সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘বিশ্ব বাংলা’ সংস্থার বিপণির একটি বিজ্ঞাপন ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘বিশ্ব বাংলা’-তে বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে বিখ্যাত ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ও। এখানে টাঙ্গাইল শাড়ির সম্পর্কে যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আছে তাতে টাঙ্গাইল শাড়ির নানাবিধ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ থাকলেও উৎপত্তিস্থলের উল্লেখ নেই। সেখানে শুধুমাত্র টাঙ্গাইল শাড়ির কেন্দ্র হিসাবে ফুলিয়ার নাম রয়েছে। আর এখানেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। এ এক অদ্ভুত বিতর্ক! যদি বলেন কেন তাহলে তার উত্তরে বলা যায় — টাঙ্গাইল শাড়ি সমগ্র বাংলার, আলাদা করে শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের নয়। ভারতের স্বাধীনতা তথা দেশভাগের পঁচাত্তর বছরের সাক্ষ্য বহন করছে এই শাড়ি। তবুও এই প্রেক্ষিতে কিছু বলার তাগিদেই এই লেখা।

টাঙ্গাইল শাড়ির জন্ম হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে, অবিভক্ত ভারতবর্ষের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ঢাকার নিকটস্থ ধামরাই ও চৌহাট নামক দুটি স্থান থেকে আগত বসাক তন্তুবায়রা মূলত সন্তোষ, ঘারিন্দা ও দেলদুয়ার-এর জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় টাঙ্গাইল শহরকে কেন্দ্র করে আশেপাশের নলশোঁধা, ঘারিন্দা, তারটিয়া, ব্রাহ্মণকুশিয়া, আশেকপুর, চন্ডী, পাথরাইল-সহ বাইশ-তেইশটি গ্রামে তাঁদের বসতি গড়ে তুলেছিলেন। এই সকল তন্তুবায় গ্রামের তাঁতিরা যে শাড়ি বয়ন করতেন তাই ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের শিকার হয়ে টাঙ্গাইলের বসাক তাঁতিরা পশ্চিমবঙ্গে এসে বসতি গড়ে তুলেছিলেন নদিয়া জেলার ফুলিয়ায়। শুধু ফুলিয়াই নয়, পূর্ব বর্ধমান জেলার সমুদ্রগড় ও ধাত্রীগ্রামে এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাতেও উদ্বাস্তু টাঙ্গাইল তন্তুজীবীরা তাদের বসতি গড়ে তুলেছেন। এই সমস্ত স্থানের তাঁতিরা তাদের পারম্পরিক বয়ন কৌশলকে অবলম্বন করে স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে এই দীর্ঘ পঁচাত্তর বছর ধরে টাঙ্গাইল শাড়ি বয়নের ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন। এ দেশে টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার পথটিও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। নানা রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে আজ টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গের হস্তচালিত তাঁতশাড়ির জগতে নিজের স্বতন্ত্র্য জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

স্থানের পরিবর্তন ঘটলেও শাড়ির নামের যে কোন পরিবর্তন ঘটে না তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হল ‘বালুচরি শাড়ি’। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে মুর্শিদাবাদ জেলার বালুচর নামক স্থানে এই শাড়ির জন্ম হলেও পরবর্তীকালে বন্যার কারণে বালুচরি তাঁতিরা বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে চলে আসেন ও মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শাড়ি সমৃদ্ধি লাভ করে। এরপর ব্রিটিশ ভারতে এই শিল্পের অবনতি ঘটলেও ১৯৫৬ সালের পর চিত্রশিল্পী সুভগেন্দ্রনাথ (সুভ) ঠাকুরের উদ্যোগে এই শাড়ির পুনরুজ্জীবন ঘটে। বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত হলেও বালুচরী শাড়ি ‘বিষ্ণুপুরি’ বা অন্য কোনও নাম পরিগ্রহ করেনি, বরং বিষ্ণুপুরের নামেই জিআই পেয়েছে। দেশভাগের বলি হয়ে ভারতে চলে এলেও ‘টাঙ্গাইল’ শব্দটি ছিল বসাক তাঁতিদের অস্থিমজ্জাগত। ফলে উদ্বাস্তু এই তাঁতিরা নিজেদের বয়নীকৃত শাড়ির নাম বা বয়ন কৌশল পরিবর্তন করার কথা কল্পনাও করেননি।

এমনকি বাংলার বস্ত্রশিল্পের অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র শান্তিপুরের সাথে সহাবস্থান করেও ফুলিয়ার টাঙ্গাইল শাড়ি নিজের বয়ন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া টাঙ্গাইলের তাঁতিরা টাঙ্গাইলের রীতি মেনেই শাড়ি বয়ন করবেন সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের একদল সদস্য ১৯৮২ সালের ১৩ জানুয়ারি ফুলিয়ায় এসে টাঙ্গাইল বসাক তন্তুজীবীদের স্বার্থে গঠিত সমবায়ের সাফল্য ও ফুলিয়ার টাঙ্গাইল শাড়ি দেখে অভিভূত হয়ে জানিয়েছিলেন, “দেশের ঐতিহ্য বজায় রেখে আজ ফুলিয়া টাঙ্গাইল শাড়ি বয়ন শিল্প সমবায় সমিতি লি: দেখে খুবই আনন্দিত ও গর্ব অনুভব করছি। বাংলার নাম এই শাড়ির মাধ্যমে আরও উজ্জ্বল হউক ইহাই আমাদের কাম্য।” প্রকৃত অর্থেই আজ এই শাড়ির মাধ্যমে সমগ্র বাংলার নাম (বাংলাদেশ সহ) বিশ্বের কাছে এক নতুন পরিচিতি লাভ করেছে। আজ হয়তো বিবর্তনের পথ পেয়ে টাঙ্গাইল শাড়ির নকশা বা তার বয়ন কৌশলে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে কিন্তু তাই বলে এই শাড়িকে অন্য কোনও নামে পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিলে তা নিজেদের ঐতিহ্য তথা অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার সামিল হবে।

টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে প্রথম তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছিল সম্ভবত ফুলিয়াতেই, ‘টানাপোড়েন’ তন্তুবায় মুখপত্রে। সেখান থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে বা লেখালেখি প্রকাশিত হয়েছে, সর্বত্রই টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তিস্থল হিসাবে বাংলাদেশের নাম গর্বের সাথে উচ্চারিত হয়েছে। কারণ এ হচ্ছে তার শিকড়, তার ঐতিহ্য; একে অস্বীকার করার উপায় নেই বা কেউই সেটাকে অস্বীকার করেনওনি। ফুলিয়ার তাঁতশিল্প গবেষক তথা লেখক হরিপদ বসাক ‘মনোহর বসাক’ ছদ্মনামে টাঙ্গাইল শাড়ি তথা তাঁতিতের অতীত, ঐতিহ্য, দেশত্যাগ, উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম নিয়ে ‘নীলাম্বরীর নকশা’ ও ‘তাঁতিপাড়ার আখ্যান’ নামে দুটি উপন্যাসও লিখেছেন। ফলে ‘বিশ্ব বাংলা’ যেটি করেছে, সেটি একান্তই তাদের ব্যক্তিগত অভিরুচি। তাকে সমর্থন করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তাই বলে টাঙ্গাইল শাড়ির নাম পরিবর্তন করে তাকে ‘ফুলিয়া শাড়ি’ বা অন্য কোনও নামকরণ করাটা একেবারেই অযৌক্তিক বা অনভিপ্রেত। কারণ টাঙ্গাইল শাড়ি শুধুমাত্র ফুলিয়ায় উৎপাদিত হয় না, পশ্চিমবঙ্গের তিন-চারটি জায়গায় টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদিত হয়। যে বৃহৎ বাজার পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত ও বহির্বিশ্বে টাঙ্গাইল শাড়ির তৈরি হয়েছে, যদি তার নাম পরিবর্তন করার কথা চিন্তা করা হয় তাহলে তার সেই সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, বাজার, অর্থনীতি — সবটাই ধাক্কা খাবে! আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজেদের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা হবে, নিজের জন্মভূমিকে অস্বীকার করা হবে!

আর জিআই (জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন)-এর প্রশ্ন যেখানে উঠছে সেখানে বলি, জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন দেওয়া হয় কোনও একটা পণ্যের মৌলিকত্বকে বজায় রাখার জন্য, তার পরিচিতিকে তুলে ধরার জন্য যাতে তার নকল কেউ করতে না পারে বা সেটি সাফল্যের সাথে এগিয়ে যেতে পারে। ইতিপূর্বে বাংলার অন্যান্য তাঁতবস্ত্রগুলি জিআই-এর আওতায় এসেছে। টাঙ্গাইল শাড়ির সাথে সহাবস্থানকারী ‘শান্তিপুরি শাড়ি’ বেশ কিছুদিন আগে জিআই পেয়েছে। ইতিপূর্বে টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জিআই-এর আবেদন করা হলেও নামে ‘টাঙ্গাইল’ থাকায় আবেদন খারিজ হয়ে যায়। আবারও সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সেটি বাস্তবায়িত না হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে পূর্বোক্ত কারণেই।

কিন্তু প্রশ্ন হল, জিআই নিয়ে লাভটা কি হবে? হয়তো আমরা একটা গাল ভরা নাম পাব, তা ছাড়া আর কিছু নয়। জিআই যদি বয়ন শিল্পের ধারাকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হত, তাহলে আমার বলার কিছু ছিল না। শান্তিপুরি শাড়ি তো অনেকদিন আগেই জিআই পেয়েছে। কিন্তু তাতে শান্তিপুরি শাড়ি তথা শান্তিপুরের হস্ত-তাঁতশিল্পের বিন্দুমাত্র উন্নতি ঘটেছে কি? ক্রমান্বয়ে যে সেই শিল্প ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে সেটা আজ আর কারও অজানা নয়! শুধু শান্তিপুরি শাড়ি নয়, সমগ্র বাংলার হস্তচালিত তাঁতশিল্পই আজ সংকটের মুখে! এমতাবস্থায় জিআই হোক বা না হোক, তাতে টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপাদন বা বাণিজ্যের কিছু মাত্র হেরফের হবে না। বরঞ্চ জিআই-এর নাম করে যদি ‘টাঙ্গাইল’ নামটি পরিবর্তন করে অন্য কোনও নাম করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে সেটা এই শিল্প, এই শাড়ির ঐতিহ্যকে সমূলে বিনাশ করবে; নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করবে, নিজের জন্মভূমির শিকড়কে অস্বীকার করবে।

আমি তো বলব, দরকার নেই জিআই-এর, কিন্তু ‘টাঙ্গাইল’ নামটা থাকুক। কারণ এই নামটাকে আমাদের পূর্বজরা পরম যত্নে লালন করেছেন, এর জোরেই শিকড় উপড়ানো মানুষগুলো নতুন করতে বাঁচতে পেরেছিলেন! আজকে আমরা পাওয়ারলুমের জয়গান গেয়ে টাঙ্গাইল শাড়ি-নির্ভর হস্ততাঁতের বারোটা বাজিয়েই দিয়েছি, নামটাই না হয় থাকুক আমাদের বাপ-ঠাকুরদার স্মৃতি হয়ে! আর পরিশেষে বলি, অবিলম্বে ‘বিশ্ব বাংলা’ যে বিবরণ দিয়েছেন সেখানে টাঙ্গাইল শাড়ির নামকরণের ইতিহাসের উল্লেখ থাকুক। তা না হলে বিশ্বের দরবারে সত্যের অপলাপ হবে যে!
ছবি : লেখক, ফুলিয়া, ০২.০১.২৩
ধন্যবাদ ও অভিনন্দন নিলয় টাঙ্গাইল শাড়ি বিষয়ক সচিত্র প্রতিবেদনটি পেজ ফোর এ প্রকাশের জন্য। টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গটি বেশি করে জন্য সমক্ষে উপস্থাপন হওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।