কল্যাণ সেনগুপ্ত
একবছর বাদেই এরাজ্যে ভোট। এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, মূল লড়াই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির। তৃতীয় পক্ষও আছে, সিপিএম-কংগ্রেস জোট। সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে আলাদা লড়ে সিপিএম পায় ৭% আর কং ৪%। কিন্তু কংগ্রেস দুটি আসনে জিতলেও সিপিআইএম শূন্য। এর কারণ কংগ্রেসের ভোট ৪% হলেও তা দুটি জেলায় ৩৫% আশেপাশে বেশ ঘন, ফলে দুটি আসন লাভ। ভাবা গিয়েছিল ২০১৯-এর ভোটে যাদবপুর আসনে লড়াই হবে তৃণমূলের সাথে সিপিআইএম নেতা ও প্রাক্তন মেয়র বিকাশ ভট্টাচার্যের। কারণ, ঐ কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী অনুপম হাজরা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ন ছিলেন না। কিন্তু দেখা গেল, যাদবপুরেও সিপিআইএম যথারীতি তৃতীয়, যদিও একমাত্র এই কেন্দ্রে জামানত বাঁচেছে। বিগত ২০১৯-এর ভোটে সিপিআইএমের সাংগঠনিক দৈনতা সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়লো। এতদসত্বেও দলে এনিয়ে বিশেষ হেলদোল দেখা গেল না, বরং বেশ উৎসাহই দেখা গেল বিজেপি ১৮টি আসন পাওয়ায় এবং তৃণমূলের আসন সংখ্যা কমে ২২টি হবার কারণে।
সম্প্রতি দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধীর আহ্বানে বিরোধী দলগুলোর একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস ও বাম নেতৃত্বও উপস্থিত ছিল। এর ফলে একটি নতুন সম্ভাবনার পথ খুলতে পারে। এমতাবস্থায় তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআইএম যদি পুরানো শত্রুতা ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে রাজি হয় তবে তা শুধু রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, জাতীয় ক্ষেত্রেও এক নয়া দিগন্ত খুলে যাবে। বাম-কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেস ঐক্যবদ্ধ হয়ে এরাজ্যে সাফল্য লাভ করলে অন্যান্য আঞ্চলিক বিরোধীশক্তিও মনে বল পাবে। রাস্তার ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ফলে রাজনৈতিকভাবে বিজেপি কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
অবশ্য আরেকটি সম্ভাবনাও বিদ্যমান। যথা—সিপিআইএম যদি মমতা বিনাশকেই অগ্রাধিকার দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধিতাকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় তাহলে অন্যকথা। প্রায় একবছর বাদে ভোটের আগে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও কংগ্রেস সিপিআইএমের সংগে জোট বজায় রাখার অতীত নীতিতেও অটল থাকবে এমন নিশ্চয়তা আছে কি? বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতিকে মাথায় রেখে তৃণমূল কংগ্রেস বা সিপিআইএমের মধ্যে একজনকেই বেছে নিতে হলে কংগ্রেস কি সামগ্রিক লাভ-ক্ষতির হিসেব কষবে না? সুতরাং, জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি বিপদ, সার্বিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা, দলের সম্মান ও ভবিষ্যৎ, ইত্যাদি সামগ্রিক পরিস্থিতির আগাম পর্যালোচনা করে সঠিক নীতি স্থির করতে হবে সিপিআইএমকেই। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে হঠকারিতা বা কোনও ভুলচুক হলে দলকে ও দেশকে তার কঠিন দাম দিতে হতে পারে। কারণ মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশ কখনও গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষায় এধরনের ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন হয় নি।
অতীত অভিজ্ঞতায় সবাই দেখেছেন যে, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রধান শত্রু নির্ধারণে সিপিআইএম বরাবরই খুব বিভ্রান্ত থেকেছে। ১৯৭৪-৯৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সিপিআইএম কে দুটো জাতীয় দলের মধ্যে কে বড় শত্রু, তাই নিয়ে হাবুডুবু খেতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনে জনসংঘের সাথে যাওয়া নিয়ে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পি. সুন্দরাইয়া পদত্যাগ পর্যন্ত করেছিলেন। ১৯৭৯ সালের জুলাইয়ে মোরারজি দেশাই সরকারের পতনে সিপিআইএমও ভোট দিয়েছিল। কারণ, তখন হঠাৎ জনসংঘ তাদের কাছে বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৯ সালে বোফর্স কাণ্ডের সময় আবার বিজেপির সংগে গিয়ে কংগ্রেসকে প্রধান শত্রু বানিয়ে দিল। ১৯৯১ সালে আবার বিজেপিকে প্ৰধান শত্রু মনে করে আস্থা ভোট কালে ওয়াক আউট করে নরসিমা রাও সরকারকে টিকিয়ে দেয়। ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে চন্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ পার্টি কংগ্রেসে বললো— দুটোই প্ৰধান শত্রু এবং সমদূরত্বের নীতি পালন করা হবে। আবার ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে কলকাতার নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত ১৬তম পার্টি কংগ্রেসে সিপিআইএম-এর সিদ্ধান্ত হোল—বিজেপি ১ নং শত্রু এবং কংগ্রেস ২ নং, যে লাইনের সুবাদে ২০০৪ সালের মে মাসে সিপিআইএম মনমোহন সিং সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেয়।
প্রধান শত্রু নির্ধারণে এই বিভ্ৰান্তির ইতিহাস সিপিআইএম-এর আছে। আগামী বিধানসভা ভোটে ফের বিভ্রান্ত হলে দলই বিপদে পড়বে।