আজ ১৩ জুলাই সিপিআইএমের প্রয়াত নেতা প্রমোদ দাশগুপ্তের ১১৩তম জন্মদিন। ২০১২ সালে কিছু কাগজে লেখালিখি হয়েছিল অতুল্য ঘোষ, প্রমোদ দাশগুপ্ত, অনিল বিশ্বাস, বিমান বসু ও মুকুল রায়ের মধ্যে কে বড় সংগঠক? তখন মুকুল রায় খুব ক্ষমতাশালী। ওই সব লেখা পড়ে মুকুলবাবু বলেছিলেন, শুনুন, এসব পড়ে আমার লজ্জা লাগে। যারা লিখছেন তাদের উদ্দেশ্য জানি। ওই চার জন আমার চেয়ে বড় সংগঠক।
প্রথম তিন জনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর কজন আর তাদের মনে রেখেছেন?
১৯৮৭ সালে বামফ্রন্ট ২৫১টি আসন ও ৫৪ শতাংশ ভোট পায়। বামফ্রন্ট আমলে সেবারই তারা সবচেয়ে ভালো ফল করে। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে ইন্দিরা গান্ধির হত্যাজনিত সহানুভূতির জেরে কংগ্রেস ১৬টি লোকসভা আসন জিতেছিল। তার ২৮ মাস পর বামফ্রন্ট এত ভালো ফল করায় প্রমোদ দাশগুপ্তের গুরুত্ব কমে, যৌথ নেতৃত্বের ভূমিকা বাড়ে।
এসব কথা কেন বলছি? ৮ জুলাই ২৪ ঘণ্টা চ্যানেলে জ্যোতি বসু কেন বিস্মৃত হলেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। এডিটর গৌতম ভট্টাচার্য সঞ্চালনা করেন। আলোচক ছিলেন মহম্মদ সেলিম ও সাংবাদিক অরুন্ধতী মুখার্জি। জ্যোতি বসু বলতেন, মৃত্যুর পর মানুষ কারুর কথা অবদান মনে রাখেন না।
সঞ্চালক গৌতম বারবার বলছিলেন, কেন বিস্মৃত হলেন জ্যোতি বসু?
১৯৫৬ সালের ১৪ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেস হয়েছিল। সেই কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ স্টালিনকে যথেচ্ছ গালি দেন। কেউ প্রতিবাদ করেননি। তখন নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, লিডার অফ সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার ভিকট্রি ভ্যানকুইশড বাই ক্রুশ্চেভ উইদাউট এনি রিপল। ১৯৫৩ সালের ৫ মার্চ স্টালিন মারা যান। ৩৫ মাসের মধ্যে স্টালিনকে বলা হলো রাক্ষস এবং আরও কত কী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্টালিনের ভূমিকা দশ বছরেই মানুষ ভুলে গেছেন। তাঁর পার্টিতে ক্রুশ্চেভর বিরুদ্ধে কিন্তু তেমন হইচই হল না। স্টালিনের ইতিবাচক দিকের চেয়ে ১৯৩০ দশকে তাঁর কিছুটা স্বৈরাচারী নেতিবাচক ভূমিকা পার্টি কমরেডরা বড় করে দেখেছিলেন?
স্টালিন যদি বিস্মৃত হন তাহলে কাল হয়তো মাও বা চাচা, হো বা ফিদেল হবেন। কারণ কি? জ্যোতি বসু হবেন না কেন?
মনে হয় ১৯৪০ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত জ্যোতি বসুর গুণ, ভূমিকা তাকে জননেতা করেছিল।
কিন্তু ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্ক, বিমা, খনি জাতীয়করণ, এবং ১৯৯১ সালের মনমোহন সিংয়ের অর্থনীতির ফল একুশ শতকের গোড়া থেকে সমাজটাকে পাল্টে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যার বিপুল বিস্ফোরণ, দারিদ্র্য সীমার নিচের মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া, গ্রামেও বহু পরিবারে অকৃষি পেশা ছেড়ে এটা ওটা করে মাসে দশ বারো হাজার টাকা রোজকার করার ব্যবস্থা হয়েছে। বামপন্থী অর্থনীতিবিদরা মনমোহন সিংয়ের অর্থনীতির শুধু কুফল দেখতে পান, কত লোক কাজ হারিয়েছেন তার উল্লেখ করেন। কিন্তু তাঁরা দেখতে পান না রোজগারের কত নতুন নতুন পথ বেরিয়েছে।
কাকাবাবু, জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, সোমনাথ লাহিড়ি, ত্রিদিব চৌধুরী, চিত্ত বসু, সুবোধ ব্যানার্জিরা যখন ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ দশক পর্যন্ত বামপন্থী আন্দোলন করেছিলেন তখন সমাজটা অন্যরকম ছিল। এটা শুধু বাংলা বলে নয়। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, অসম, ত্রিপুরা, মনিপুর সর্বত্র কমিউনিস্ট পার্টি খুবই দর্বল হয়েছে। কারণ সেই এক কথা, সমাজটা পাল্টেছে, শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে, সার্ভিস সেক্টর কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধিতে কৃষকের সংখ্যা কমেছে।
১৯৮০ দশক পর্যন্ত দেখা গেছে ভালো রেজাল্ট করা ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরি পাচ্ছেন না। তখন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো স্লোগান দিত শিক্ষা শেষে চাকরি চাই। ছাত্র সংগঠনের মধ্যেকার পার্টি সদস্যরা বলতেন এই বুর্জোয়া জমিদার রাষ্ট্র চাকরি দিতে পারবে না। এই রাষ্ট্র ভেঙে বিপ্লব করতে হবে। এজন্যেই তো দীনেশ মজুমদার, বিমান বসু, শৈবাল মিত্র, শ্যামল চক্রবর্তী, বিমান বসু, কাকা, ১৯৬০ দশক কাঁপিয়েছে। তখনকার আর্থ-সামাজিক অবস্থায় কাঁপাতে পেরেছে। এখন হলে কি পারতেন?
বড়জোর মাঝে মধ্যে যাদবপুর, কলকাতা, প্রেসিডেন্সিতে ‘হোক কলরব’ হয়। কিন্তু কোথায় সেই ছাত্র আন্দোলন? ১৯৫৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ও ১৯৬৫-১৯৬৬ সালের ছাত্র আন্দোলন বাংলা কাঁপিয়েছিল। তখন ছাত্রনেতারা কলেজ থেকে ক্যাডার সংগ্রহ করবেন বলে বছরের পর বছর পরীক্ষা দিতেন না। আর এখন? পরীক্ষার আগে সব ছাত্র দিনে ১৫/১৬ ঘণ্টা পড়তে থাকেন। কারণ শেষ সেমিস্টারের আগেই বিভিন্ন বড় কোম্পানি এসে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ করে বছরে অন্তত ২৫ লাখ টাকার চাকরি দেয়। আইআইটি, আইআইএম থেকে কেউ কেউ বছরে কোটি, সোয়া কোটি টাকার চাকরি পাচ্ছেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার বাবা যে টাকা পেয়ে অবসর নিচ্ছেন ছেলে ঢুকছেন তার চেয়ে বেশি মাইনেয়। এসব তিরিশ বছর আগে ভাবা যেত? ১৯৯১ সালের গোড়ায় চন্দ্রশেখর সরকার সোনা বন্ধক রাখে। শর্ত মেনে আইএমএফ থেকে ৫০০০ কোটি ডলার ঋণ নেয়। বামপন্থীরা তখন এর সমালোচনা করে বলেছিলেন, এর ফলে ভারত গ্রিস, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোর দশায় পড়বে, ঋণের ফাঁদে পড়বে। কিন্তু তিরিশ বছর কিছু হয়নি।
জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, ইন্দ্রজিৎ গুপ্তরা যখন ১৯৫০-২৯৬০ দশকে সভায় বলতেন তখন ওরা ১০ ফুট বাই ৬ ফুটের মঞ্চে সতরঞ্চিতে বসতেন। শ্রোতারা বাড়ি থেকে চাটাইয়ের আসন এনে বসতেন। সেই অবস্থা আজ নেই। আজ যদি প্রমোদবাবু, জ্যোতিবাবু চেষ্টা করতেন পারতেন? যে সমাজে স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের সংখ্যা বিরাট, যে বাস্তব অবস্থা বুঝিয়ে দিচ্ছে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়াও ভূমি সংস্কার হয়, কৃষকের আয় বাড়ে, সেখানে লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইটার যুগোপযুগী সংশোধন না করে ডগমা আপ্তবাক্য আঁকড়ে থাকলে কোনো অগ্রগতি হবে না।
সমস্যা হলো সিপিআইএমের মধ্যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নতুন ভাবনাচিন্তা কিছুটা করেছিলেন। কিন্তু তার ধারণা ছিল সরকার চালাতে গেলে সে কাজটাই মন দিয়ে করা উচিত। পার্টির কর্মসূচির ১১২ ধারা মেনে সরকারের কাজের টার্গেট হবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যে সংগঠনের বিস্তার করা এই অবাস্তব চিন্তা তাঁর ছিল না। জ্যোতি বসু ১৯৪০ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত একটানা বিরোধী ও বামপন্থী রাজনীতি করার ফলে তিনি কখনও রাজ্যে শিল্পায়ন তথা সংস্কারের পথে এক পা এগিয়ে আবার দু পা পিছিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অবসরের পর বলেছেন শ্রমিকশ্রেণি তার অধিকার কারুর কাছে এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের কাছেও ছাড়বে না।
প্রমোদ দাশগুপ্ত আরও কট্টর ছিলেন। কড়া ধাঁচের নেতা ছিলেন। জীবনযাত্রা সরল ছিল। নিজে হাতে ধুতি-পাঞ্জাবি কেচে ইস্ত্রি করতেন। অকৃতদার এই নেতার পার্টি ছাড়া কোনও ভাবনা ছিল না। কিন্তু কিছু দোষও ছিল। পার্টির মধ্যে উপদলীয় কোন্দল এবং তাঁর কথা মত না চললে পার্টি থেকে বহিষ্কার তিনি সহজেই রাজ্য কমিটিতে পাশ করিয়ে নিতেন। কারণ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে বলার সাহস রাখতেন না। ১৯৭৪ সালের গোড়ায় তখনকার ‘মাসিক বাংলাদেশ’ পত্রিকা দু-মাস আগে প্রয়াত মুজফফর আহমেদকে নিয়ে একটা সংখ্যা করেছিল। সেই সংখ্যায় সিপিআইএমের তদানীন্তন তাত্ত্বিক নেতা পীযূষ দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, কাকাবাবু তাঁকে বলেছিলেন, রাশিয়ায় পার্টি গড়েছিলেন প্লেকানভ, চিনে চেন পু সিউ-এ মতো প্রতিভাবান নেতারা। ভারতে পার্টি আমরা গড়েছি। আমাদের হাতে আর কতটা হতে পারে? এই লেখা প্রকাশের পরেই প্রমোদ দাশগুপ্ত তাঁর ভগ্নিপতি সুধাংশু দাশগুপ্তকে দিয়ে সাপ্তাহিক দেশহিতৈষী পত্রিকায় পীযূষবাবুর তীব্র সমালোচনা করে লেখান। সুধাংশবাবু লিখেছিলেন, পীযূষবাবু সংশোধনবাদী কথা প্রচার করছেন। এর পাল্টা সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকায় তিনটি সংখ্যায় পীযূষ দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘কাকাবাবুর প্রতিটা কথা তথ্যে তথ্যে বর্ণে বর্ণে সত্য। এই লেখার জন্য পীযূষ দাশগুপ্তকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেটা ১৯৭৪ সালের মাঝের কথা। তখন বলা হত, দুই পিডিজির লড়াই চলছে।
বাংলাদেশের ফরিদপুরে তাঁর জন্ম। তার বাবাও ডাক্তার ছিলেন। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনিই বড় ছিলেন। ডাক নাম ছিল খোকা। তাঁকে রাজনীতিতে আনেন নিরঞ্জন সেনগুপ্ত। ১৯২৮ সালে ১৮ বছর বয়সে কলকাতায় আসেন ক্যালকাটা টেকনিক্যাল স্কুলে পড়তে। কিন্তু পরের বছর গ্রেফতার জন। কয়েকবার বেশ কিছু বছরের জন্যে জেলে ছিলেন। ১৯৩৮ সালের ১ মে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। কাকাবাবু তাঁকে পার্টি সংগঠনের পাশাপাশি বন্দর শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে বলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয় সে সময় স্বাধীনতা পত্রিকার জেনারেল ম্যানেজারের কাজ। সোমনাথ লাহিড়ি ছিলেন সম্পাদক।
জ্যোতি বসু ও তিনি ১৯৪৭ সালের রাজ্য সম্মেলনে রাজ্য কমিটির সদস্য হন। জ্যোতিবাবু ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত রাজ্য সম্পাদক ছিলেন। তারপর থেকে প্রমোদবাবু অবিভক্ত সিপিআই ও পরবর্তীকালে সিপিআইএম গঠনের সময় থেকে তিনি আজীবন সম্পাদক ছিলেন।
তাঁর খুব হাঁপানির রোগ ছিল। ১৯৮২ সালের নভেম্বরে ৭২ বছর বয়সে তাঁর হাঁপানি খুব বাড়ে। চিকিৎসকদের পরামর্শে পার্টি তাঁকে একমাসের জন্য দিঘার সমুদ্রপাড়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। কলকাতা থেকে বেশ কিছু ছাত্রনেতা গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। তারপর বাসব পুন্নাইয়ার প্রস্তাবে তাঁকে চিনে পাঠানো হয় শরীর ভালো করার জন্য। সঙ্গী ছিলেন ৩৮ বছর বয়সি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেখানে তাঁর শরীর আরও খারাপ হয়। ১৯৮২ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রয়াত হন।
সবমিলিয়ে একটা কথা বলা যায়, প্রমোদবাবু জননেতা না হলেও পার্টি সংগঠক ছিলেন। অতুল্য ঘোষ কেমন নেতা ছিলেন, তা পরবর্তীকালে আলোচনা করা যাবে।