গত বৃহস্পতিবার গুজরাটের সুরাট জেলা আদালত রাহুল গান্ধীকে ২ বছরের জেলের নির্দেশ দেয় আর তার পরের দিনই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা কংগ্রেস নেতার সাংসদ পদ খারিজ করেন ভারতীয় সংবিধানের ১০২(১)-ই অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (১৯৫১)-র ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। ঘটনা হল গত ২০১৯ সালের ১৩ এপ্রিল কর্নাটকের কোলারে এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি ‘মোদী’ পদবি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। উল্লেখ্য, রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল পুর্ণেশ মোদী নামে দেশটির শাসকদল বিজেপির এক আইনপ্রণেতার অভিযোগের ভিত্তিতে, যিনি বলেছিলেন যে, রাহুল গান্ধীর মন্তব্য সমগ্র মোদী সম্প্রদায়ের জন্য মানহানিকর। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনার মধ্যে অতি তৎপরতা আর দ্রুততা যেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তেমনই শাসক দলের হল্লা মাচিয়ে সংসদের অধিবেশন বানচাল করা, রাহুল গান্ধীর মুখ বন্ধ করে দেওয়া, প্রায় তামাদি হয়ে যাওয়া একটি মানহানির মামলা হঠাৎ একমাস আগে বিচারপতি বদলে নতুন করে তৎপরতা শুরু করার মধ্যে বিরোধীরা একটি সুপ্রকল্পিত ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২২-এর ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩-এর ৩০ জানুয়ারি রাহুল গান্ধী ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ কর্মসূচি করেন। শ্রীনগরে এই কর্মসূচিতেই রাহুল শ্রীনগরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আমি জানতে পেরেছি মহিলারা এখনও যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন”। তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতেই গত সপ্তাহে দিল্লি পুলিশের তরফে নোটিস পাঠানো হয়। এরপর গত রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ রাহুল গান্ধীর দিল্লির ১২, তুঘলক লেনের বাড়িতে হাজির হয় পুলিশ। পুলিশের দাবি, নির্যাতিতদের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতেই পুলিশের দল রাহুলের বাড়িতে যায়। প্রশ্ন, ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ শেষ হয়েছে ৩০ জানুয়ারি। এত দিন পর কেন এই পদক্ষেপ। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নিয়ে এভাবে তথ্য যাচাইয়ের ঘটনা আর কি ঘটেছে? এখন রাহুল গান্ধী আর সংসদে নেই। লন্ডনে তাঁর ভাষণ নিয়ে সাফাই, আদানি কাণ্ডে যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে কোনও বক্তব্য, কোনও দাবিই আর তিনি লোকসভায় দাঁড়িয়ে রাখতে পারবেন না। রাজনৈতিক মহলের মতে বিজেপি’র সুপরিকল্পিত চাল হল মূদ্রাস্ফীতি, বেকারি এবং ভারতের অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলি থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া।
বিজেপি-বিরোধী শিবির এই মুহূর্তে আদানি-কাণ্ডে সংসদে জেপিসি চেয়ে এককাট্টা। তার নেতৃত্বে কংগ্রেস। তার আগে রাহুলের উদ্যোগে হওয়া ভারত জোড়ো আন্দোলন কিছুটা হলেও কংগ্রেসের নাজেহাল পরিস্থিতিকে কিছুটা হলেও সামাল দিয়েছে। ঠিক এই আবহে আইনি পথে রাহুলের সাংসদপদ খারিজকে রাজনৈতিক মহল মোদীর দলের সুপ্রকল্পিত ষড়যন্ত্র বলেই মনে করছে। অন্যদিকে এদিনও প্রাক্তন সাংসদ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ শানিয়েছেন, শিল্পপতি গৌতম আদানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সখ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিরক্ষা খাতে আদানি গোষ্ঠীকে ২০ হাজার কোটির বরাত দিয়েছে কেন্দ্র। কোথায় গেল সেই টাকা? নিয়ম বহির্ভুতভাবে আদানি গোষ্ঠীকে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করে রাহুল বলেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আদানি গোষ্ঠীর ভুয়ো সংস্থাকে বরাত দেওয়া হয়েছে। বরাত পেয়েছে একটি চিনা সংস্থাও। কেন তাঁদের এই বরাত দেওয়া হচ্ছে? বিজেপি তাঁর সাংসদ পদ খারিজ করেও মুখ বন্ধ করতে পারেনি। জেলে বন্দি করে রেখেও কি তাঁর মুখ বন্ধ করা যাবে?
আসল কথা হল মোদি সরকার উপহাস করে পাপ্পু বললেও রাহুলকে তারা ভয় পায়। কিন্তু কেন? রাহুলের যদি জনসমর্থন না থাকে, কংগ্রেস যদি অপ্রাসঙ্গিক হয় তাহলে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া? রাহুল গান্ধী যদি সিরিয়াস নেতা না হন, তাহলে কেন তাঁকে বারবার উপহাস ও আক্রমণ? আসলে মূদ্রাস্ফীতি, বেকারি এবং আদানিকাণ্ডে মোদী ও তাঁর সরকার উদ্বিগ্ন। সেই কারণেই বিজেপি নেতারা ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’কে ‘ভারত তোড়ো যাত্রা’ অভিহিত করেন। তাদের আরও বড় কষ্টের কারণ ওই যাত্রা থেকে রাহুল গান্ধীর ভাবমূর্তির পরিবর্তন। লক্ষ্যনীয়, ভারত জোড়ো যাত্রার পর থেকে মোদী ও বিজেপি রাহুল গান্ধীর পাপ্পু নাম আর শোনা যাচ্ছে না। বরং মোদী শুনতে পাচ্ছেন, জনগণ প্রশ্ন করছে, যে ১৫ লাখ টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকার কথা ছিল তা কোথায় গেল? বছরে দু-কোটি চাকরি কারা পেলো? কবে কৃষকের আয় দ্বিগুণ হচ্ছে? চিন ভারতের কতখানি জমি দখল করেছে? হয়তো বা মোদী ক্রমশই এসব প্রশ্নের একেবারে সামনে পৌঁছে গিয়েছেন, তাই তিনি পাপ্পুকে ভয় পেয়েছেন।