জঙ্গলে ঝড়ে যাওয়া গাছের পাতায় আগুন লেগে যাওয়ার ঘটনা অনেক সময় একটা বড় অগ্নিকান্ডের চেহারা নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বনাঞ্চল এমনকি আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছে বহু ছোটখাটো প্রাণী এবং কীটপতঙ্গ। আশ্রয়হীন হচ্ছে বহু বন্যপ্রাণ, নষ্ট হচ্ছে তাদের খাদ্য শৃঙ্খল। এই আগুন কিন্তু কোন প্রাকৃতিক কারণে বা দুর্ঘটনার ফলে ঘটছে না। বরং আগুন লাগানো হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বেশকিছু সংরক্ষিত অরণ্যে এটা হয়ে গেছে একটা রুটিন ব্যাপার।

জঙ্গলের শুকনো পাতায় দাহ্য পদার্থ ঢেলে বা স্রেফ দেশলাই জ্বেলে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষ। এদের অনেকে বিশ্বাস করে, এর ফলে অরণ্যে নতুন গাছপালা গজিয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে। আবার অনেকের কাছে এটা ছোটখাটো বন্যপ্রাণ, কীটপতঙ্গ মারার একটা ছক। আগুন লাগার পর প্রাণ ভয়ে বেরিয়ে আসা বা পুড়ে যাওয়া ছোটখাটো প্রাণী তারা শিকার করে। মোট কথা এতে ক্ষতি হচ্ছে অরণ্যের। তাই বনরক্ষীদের অবিলম্বে এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার।

জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং এবং দার্জিলিং জেলার বেশকিছু সংরক্ষিত অরণ্যে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটছে। আগুন লাগছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। সমস্যা হল ব্যাপারটা যে পরিকল্পিতভাবে ঘটছে তা সামনে আসছে না। সম্প্রতি একই জিনিস বারবার ঘটার ফলে বনকর্তাদের টনক নড়েছে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য একটা উদাহরণই যথেষ্ট। গত রবিবার থেকে সোমবারের মধ্যে রাজ্যের ৮৪টি সংরক্ষিত অরণ্যে এধরণের আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে।

আগুন ঠেকানোর দায় শুধুমাত্র বনদপ্তরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে ভুল হবে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও পঞ্চায়েত দপ্তরেরও এব্যাপারে নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। স্থানীয় বহু মানুষ বনে তাদের গরু, ছাগলকে ঘাসপাতা খাওয়াতে নিয়ে আসেন। স্থানীয় মানুষের মতে, এদের অনেকেই গাছপালা বাড়ার জন্য শুকনো পাতায় আগুন লাগিয়ে দেন। তাদের ধারণা শুকনো পাতার ভস্মে জমিতে উর্বরতা বাড়বে। চোরাশিকারীদের কথা তো আগেই বলেছি শুধুমাত্র শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞা নয়, বনে বেআইনিভাবে ঢোকা এবং আগুন লাগানোর বিরুদ্ধে টানা প্রচার চালানো এই সমস্যা রোখার জন্য জরুরি।

মানুষকে বুঝতে হবে অরণ্য একটা খাদ্য শৃঙ্খল। এটা ধ্বংস করলে বহু পশুপাখির বাস্তুতন্ত্র এবং খাদ্য শৃঙ্খল ধ্বংস হয়। উল্টো প্রতিক্রিয়ায় বাসস্থান ও খাবার হারিয়ে বনের পশুপাখি হানা দেয় জনবসতে। আগুন শুধু বন্যপ্রাণীদের থাকার জায়গাই ধ্বংস করে না, এর ফলে নষ্ট হয় প্রাকৃতিক ভারসাম্যও। এতে পরিবেশ দূষণও বাড়ে।