তিন.
রাধাকে বৈষ্ণব ও তান্ত্রিকদের সমগ্র জগতের অধীশ্বরীরুপে গ্রহণের প্রেক্ষাপট এক অর্থে বেদসমূহ এবং পুরাণাদির কারণে আগেই তৈরী ছিলো। আর শাক্ত ও তান্ত্রিকদের কাছে শক্তিই যখন মূল, তখন রাধাকে তাদের বা¯তবতায় শক্তিরুপিণী আদিদেবী বা আদ্যাশক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশের একটি হিসাবে গণ্য করেই তাকে তাদেরো আরাধ্যা দেবী রুপে গ্রহণ করাটাই স্বাভাবিক। এই জায়গায় তান্ত্রিক ও শাক্তধারা বিষয়ে শশীভূষণ দাশগুপ্ত যা বিবৃত করেছেন তা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। তিনি বলেছেন যে, বাংলাদেশের মানুষ বৈষ্ণব ধর্ম বলতে শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধারাকেই বোঝে। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের বীজ অত্যন্ত প্রাচীণ। বৌদ্ধ সহজিয়া ধারাও এতে কোন কোন সময় প্রভাব রেখেছে। তান্ত্রিকদের প্রভাব যে সেখানে আছে, তা বলা বাহুল্য। তবে এসব ধারায় শক্তি অর্জনের পথ কতগুলো গুহ্য সাধনার উপর গড়ে উঠেছে, সেখানে দর্শণের তেমন কোন প্রভাব নেই বলেই তার অভিমত। এগুলো বামাচারী তান্ত্রিক সাধনা, বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনা, বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনা, বৈষ্ণব সহজিয়া সাধনা প্রভৃতির উদ্রেক ঘটিয়েছে বলে শশীভূষণ দাশগুপ্ত মন্তব্য করেছেন। এদের বহিরঙ্গ বিবিধ রুপ ও নামে পরিচিত হলেও ভেতরে তাদের মধ্যে গভীর ঐক্য আছে বলে তিনি বলেছেন, আর তা হচ্ছে এক উপলব্ধির ঐক্য- ‘চরম সত্য অদ্বয় পরমানন্দ স্বরুপ’। এই অদ্বয় আনন্দ-তত্ত্বই (সংক্ষেপে অদ্বয়তত্ত্ব) হোল ‘পরম সামরস্য’।
অদ্বয়তত্ত্বের দু’টি ধারা; একটি শিব, অপরটি শক্তি। কিন্তু অদ্বয়তত্ত্ব এই দুইধারাকে বিচ্ছিন্ন করে না, বিভাজিত করে না, বরং এই দুইধারার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে, একে অপরকে পূর্ণতা দান করে। এরাই সৃষ্টির আদিতে অবস্থানকারী ‘পুরুষ’ ও ‘প্রকৃতি’, যে বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো। যাহোক এই দুই ধারা নিজেদের সম্মেলনে যে তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে তার নাম ‘মিথুনতত্ত্ব’, যাকে ‘যামলতত্ত্ব’ বা ‘যুগলতত্ত্ব’ নামেও অভিহিত করা হয়। এটিই তান্ত্রিক বৌদ্ধদের কাছে ‘যুগনদ্ধ তত্ত্ব’ নামে পরিচিত। তান্ত্রিক বৌদ্ধমত যে হিন্দু শাক্ত ও তান্ত্রিক ধারার সংস্পর্শে উদ্ভুত তা এখান থেকে অনুমান করা সহজ। তান্ত্রিক সাধনার ক্ষেত্রে এই অখন্ড যুগলতত্ত্বই ‘কেবলানন্দ তত্ত্ব’। অদ্বয়তত্ত্ব যে শিবতত্ত্ব ও শক্তিতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে সেখানে সূক্ষ্ম ও স্থূল উভয় অর্থে পুরুষ শিবতত্ত্বের ও নারী শক্তিতত্ত্বের প্রতীক। ফলে এই দুইয়ের সম্মেলনে দুই তত্ত্বই নিজেকে পূর্ণ করতে চায়। নারী-পুরুষের মিলনের মাধ্যমে এটি পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়, যা সাধক-সাধিকাকে পূর্ণ সামরস্যে পৌঁছে দেয়। তান্ত্রিক ভাষায় এটিই ‘সামরস্য-সুখ’, বৌদ্ধদের (আমার মতে তান্ত্রিক বৌদ্ধদের — লেখক) ভাষায় ‘মহাসুখ’, আর বৈষ্ণবদের ভাষায় ‘মহাভাব’ স্বরুপ। যুগলতত্ত্ব ও তার যুগল সাধনা যখন বৈষ্ণব সমাজে প্রবেশ করে তখন সহজিয়া বৌদ্ধদের যোগ-সাধনা প্রেম-সাধনায় রুপান্তরিত হয়, বৈষ্ণব ধর্ম পরিণত হয় প্রেমধর্মে — যেখানে চরমাবস্থায় প্রেমই আনন্দ স্বরুপ। বলে রাখা ভালো যে, এইসব সাধনায় যৌনতাকে কোনভাবেই নেতিবাচক রুপে দেখা হয় না। বরং তা সাধনার একটি অন্যতম ধাপ, যার সাথে সৃজনশীলতা, আধ্যাত্মিকতা ও প্রকৃতির সাথে সাধক বা সাধিকার ঐকান্তিতকতা জড়িত। তবে শশীভূষণের আলোচনায় দু’টি সমস্যা দেখা যায়। তিনি অনেক তান্ত্রিক ও সহজিয়া বৌদ্ধ-সাধনাকে স্রেফে বৌদ্ধ-সাধনা বলে মন্তব্য করে গিয়েছেন। অন্যদিকে বৈষ্ণবধর্ম মাত্রই রাধাতত্ত্ব নয়। চৈতন্যের কারণে রাধাবাদের জনপ্রিয়তা বঙ্গাঞ্চলে ও উড়িষ্যায় বেশী। কিন্তু বৈষ্ণবদের এমন শাখাও ইতিহাসে আছে যেখানে রাধা অনুপস্থিত। যেমন: চৈতন্য যখন পুরীতে ছিলেন, তখন ‘পঞ্চশাখার’ বৈষ্ণবদের সাথে তার পরিচয় ঘটে। তারা চৈতন্যকে অবতার জ্ঞানে সম্মান করতেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ঈশ্বর দাস ‘চৈতন্য ভাগবত’ লেখেন এবং সেখানে চৈতন্যকে স্বয়ং ঈশ্বর রুপে উপস্থাপণ করেন। অথচ পঞ্চশাখার বৈষ্ণবদের মধ্যে রাধা অনুপস্থিত। তার মানে চৈতন্যের কারণে জনপ্রিয় রাধাবাদ একটি বিশেষ শ্রেণীর রাধাতত্ত্ব, যার সাথে শাক্ত, বামাচারী ও তান্ত্রিকদের সাথে ততটুকু মিল যতটুকু শক্তির কেন্দ্ররুপে নারীকে উপস্থাপণ করা যায়। পরিশেষে চৈতন্যের প্রবর্তিত রাধাতো হ্লাদিনী শক্তি অর্থাৎ প্রেমদায়িনী শক্তি।
চার.
বৈষ্ণব ও অনেক তান্ত্রিক মতে প্রবল পরাক্রান্তা দেবীই ধ্বংসযজ্ঞের শেষে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখতে এবং প্রধান দেবগণের সৃজনীশক্তির মূলপ্রবাহ রুপে হ্লাদিনী শক্তি হিসাবে আবির্ভূতা। দেবীর এই হ্লাদিনী রুপ হলো প্রেমদায়িনী রুপ। এই বর্গে মহামায়া বা ‘আদি পরাশক্তি’ যেসব রুপ ধারণ করেছেন তারা হলেন বৈকুন্ঠবাসিনী নারায়ণের অর্ধাঙ্গিনী লক্ষী, পিতামহ ব্রহ্মার সঙ্গিনী স্বরস্বতী, আর মহাদেব শিবের পার্শ্বচারিণী উমা, গৌরী, পার্বতী, সতী ইত্যাদি — সেইসাথে আরো অনেকে; কিন্তু এদেরকে যে নামেই ডাকা হোক না কেনো, তারা আদতে একজনই। অন্যদিকে এই ধারাতেই শ্রীমতি রাধা নামে মহাদেবী পৃথিবীতে শ্রীকৃষ্ণের লিলাসঙ্গিনী বা লিলাবিলাসিনী, — এক কথায় তিনি কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি, যিনি প্রেমঘন কৃষ্ণের প্রেমপরিণাম। তিনি মানুষ রুপে লীলাবাসনায় বৃন্দাবনে গোপীশ্রেষ্ঠা। এ হলো গৌড়ীয় বৈষ্ণব শাস্ত্রের মিমাংসা। শ্রীগোপাল গোবিন্দ ভট্টাচার্য লিখেছেন যে, বৈষ্ণব দর্শন এই দেবী রুপী পরাশক্তিকে আহ্লাদিনী নামে অভিহিত করেছে এবং শাক্ত দর্শন একই পরাশক্তিকে জগন্মাতা আদ্যাশক্তিরুপে অভিহিত করেছে এবং শাক্ত দর্শন এই পরব্রহ্মের গুণময়ী শক্তিকে মাতৃভাবে ভজনা করে। রাধার আরো নাম আছে — রাধিকা, রাধে, মাধবী (যেহেতু তার সখা মাধব অর্থাৎ কৃষ্ণ), কেশবী (যেহেতু তার সখা কেশব অর্থাৎ কৃষ্ণ), রাসেশ্বরী (যেহেতু তিনি রাসউৎসবের ঈশ্বরী ও প্রধান নায়িকা), কিশোরী (কারণ অনেকে মনে করেন তিনি কৃষ্ণের সাথে লীলাকালে কিশোরী ছিলেন), শ্যামা (যেহেতু তিনি শ্যাম অর্থাৎ কৃষ্ণের সহচরী), নিত্যা (যেহেতু তিনি নিত্য বিরাজমান) ইত্যাদি। এইধারায় বৈষ্ণবদের মাঝে তাকে রাইকিশোরী অর্থাৎ কিশোরী রাধিকা (রাই রাধার আরেক নাম), রাইবিনোদনী অর্থাৎ কিশোরী বিনোদিনী ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আমরা পাই যে, কৃষ্ণ নামে ধরাধামে বিষ্ণুর অবতার অবতরণ করলে বৈকুন্ঠধামে তার সঙ্গিনী দেবী লক্ষী গোকুলে রাধা নামে জন্মগ্রহণ করেন। আর বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনেও কিন্তু রাধা তাই। সনাতন ধর্ম বলে যে, এই দেব ও দেবী শক্তি আদিতে এক ও অভেদ শক্তি রুপে বিরাজিত ছিলো। পরে তার দ্বিভাজন হয়েছে।
“সৃষ্টির পূর্বে ঈশ্বর আপনাকে দুইভাগে বিভক্ত করে এক অংশে পুরুষ এবং অপরাংশে নারীমূর্তি পরিগ্রহ করলেন ও সঙ্গত হলেন।” (মনুসংহিতা, ১:৩২)
‘দেবী ভাগবতে’ দেবী নিজেই তা পরিস্কার করে ব্যক্ত করেছেন, — “আমি ও ব্রহ্ম এক। উভয়ের মধ্যে ভেদ নেই। যিনি ব্রহ্ম তিনিই আমি। আমি যা তিনিও তা, এই ভেদ ভ্রমকল্পিত, বাস্তব নয়।”
তার মানে পরমশক্তির নারী অংশ বা ‘প্রকৃতি’ এক অর্থে সামগ্রিক শক্তিরই প্রকাশক এবং এই জায়গায় বৈষ্ণব, শাক্ত ও তান্ত্রিকদের মধ্যেকার চিন্তায় সমতা রয়েছে। (চলবে)