ডলারের নিরিখে টাকার রেকর্ড পতন! সোমবার সকালে এক ডলারের দাম ছুঁল ৮০ টাকা ১১ পয়সা। মার্কিন দেশে সুদ বৃদ্ধির সম্ভাবনাতেই এদিনের ধস, মনে করছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা।
বিগত কয়েক মাস ধরেই টাকার নিম্নমুখী গতি অব্যাহত। মাঝে মাঝে কিছুটা উঠলেও আবার আগের রেকর্ড ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে টাকা। মনে করা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড়সড় সুদ বৃদ্ধির সম্ভাবনাতেই সোমবার পিছু হটেছে ভারতীয় মুদ্রা।

মার্কিন দেশে সুদ বৃদ্ধি
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে সারা দুনিয়া জুড়ে দেখা দিয়েছে মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা। অপরিশোধিত পেট্রোলয়ামের দাম বৃদ্ধি, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জোগানের ঘাটতি এই দাম বাড়ার প্রাথমিক কারণ বলেই মনে করা হচ্ছে। মার্কিন দেশে শ্রমমন্ত্রকের কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) অনুয়াযী চলতি বছরের জুনে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯.১ শতাংশ, যা বিগত চার দশকে সর্বোচ্চ। সে দেশে জুলাইতে দরদাম বৃদ্ধি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৫ শতাংশে, যেটাও যথেষ্ট উদ্বেগের। মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলা করতে গত কয়েক মাসে সুদ বাড়িয়েছে মার্কিন দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফেড রিজার্ভ। ২০২২-এর মার্চ মাসে সে দেশে সুদের হার ছিল শূন্যের কাছাকাছি। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে একাধিকবার সুদ বৃদ্ধির ফলে এখন সে হার আড়াই শতাংশ। তীব্র মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই বার বার সুদ বাড়ার পরে বাজার আশা করেছিল, এবার হয়তো সুদ বৃদ্ধির গতিতে রাশ টানবে সে দেশ।
কিন্তু ২৭ আগস্ট মার্কিন ফেড রিজার্ভ-এর চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সে আশায় জল ঢেলেছেন। ৮ মিনিটের এক বক্তৃতায় পাওয়েলের ইঙ্গিত, মূল্যবৃদ্ধি রুখতে আরও কড়া হবেন তাঁরা, আরও বাড়ানো হবে সুদের হার। এতেই দুনিয়া জুড়ে শেয়ার বাজার পড়তে শুরু করে, শুরু হয় ডলারের ভারত ত্যাগও।

বেরিয়ে যাচ্ছে ফাটকা লগ্নি পুঁজি
এ দেশ ছেড়ে বিদেশি পুঁজি মার্কিন দেশের দিকে ধাবমান হওয়ায় ডলারের চাহিদা বাড়ে। চাহিদা-জোগানের অঙ্কে টাকার পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। লগ্নি বাজার থেকে বিদেশি পুঁজি বহির্মুখী হওয়ায় সোমবার ভারতের শেয়ার বাজারে ধস নামে। সোমবার সেনসেক্স পড়েছে ৮৬১.২৫ পয়েন্ট বা ১.৪৬ শতাংশ, বাজার শেষে সেনসেক্স দাঁড়িয়েছে ৫৭,৯৭২.৬২ পয়েন্টে। এদিন নিফটি-র পতন ২৪৬ পয়েন্ট বা ১.৪০ শতাংশ, দিনের শেষে নিফটি হয়েছে ১৭,৩১২.৯০ পয়েন্ট। শেয়ার বাজারে ফিরেছে আশঙ্কা, আরও পতনের সম্ভাবনায় ম্রিয়মান দালাল স্ট্রিট। এ দেশ থেকে পুঁজি বা ফাটকা পুঁজি বেরিয়ে গেলে সেটা মূলত ডলারেই বেরোয়। তাই শেয়ার তথা মূলধনি বাজার থেকে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যাওয়াতেও বাড়ছে ডলার-মূল্য।
আমদানি বেশি রপ্তানি কম
আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্যের অভাবেও ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে টাকা। এ দেশে রপ্তানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি। সর্বশেষ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, গত মাসে (জুলাই ২০২২) ভারতের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩,৬২৭ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২১ সালের জুলাইতে এই অঙ্ক ছিল ৩,৫৫১ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিগত এক বছরে রপ্তানি বৃদ্ধি মাত্র ২.১৪ শতাংশ।
আমদানি কিন্তু বেড়েছে অনেক বেশি হারে। জুলাই ২০২২-এ আমদানি হয়েছে ৬,৬২৭ কোটি ডলার। গত বছর একই মাসে যা ছিল ৪,৩৬১ কোটি ডলার। তাই বিগত বারো মাসে আমদানি বেড়েছে ৪৩.৬১ শতাংশ।

আমদানি-রপ্তানির ফারাক অথবা বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে বিপুল ভাবে। জুলাই ২০২২-এ রপ্তানির থেকে প্রায় ৩,০০০ কোটি ডলার বেশি আমদানি হয়েছে। এক বছর আগে এই অঙ্ক ছিল ১,০৬৩ কোটি ডলার। তাই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৮২.১০ শতাংশ।
ওপরের তথ্যগুলির সহজ অর্থ হলো, রপ্তানি করে যত ডলার দেশে আসে, আমদানিতে দরকার হয় তার থেকে কয়েকগুণ বেশি ডলার। ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী আমদানি, তাই বাড়তি ডলারের চাহিদা। আমদানির বিল মেটাতে ডলারের চাহিদা বেশি, জোগান কম, ফলে বাড়ছে ডলারের দাম। বারবার চেষ্টা করেও রফতানি বাড়াতে বা আমদানি কমাতে ব্যর্থ কেন্দ্র। বড়াই করে বছর দুয়েক আগে থেকে বলা হচ্ছিল, মেক ইন ইন্ডিয়া। অর্থাৎ, উন্নত শিল্পজাত পণ্য এ দেশেই উৎপাদিত হোক, আসুক বাইরের দেশগুলির বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো, তাদের সরকার সহায়তা দেবে। কিন্তু সে প্রচেষ্টা লম্বাচওড়া ভাষণের বেশি এগোয়নি। ফলে আমদানি নির্ভরতা আরও বাড়ছে।
টাকায় আমদানি রপ্তানি
কেন্দ্র তথা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকার মাধ্যমে আমদানি রপ্তানি চালু করার চেষ্টা শুরু করেছে। অর্থাৎ ডলার এড়িয়ে ভারতীয় মুদ্রাতেই আমদানি রপ্তানি-র সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। গত ২১ জুলাই (২০২২) জারি করা এক সার্কুলারে দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক জানিয়েছিল, অবিলম্বে চালু হবে নয়া ব্যবস্থা। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলিকে খুলতে হবে বিশেষ অ্যাকাউন্ট। তবে বাণিজ্যের এহেন ধরনে রাজি হতে হবে অন্য দেশগুলিকেও। বলা হয়েছে, যেসব সংস্থা আমদানি বা রপ্তানি করবে, তাদের তা করতে হবে টাকায়। এ-দেশের এবং বাণিজ্যে অংশ নেওয়া দেশগুলির সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলিকে বিশেষ ‘ভোস্ত্রো’ অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। ডলারকে এড়িয়ে ভারত ও বাণিজ্যে অংশ নেওয়া দেশগুলির মুদ্রার বিনিময় হার ঠিক হবে। এ কাজে অংশ নেওয়া অথরাইজ্ড ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দিষ্ট ইনভয়েস ইত্যাদি রাখতে হবে। রপ্তানির জন্য অগ্রিম নিতে গেলেও ব্যবহার করতে হবে ‘ভোস্ত্রো’ অ্যাকাউন্ট। ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৯৯ অনুযায়ী এই নির্দেশ জারি হয়েছে।

একথা অস্বীকার করা যায় না যে, ডলারের মাধ্যমে বাণিজ্যের একচেটিয়া ব্যবস্থার নানা বিপদ আছে। সম্প্রতি রাশিয়াও তাদের মুদ্রাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুরু করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে কেবল একটি দেশ সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, বাণিজ্যে অংশ নেওয়া অনেক দেশকে একই ধরনের ব্যবস্থায় আসতে হবে। ডলারকে সবাই মেনে নেওয়ায় নানা দেশের মুদ্রার দাম বোঝার সুবিধা রয়েছে। বিভিন্ন দেশ নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন শুরু করলে জটিলতা বাড়তে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ডলারের একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করেছে অনেক সমস্যাও, মার খাচ্ছে ভারতের মতো অনেক দেশ। কিন্তু অন্য দেশগুলির ব্যাঙ্কগুলি কতটা এই নতুন ব্যবস্থা মানতে রাজি হয়, সেটাও দেখার। এখনও পর্যন্ত অবশ্য টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়াসে তেমন সুফল মেলেনি।
টাকার দাম কমায় আমদানিতে খরচ বাড়ছে। আমদানিকারীরা সেই বাড়তি বোঝাটা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে ফেলছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, বাড়ছে মূল্যবৃদ্ধির সূচক। চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে।

সোমবার সকালে ডলার পিছু টাকার দাম ৮০ টাকা ১১ পয়সায় নামলেও পরে কিছুটা উঠে ৭৯ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়। তবে এখানেই পতন থামবে বলে মনে হয় না। বাজার বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ না থামলে টাকার দামে উন্নতির আশা কম। প্রথমত, অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের দাম অনেক সময়েই লাগাম ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। দেশেও একটানা বাড়ছে পেট্রোল, ডিজেল বা রান্নার গ্যাসের দাম। আগে সরকার বড় পরিমাণে ভরতুকি দিত। এখন ভরতুকি প্রায় উঠিয়েই দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও রাশিয়ার উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক জিনিসই বাজারে অমিল হচ্ছে। চিন আমেরিকা সম্পর্কও ক্রমেই তলানিতে ঠেকছে। তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ বাড়ছে। দুনিয়ার আরও নানা প্রান্তে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ইস্রায়েল প্যালেস্তাইন, ইরান বনাম ইস্রায়েল, আফ্রিকার নানা এলাকায় গুলিগোলা চলছেই। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে দুনিয়া জোড়া বাণিজ্যের ব্যবস্থাটি। আন্তর্জাতিক আর্থব্যবস্থার বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আগে অনেক বিনিয়োগকারীই ইয়োরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির বন্ডে লগ্নি করতেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইয়োরোপের অর্থনীতি চাপের মুখে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত পেট্রালিয়াম আমদানি নিয়ে ইয়োরোপের নানা দেশের সঙ্গে আমেরিকার টানা-পোড়েন বাড়ছে। এই অবস্থায় কমছে ইয়োরোপে লগ্নি, ডলারে বিনিয়োগই নিরাপদ মনে করছেন ওই অংশের বিনিয়োগকারীরা। এতেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে ডলারের দাম। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের নিজস্ব আর্থিক স্থিতি কতটা মজবুত থাকে, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর দাবি করেছেন, চলতি বছরে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি বা জিডিপি বৃদ্ধি হবে ৭.৪ শতাংশ হারে। অনেকেই মনে করেন, সেটা সম্ভব হবে না। তাঁদের মতে, টাকার দামে পতনও চলতে থাকবে, চলতি বছরের শেষ দিকে এক ডলারের দাম দাঁড়াতে পারে ৮২ টাকায়।