দুই.
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের সব ধারাগুলোই এই বিষয়ে একমত যে, হিন্দু ধর্মের যে ত্রিত্ববাদ (Hindu Trinity) তিন প্রধান দেবতাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে, অর্থাৎ জগতের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, পালন কর্তা বিষ্ণু এবং তার সংহারক শিব এদের প্রত্যেকের নারী সমবায়িনী শক্তি রয়েছে; যেমন: ব্রহ্মার জন্য সরস্বতী ও বিষ্ণুর জন্য লক্ষী। তবে শিবের জন্য এই সমবায়িনী শক্তি কখনো উমা, কখনো শ্যামা, কখনো গৌরী, কখনো সতী, কখনো ভৈরবী, কখনো কালী, কখনো দুর্গা, কখনো চন্ডী ইত্যাদি। অবশ্য বিজ্ঞজনদের এবং শাস্ত্রীয় পন্ডিতদের মত — এ একই শক্তির বিবিধ রুপভেদ মাত্র। এই সমবায়িনী শক্তি হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত “শক্তিতত্ত্বের” মূল আধার। তবে বলে রাখা ভালো যে, এই নারী শক্তি যাকে হিন্দুশাস্ত্র বলছে প্রকৃতি, তা মূলতঃ দু’টি রুপে হিন্দু আখ্যানগুলোতে চিত্রিত হয়েছে এবং শাস্ত্রীয় বচনে বিবৃত হয়েছে; যথা: অসুর বিনাশিনী শক্তি ও হ্লাদিনী শক্তি।
উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, শ্যামা, কালী, দুর্গা, ভৈরবী, চন্ডী — এরা অসুর বিনাশিনী; অর্থাৎ অসুর, পিশাচ, রাক্ষস এবং দানবদের বধের নিমিত্তে তাদের আগমন ঘটেছে। যেমন: আমরা দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধের কাহিনী জানি; যেকারণে তার আরেক নাম মহিষমর্দিনী। এ আখ্যানটি শ্রীশ্রীচন্ডীর অংশ, আর মূলতঃ এটি মার্কেন্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত। অন্যদিকে মহাকালী রুপে তিনি বধ করেছেন মধু, কৈটভ, শুম্ভ, নিশুম্ভ, তারকাসুর, ভস্মাসুর, অরুণাসুর, নরকাসুর, ভীমাসুর, রক্তবীজ, ধূম্রলোচন, মেঘলোচন, সুগ্রীব, দুর্গমাসুর, শুম্ভ ও নিশুম্ভের অধঃস্থন চন্ড ও মুন্ডসহ আরো বহু অসুরকে, যে কাহিনীগুলো সমগ্র ভারত জুড়েই নানা লোকগাঁথা, আখ্যান, লোকায়ত চিন্তা, নাটক এবং পুরাণাদিতে ব্যাপ্ত রয়েছে। সেই অসুর বধের নিমিত্তে একই দেবী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছেন। একই কাহিনী অনেক সময় বহু উৎস থেকে বর্ণিত হয়েছে, ফলে আখ্যানগুলোতে কাহিনীর নানাবিধ চিত্রায়ণ ঘটেছে। তাতে অবশ্য মূল কাহিনীর কোন পরিবর্তন হয়নি। আর বহু বর্ণিল আকারে তার উপস্থাপন মানসলোকে বহু ব্যাঞ্জনাময় বয়ানের দ্বার অবারিত করেছে। যেমন: মধু-কৈটভের বধ। কোন কোন পুরাণমতে এই প্রবল পরাক্রান্ত দুই অসুরের মৃত্যু হয়েছে দেবী মহামায়া, অর্থাৎ দেবী চন্ডী বা কালীর হাতে, যারা দেবী গৌরী, পার্বতী বা দুর্গারই রুপভেদ। কিন্তু শ্রীশ্রীচন্ডীতে আমরা বিষ্ণুকেই তাদের সংহারক রুপে পাই। সেখানে যোগনিদ্রায় শায়িত বিষ্ণুর কর্ণমল (earwax বা cerumen) থেকে মধু ও কৈটভ নামের দুই মহাশক্তিশালী অসুরের আগমন ঘটলে তারা সৃষ্টির প্রধান কারণ প্রজাপতি ব্রহ্মাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। ব্রহ্মা তখন জগজ্জননী ভগবতী মহামায়া বা মহাদেবী দুর্গার দ্বারস্থ হন। এখানে আমরা জানতে পারি যে, ভগবতী দুর্গা শুধু শিবের সমবায়িনী শক্তি নন, তিনি সমগ্র দেবশক্তি তথা শুভশক্তির কেন্দ্র এবং জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের মূল চালিকা শক্তি। শ্রীশ্রীচন্ডীতে আমরা পাই, তার স্তবগান করতে যেয়ে ব্রহ্মা এক জায়গায় বলছেন, — “যেই ভগবান এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও পালন করেন, সেই ভগবানকেও যখন তুমি নিদ্রাবিষ্ট করে রেখেছে, তখন কে তোমার স্তব করতে সমর্থ? আমাকে, ভগবান বিষ্ণুকে ও ভগবান রুদ্রকেও তুমিই শরীর গ্রহণ করিয়েছ; কাজেই তোমার স্তুতি করার মত শক্তি কার আছে?”
এরপর তিনি দেবীকে বিষ্ণু দেবকে অসুর সংহারের কারণে জাগ্রত করতে অনুরোধ করলে দেবী বিষ্ণুকে যোগনিদ্রা থেকে জাগালেন এবং অসুরদ্বয়কে মোহাচ্ছন্য করে রাখলেন। বিষ্ণু পাঁচ হাজার বছর অসুরদ্বয়ের সাথে যুদ্ধ করলেন। বিষ্ণুর যুদ্ধকৌশলের নিপুণতায় অসুরদ্বয় প্রীত হয়ে তারা তাকে বর দিতে চাইলে বিষ্ণু তাদের তার হাতে বধ্য হওয়ার বর চাইলেন এবং তাদের বধ করলেন; অর্থাৎ অসুর বিনাশে দেবী সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও তার পরোক্ষ ভূমিকা ছিলো। আবার ভাগবৎ পুরাণে আমরা পাই যে, বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে সৃষ্ট মধু ও কৈটভ নামের দুই মহাশক্তিশালী অসুর ব্রহ্মার কাছ থেকে বেদ লুন্ঠন করে মহাসমুদ্রে আত্মগোপণ করে। বিষ্ণু তখন অশ্বমুখ অবতার বা অশ্বাবতার ‘হয়গ্রীবে’র আদলে বেদ উদ্ধার করেন এবং অসুরদ্বয়কে বধ করেন। আবার ‘দেবী মাহাত্ম্যের’ পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা পাই, শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক দুই মহাপরাক্রমশালী অসুরভ্রাতা স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল এই ত্রিলোক জয় করে দেবতাদের নিজেদের অধীন¯ত করে এবং ত্রিলোকের সমস্ত নিয়ম-কানুনের বিনাশের কারণ হয়ে উঠে। আর তা তারা করতে সমর্থ্য হয় তপস্যার দ্বারা ব্রহ্মাকে তুষ্ট করে, যেখানে তারা এই বর চেয়েছিলো যে, তারা হবে মানব ও দানবদের সামনে অপরাজেয়, কাজেই তাদের অবধ্য। কিন্তু তারা ভ্রমবশতঃ দেবতাদের বা দেবীদের কথা বলেননি। ফলে দেবী পার্বতী তাদের বধ করতে চাইলে তারা প্রথমে তাদের দুই অধঃস্থন অসুর চন্ড ও মুন্ডকে প্রেরণ করে। তারা দেবীর রুপে মুগ্ধ হয়ে সে বিষয়ে শুম্ভকে অবহিত করলে শুম্ভ দেবীকে অধিকার করতে আগ্রহী হয়। সে দানব সুগ্রীবকে (Sugriva) প্রেরণ করে দেবীকে প্রণয় নিবেদন করতে, যদিও দেবী তাকে সরাসরি প্রত্যাখান করেন। এবার দেবীকে হরণ করতে অসুর ধূম্রলোচনের নেতৃত্বে ষাট হাজার অসুর প্রেরণ করা হয়। দেবী পার্বতী মহাকালীর রুপ ধারণ করে প্রথমে চন্ড ও মুন্ডকে বিনাশ করেন; ফলে গ্রহণ করেন চামুন্ডা উপাধি। একই কারণে তাকে চামুন্ডী, চামুন্ডেশ্বরী, চর্চিকা, রক্তান্দিকা ইত্যাদি উপাধিতেও ভূষিত করা হয়েছে। এরপর দেবী সমগ্র অসুরবাহিনীকে বিনাশ করেন। ফলে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নিজেরাই এবার দেবীর মুখোমুখি হন। নিশুম্ভকে বধ করে দেবীর সিংহ। তার মৃতদেহ থেকে এক ভয়ানক দানব আবির্ভূত হলে দেবী তার বিনাশ ঘটান। এরপর দেবী তার ত্রিশুল দিয়ে শুম্ভকে বধ করেন। যাহোক হিন্দুশাস্ত্রের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা এইযে দেবীকে পাই, তিনি শুধু পুরাণোক্ত দেবী নন, তিনি বেদে বর্ণিত মহাদেবীও একাধারে। ঋকবেদের দেবীসূক্তে দেবী ভক্তকে বলছেন, —
“আমার দ্বারাই লোকসকল বেঁচে আছে, অন্ন গ্রহণ ও শ্রবণাদি করছে। আমাকে যে অবহেলা করে সে বিনষ্ট হয়। তুমি শ্রদ্ধাবান, সেকারণে আমি তোমাকে এসব বলছি। ব্রহ্মশক্তির প্রতি হিংসাত্মক অসুরদের বধের অভিপ্রায়ে ধনুর্ধর রুদ্রের বাহুতে আমিই শক্তিরুপে অবস্থিতা ছিলাম। আমিই লোকরক্ষার জন্য যুদ্ধকার্যে নিযুক্তা হই। আমিই আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে প্রবিষ্টা হয়ে রয়েছি।” (চলবে)