শশীভূষণ দাশগুপ্ত পুরো বিষয়টিকে বৈষ্ণব শাস্ত্র থেকে সার আকারে লিখেছেন এই বলে যে, শ্রীরাধা ভগবানের হ্লাদিনী শক্তির বিকাশ — সুতরাং তিনি মূলপ্রকৃতি, ঈশ্বরী এবং শ্রীকৃষ্ণের অর্ধাংশস্বরুপা। ভগবান একাধারে ভোক্তা ও ভোগ্য, কিন্তু ‘তস্মাৎ একাকী ন রমতে’ — তিনি একাকী রমণ করেন না-সেজন্য ‘দুই’ হওয়ার ইচ্ছা করে আপনাকে দ্বিধাবিভক্ত করে ‘লীলারস’ আস্বাদন করেছেন, যা তার নিজেরই অন্তর্নিহিত প্রেম রসের আস্বাদন। নিত্য বৃন্দাবনে আদতে শ্রীকৃষ্ণ অনন্তকাল ধরে নিজেই নিজেকে আস্বাদন করে যাচ্ছেন।
আর গৌরী সেন শ্রীরাধাকে বৈষ্ণব আচার্যরা কিভাবে দেখেন তার সার বর্ণনা করেছেন নিম্নক্তভাবে, — […] ঈশ্বর ও ভক্তের সম্পর্ক হবে রাধাকৃষ্ণের সর্ম্পকের মতো। এই সম্পর্কের স্বরুপ বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, রাধা সর্বশক্তির আধার কৃষ্ণের হ্লাদিনী বা আনন্দদায়িনী শক্তি। শক্তি ও শক্তিধর অভিন্ন, রাধা ও কৃষ্ণ তাই অভিন্ন।
কিন্তু দুই ভিন্নরূপ গ্রহণ না করলে ঈশ্বরের লীলা প্রকট হয় না। সেইজন্য রাধা-কৃষ্ণের, ভক্ত-ভগবানের পৃথক অস্তিত্ব অনুভব করা প্রয়োজন। সুতরাং পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার ভেদ ও অভেদ দুই-ই আছে। এর প্রয়োজন এবং ভেদ ও অভেদ কল্পনা অচিšত্য বা অজ্ঞাত। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের এই হল দার্শণিক ভিত্তি, অচিšত্য ভেদাভেদ নামে যা পরিচিত।
উপরোক্ত বয়ান থেকে শ্রীচৈতন্যদেবের অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্বের সারও বোঝা গেলো।
স্বামী অমৃতানন্দ তার বই ‘শক্তি’তে দেবী তথা মাতৃশক্তিকে বুঝবার নিমিত্তে দেবী পুরাণ থেকে উদ্ধৃত করেছেন, —
তিনি ব্রহ্মাদি দেবগণের ভুক্তিমুক্তি প্রদায়িনী, তিনি তাদের মা। (দেবী পুরাণম ২৯:২০)
আমরা আবার শ্রীশ্রীচন্ডীতে আসি;
যখন দেবগণ একত্রে মহাদেবী সন্দর্শনে গেলেন, তারা তাকে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? ‘তিনি বললেন — আমি ব্রহ্মস্বরুপ। আমার থেকেই প্রকৃতি-পুরুষাত্মক সত্রুপ ও অসত্রুপ জগত উত্পন্ন হয়েছে। আমি আনন্দ ও নিরানন্দরুপা। আমি বিজ্ঞান ও অবিজ্ঞানরুপা। অবশ্য জ্ঞাতব্য ব্রহ্ম এবং আমিই অব্রহ্ম। পঞ্চীকৃত ও অপঞ্চীকৃত মহাভূতও আমিই। এই সমগ্র দৃশ্য জগত আমিই। বেদ ও অবেদ আমি। বিদ্যা ও অবিদ্যাও আমি, অজা আর অনজাও (প্রকৃতি ও তার থেকে ভিন্ন) আমি, ঊর্ধ্ব, অধঃ, চারিদিকও আমিই’।
এই আলোচনা উপনিষদেও প্রবলভাবে আলোচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরম সত্ত্বার দ্বিভাজন উপনিষদে যেভাবে এসেছে তার সারাংশকে কাব্যিকভাবে এভাবে একেছেন, —
যে ভাবে পরম-এক আনন্দে উত্সুক
আপনারে দুই করি লভিছেন সুখ,
দুয়ের মিলন-ঘাতে বিচিত্র বেদনা
নিত্য বর্ণ, গন্ধ, গীত করিছে রচনা।
কিন্তু শাস্ত্রীয় ও ভাবগত উভয় বিচারেই এই বিভাজন একজন থেকে অপরজনকে বিযুক্ত করতে নয়, একে অপরকে আরো পরিপূর্ণ, আরো সামগ্রিক করতে করা হয়েছে। বৈষ্ণবদের বেশ কিছু প্রধান ধারা, আর সেইসাথে শাক্ত ও তান্ত্রিকদের মতে এই সামগ্রিক রুপটিও নারী রুপিনী। শাক্ত ও তান্ত্রিকদের চোখে তিনি শ্যামা, কালী, দুর্গা, ভৈরবী, চন্ডী। আর বৈষ্ণবকুলে তিনিই শ্রীমতি রাধিকা বা শ্রীমতি রাধারাণী। তবে শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলছে, সৃষ্টির সেই মহালগ্নে পরমশক্তি নারীও নন, পুরুষও নন, —
নৈব স্ত্রী ন পুমানেব নৈব চায়ং নপুংসকঃ। (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, ৫:১০) অর্থাত, তিনি স্ত্রী নন, পুরুষ নন, নপুংসকও নন।
তারমানে বিভাজনের পরে তিনি হলেন নারী ও পুরুষ। তাহলে শাক্ত ও তান্ত্রিকদের কাছে তিনি জগদম্বা বা জগজ্জননী কেনো, কেনো তিনি দেবী রুপে অর্থাত নারীরুপে আরাধ্যা? উত্তর দ্বিমুখী। প্রকৃতিকে কল্পনা করা হয় নারী রুপে, কারণ তিনি সৃষ্টি করেন, উত্পাদন করেন, শুষ্কতম ভূমিতেও তিনি জীবনের প্রবাহ তৈরী করেন। এই জগতকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন তার মাতৃবৈশিষ্ট দিয়ে। ফলে প্রকৃতি জননী, অর্থাত নারী। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেক্ষেত্রে সারা দুনিয়ায় কেনো পরমশক্তিকে নারী রুপে ভজনা করা হচ্ছে না? আর ভারতেও সর্বত্র দেবীরা বঙ্গ বা উড়িষ্যার মত প্রধান শক্তি রুপে বন্দিতা নন। সেসব অঞ্চলে রাম ও কৃষ্ণের সাথে সাথে বিনায়ক, অর্থাত গণপতি বা গণেশের, কার্তিক বা মুরাগনের এবং শিবের নানা রূপ যেমন: নটরাজ, ভেঙ্কটেশ ইত্যাদির পূজার চল বেশি। উত্তরে বলতে হয়, এর কারণ সম্ভবতঃ বঙ্গ বা উড়িষ্যার মাতৃতান্ত্রিকতার (Matriarchy) প্রভাব। পুরুষতান্ত্রিকতা এই অঞ্চলগুলোতে তার প্রভাব বি¯তারের পরেও আজো গারো ও সাওতালদের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিকতা টিকে আছে। ফলে এটি অনুমেয় যে, একদা এখানে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রবলভাবেই রাজত্ব করেছে। বর্তমানকালের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের অনেকে বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ৩,৩০০ খৃষ্টপূর্ব সাল থেকে ১,৩০০ খৃষ্টপূর্ব সাল পর্যন্ত টিকে থাকা হরপ্পা সভ্যতা মাতৃতান্ত্রিক ছিলো। ঐ সভ্যতার বিভিন্ন আইকন (Icon), প্রতিমা বা বিগ্রহ (Idol) ইত্যাদি থেকে অনুমান করা হয়েছে যে, এটির বৈশিষ্ট্য ছিলো মাতৃতান্ত্রিক, সেইসাথে সমাজ ছিলো মেট্রিলোকাল (matrilocal), অর্থাত, সমাজে যে হাইয়ারআর্কি ((hierarchy) বিদ্যমান ছিলো, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা সমাসীন ছিলেন। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় জন মার্শাল (John Hubert Marshall, 1876-1958) ও মর্টিমার হুইলারের (Robert Eric Mortimer Wheeler, 1890-1976) বরাতে লিখেছেন যে, হরপ্পা, মহেনজোদাড়ো ও চানহুদাড়ো সভ্যতাগুলোতে পোড়ামাটির মাতৃকা ও মাতৃমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। যেগুলো এতটা সযত্নে তৈরী এবং অলঙ্কার ও মুকুট দ্বারা বিভূষিত ছিলো যে বোঝা যায়, তারা ঐ সভ্যতাগুলোতে পরম আরাধ্যা ছিলো। ফলে এখান থেকে প্রতীতি হয় যে, বঙ্গ বা উড়িষ্যায় একদা মাতৃতান্ত্রিকতার প্রবল জোয়ার থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। (চলবে)