ভাষাতত্ত্বে ‘পাপ্পু’ শব্দটিও অনুপ্রবিষ্ট হবে। তার অর্থ পরিবর্তনের ধারাটি চারটি স্তরে বিভক্ত :
ক] ছোট বালক, সরল ও নির্বোধ। (অভিধান মতে) / সাধারণ অর্থ
খ] ভদ্র ও সভ্য রাজনীতিক (রাহুল গান্ধী প্রবর্তিত) / শব্দার্থের উৎকর্ষ
গ] অপরিণত ও নির্বোধ রাজনীতিক (মোদি ও তাঁর দলের সদস্য প্রবর্তিত) / শব্দার্থের অপকর্ষ
ঘ] মিথ্যাচারী, মিথ্যাবাদী রাজনীতিক (মহুয়া মৈত্র প্রবর্তিত) / শব্দার্থের অপকর্ষ