ছয়.
শশীভূষণ দাশগুপ্ত প্রাচীন আভীর জাতির মধ্যে রাখাল-কৃষ্ণের প্রণয়োপাখ্যান যে চালু ছিলো বলেছেন, আমার মনে হয় তারো আদি উত্স দাক্ষিণাত্য। কারণ আভীর জাতির বাসস্থানও ছিলো দক্ষিণ ভারতে। এই আভীররা শূদ্র ছিলেন বলে আর.পি.চন্দের বরাতে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী লিখেছেন। আর অন্ধক-বৃষ্ণিকুল অর্থাত যে কুলে কৃষ্ণ জন্মেছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এরা ছিলো যাদবদের অধঃস্তন। ফলে আভীরদের সাথে তাদের যোগসূত্র থাকা স্বাভাবিক। আমার মনে হয় একদা এরা আভীরদের মতই শূদ্রগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। আমার প্রতীতি এই যে, দাক্ষিণাত্যের মাল বা মায়োন বা মায়বন তামিল অঞ্চলের হওয়াতে তিনি ছিলেন অশ্বেতকায় ও দ্রাবিড়। তিনি তার নানা সামাজিক ও রাজনৈতীক কারণে তার অঞ্চলে প্রভূত খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। গোপ সমাজে জন্ম বলে তিনি ছিলেন প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধি। পরে তার উপর দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে। যেমন : হয়তো কালিয় নাগ ছিলো নেহায়েত একটি বড় সাপ, যেটিকে তিনি হত্যা করেন। পরে মানুষের মুখে মুখে তা হয়ে উঠেছে এক সর্প-দানব। তিনি দ্রাবিড় ও অশ্বেতকায় হওয়ার পরেও আর্যদের উপর তার প্রাধান্য বিস্তার করতে পেরেছিলেন তার বুদ্ধি, স্বজাতি প্রেম ও নেতৃত্বের গুণে। তিনি গোকূলে নিম্নবর্গের মানুষের ত্রাতা ছিলেন।
অত্যাচারী রাজা কংস, চেদীরাজ শিশুপাল এবং ভীমের সহায়তায় (যদি বৃন্দাবনের রাধার কৃষ্ণ ও মহাভারতের কৃষ্ণ একজনই হন) কংসের শ্বশুড় জরাসন্ধকে তিনি বধ করেন। গৌরী সেনের মতে, যেহেতু দেবকীর পুত্র কৃষ্ণের প্রথম হদীস পাওয়া যায় ছান্দোগ্য উপনিষদে, যেখানে তিনি ঋষি আঙ্গিরসের শিষ্য এবং আঙ্গিরস কৃষ্ণের সাথে যেসব আলোচনা করেছেন তার সাথে গীতায় বর্ণিত কৃষ্ণের উপদেশের মিল দেখা যায়, তাই অনুমান করা যায় যে, ছান্দোগ্য উপনিষদের এবং গীতায় বর্ণিত কৃষ্ণ অভিন্ন। কিন্তু বৃন্দাবনের রাধার কৃষ্ণ ও মহাভারতের কৃষ্ণ একজনই তা প্রমাণ করা দুরুহ। কেউ কেউ মনে করেন, বৃষ্ণি, অন্ধক ও অন্যান্য জাতিরা মিলে একটি সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কৃষ্ণ ছিলেন তাদের প্রধান। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও বৃষ্ণিসঙ্ঘের কথা আছে। কংস ছিলো সেখানে সঙ্ঘমুখ্য। সম্ভবতঃ এই সঙ্ঘেরই কোন এক সময়কার কর্ণধার ছিলেন বাসুদেব-কৃষ্ণ। দ্বারকাতে তিনি গণপ্রতিনিধিত্বশীল এক শাসন-ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন বলে অনেকে বলেন, তা আধুনিক গণতন্ত্রের বিচারে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র না হলেও বিভিন্ন কৌমের প্রতিনিধিত্ব সেখানে ছিলো। তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের কারণে তার উপর পরে দেবত্ব আরোপ করা সহজ হয়েছে। তিনি অশ্বেতকায় হওয়ার পরেও তার গাত্রবর্ণ নিয়ে কেউ কথা বলেনি।
আমরা মহাভারত, ভাগবত পুরাণ কিংবা হরিবংশে তার কোন প্রমাণ দেখি না। এর কারণ দু’টি হোতে পারে। প্রথমতঃ মহাভারতের কৃষ্ণ ও ভাগবত পুরাণের গোপীগণের নাগর কৃষ্ণ একজন নয়। গোপীগণের নাগর কৃষ্ণের নামও হয়তো কৃষ্ণ ছিলো না। যেমন কোন পিতা-মাতা তাদের পুত্রদের নাম দুর্যোধন, দুঃশাসন ইত্যাদি রাখবে না যেমনটি আমরা মহাভারতে দেখতে পাই, তেমনি কোন পিতা-মাতা তাদের পুত্রের নাম কালো বা কৃষ্ণ রাখার কথা নয়, তার গাত্রবর্ণ কালো হলেও। এখন অনেকে তা রাখেন কারণ ভগবান হিসাবে কৃষ্ণ এখন স্বীকৃত পুরুষ। তার মানে তার নাম অনেকে বিস্মৃত হওয়ার কারণে তাকে পরে তার গাত্রবর্ণ দিয়ে হয়তো শনাক্ত করার প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তিতে তার প্রবল প্রভাবের কারণে মহাভারতের কৃষ্ণ তার সাথে মিশে যায়। অথবা দ্বিতীয়তঃ তিনি অশ্বেতকায় হওয়া সত্ত্বেও তার প্রবল ব্যক্তিত্বের কারণে কেউ তার গাত্রবর্ণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তবে আমার মতে প্রথম কারণটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। তার শত্রুতো কম ছিলো না। তাদের কেউ না কেউ তো তার গাত্রবর্ণ ও তার আর্যত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতোই, কারণ বেশীরভাগ ভারতীয় ও ইউরোপীয়রা আর্যরা শ্বেতকায় ছিলো বলে আজো মনে করেন। আর হিন্দুদের অর্থাত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বাসুদেব-কৃষ্ণ আর্যশ্রেষ্ঠ। হয়তো মহাভারতের কৃষ্ণের আদিতে অন্য নাম ছিলো। আর তামিল অঞ্চলের ‘মাল’ বা ‘মায়োন’ বা ‘মায়বন’ বাংলা, উড়িষ্যাসহ আরো অন্যান্য অঞ্চলের সর্বত্র কৃষ্ণ নামে প্রতিষ্ঠিত হন।
এই জায়গায় আরো যে কথাটা বলা আবশ্যক তা হোল, নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী অভিযোগ করেছেন, গোয়ালাদের ঘরে বড় হয়েও কৃষ্ণের উঠাবসা ছিলো আর্য-নৃপতিদের সাথে, বরং অনার্যদেরই তিনি হয়ে উঠলেন যম হয়ে। আমার মতে এই কৃষ্ণ হচ্ছে আর্য কৃষ্ণ, যার সাথে তখনো দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণকে একাকার করা হয়নি। অবশ্য কেউ যদি বলেন, বাসুদেব-কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান, তার গাত্রবর্ণ সাদাই কি আর কালোই কি? তবে তা নিয়ে আর কোন তর্ক চলে না। আমরা চাচ্ছি ঐতিহাসিক কৃষ্ণকে আবিষ্কার করতে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠতে পারে। কৃষ্ণ যদি অশ্বেতকায় হন, তবে তার পিতা বসুদেব ও মা দেবকীর এবং সেইসাথে তার মামা কংসকে নিয়ে রচিত কাহিণীটির জন্ম কিভাবে হলো? এবিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপণ করেছেন ডঃ হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, যেটির কথা নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীও লিখেছেন বিভিন্ন সূত্রে। আমরা আভীর জাতির কথা বলেছি। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন যে, যাযাবর এই আভীর জাতি প্রথম ভারত বর্ষে অনুপ্রবেশ করে খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে সিরিয়া কিংবা এশিয়া মাইনর থেকে। তারা তাদের সঙ্গে এনেছিলো যিশু খৃষ্টের নাম। খৃষ্ট পরে কৃষ্টোতে ও পরে কৃষ্ণতে রুপান্তরিত হয়ে হিন্দুদের কৃষ্ণের সাথে মিশে যায়। এখান থেকেই আমার অনুমান যে, বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে বর্ণিত জুডিয়ার রাজা হেরোদ নিয়েছেন ভারতে কংসের রুপ, যে হেরোদও গণকদের মুখে ভবিষ্যদ্বানী শুনে বেথেলহেম ও তার আশপাশের অঞ্চলের দুই বছর বয়সের সব ছেলেশিশু হত্যা শুরু করে এই ভয়ে যে, কোন নির্দিষ্ট লগ্নের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী কোন ইহুদী শিশু তার মৃত্যুর কারণ হবে।
কৃষ্ণের পিতা বসুদেব যেমন কৃষ্ণকে নিয়ে গোকূলে দিয়ে আসেন, আর নিউ টেস্টামেন্টে বর্ণিত জোসেফ ও মরিয়ম যিশুকে নিয়ে পালিয়ে মিশরে চলে যান। ফলে যোসেফ ও মরিয়ম হয়েছেন এখানে বসুদেব ও দেবকী। কৃষ্ণের সাথে আরো একটি গুরুতর মিল পাওয়া যায় যিশুখৃষ্টের সাথে। শ্রীমদ্ভাগবতে পাই, কৃষ্ণ তার বাল্যবন্ধু ও ভক্ত সুদামার পা ধুয়ে দিয়েছিলেন তিনি যে মহানুভবতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা তার প্রমাণ রেখে। তখন কৃষ্ণ দ্বারকার অধিপতি, সম্রাট। একবার তিনি নিজে সুদামের পা ধুয়ে দেন। আরেকবার কৃষ্ণের মহীষী দেবী রুক্মিণী ও কৃষ্ণ দু’জনে মিলে তার পা ধুয়ে দেন। আর যিশুও পাসওভার (Passover) পর্বের আগে শিষ্যদের পা ধুয়ে দিয়েছিলেন তার শিষ্যদের শুদ্ধ করতে। (আগামীকাল শেষ পর্ব)