ফি-বছর বন্যা। কেবল ঘাটাল নয়, আরামবাগের ছ’টি ব্লকই বন্যা কবলিত। অথচ মাস্টারপ্ল্যান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে আরামবাগকে। এই প্রশ্নই এখন দানা বেঁধেছে বানভাসি মানুষের মধ্যে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সরব হয়েছেন গোঘাটের বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক।
প্রসঙ্গত, ঘাটাল কিংবা খানাকুলের নিচু এলাকা একেবারে গামলা বা তাওয়ার মতো হওয়ায় বন্যা এলেই তা জমে যায়। সেই বন্যার জলে সহজে না নামায় বন্যার ভয়ংকর রূপ দেখা যায়। ক্ষতি হয় ফসল, ঘরবাড়ি ও মানুষের এমনকী মুত্যু ঘটে অনেক মানুষের। এ চিত্র দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছেন মানুষ। বারবার আবেদন নিবেদন করেছে এখানকার জনপ্রতিনিধিরা। রাজ্য কিংবা কেন্দ্র কেউ সাড়া দেয়নি। সকলেই তাকিয়ে আছেন মাস্টারপ্ল্যানের দিকে। বহু বন্যার জল গড়িয়েছে কেন্দ্র বা রাজ্য কেউ উল্লেখযোগ্যভাবে কাজ করতে পারেনি। মাস্টারপ্ল্যান যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। অথচ এরই মধ্যে কায়দা করে বাদ পড়েছে আরামবাগ। এখানেই ক্ষোভ দানা বেঁধেছে জনমানসে।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ঘাটাল বা আরামবাগের জলনিকাশি ব্যবস্থা এই এলাকার নদীগুলোর ভৌগলিক চিত্র সবকিছুকে নিয়ে বারেবারে সার্ভে হয়েছে। নেতা-মন্ত্রী ও তাবড় তাবড় ইঞ্জিনিয়াররা পরিদর্শন করেছেন। অথচ এই প্ল্যান নিয়ে সামান্যতম কিছু হয়নি। ঘাটালের সঙ্গে জড়িত আরামবাগের ছ’টি ব্লক। প্রায় ফি-বছর বন্যাতে আরামবাগকে ভাসায়। তাই কীভাবে আরামবাগকে বাদ দিয়ে মাস্টার প্ল্যান হচ্ছে?

ঘাটালের সঙ্গে জড়িত আরামবাগ। ঘাটাল প্ল্যান কখনও আরামবাগ ছাড়া হতে পারে না। এমনটাই মনে করছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে আরামবাগ ও ঘাটাল বহু নদ-নদীর সমন্বয়ে ভৌগলিক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘদিন ওই সমস্ত নদ-নদীর সংস্কার হয়নি। ফলে এই দুটি জায়গাই গামলা বা তাওয়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যা এলেই জলনিকাশি ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না। মানুষকে জলবন্দী অবস্থায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এইরূপ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতেই ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আরামবাগ মহকুমা তার সঙ্গে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর-সহ বেশ কিছু এলাকা নিয়ে বৃহৎ আকারের ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান পাল্টে দিতে পারে এই এলাকার ভৌগলিক চিত্র। সম্প্রতি গোঘাটের বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক বিধানসভায় জানতে চেয়েছিলেন ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের কাজ কোন পর্যায়ে? তাতে উত্তর মিলেছিল পূর্ব ও পশ্চিম মেদনীপুর জেলার ৮টি ব্লক ও ২টি পুরসভার ৬৫৭ বর্গ.কিমি বন্যাপ্রবণ অঞ্চল। এখানকার ৮.৭৪ লক্ষ মানুষকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান। প্রথম পর্যায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পটি গত ২০১৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় জলমন্ত্রকের কারিগরি অনুমোদন দিলেও এখনও পর্যন্ত সেই অনুমোদিত অর্থ এসে পৌঁছায়নি। এদিকে রাজ্য সরকার সীমিত আর্থিক ক্ষমতার মধ্যে ১০৩ কিমি নদী খননের কাজ ২০১৮-১৯ বর্ষের গোড়া থেকে চালু করেছে। ইতিমধ্যে ৬০ কিমি নদী খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রাজ্যসরকার ৩৩৯ কোটি টাকা খরচও করেছে।
বিশ্বনাথ কারক জানান, এই প্রকল্পে আগে আরামবাগ যুক্ত ছিল। যেখানে এই প্রকল্পে বাজেট ছিল ১৯০০ কোটির কাছাকাছি। কেন্দ্র ৬০ শতাংশ ও রাজ্য ৪০ শতাংশ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এরপরেও আরামবাগ কীভাবে বাদ যায়? আমাদের দাবি এই প্ল্যানের সঙ্গে অবশ্যই আরামবাগকে যুক্ত করতে হবে। ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানকে সফল করতে হলে যেমন চণ্ডীনদী সংস্কার না করলে যেমন কোনও লাভ হবে না, ঠিক তেমনি আরামবাগের কানাদ্বারকেশ্বর ও মুণ্ডেশ্বরী ও দামোদরের শাখা নদীগুলোর সংস্কার করে সমন্বয় ঘটিয়ে রূপনারায়ণে মিলিয়ে দিতে হবে। একইভাবে গোঘাটের পচাখালি ও দ্বারকেশ্বরের শাখা নদীগুলিকে সংস্কার করে রূপনারায়ণে ফেলতে হবে। তাহলেই উপরিভাগে জমা জল সহজে নিকাশি হবে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতি যেমন কম হবে ঠিক একইভাবে বন্যার হাত থেকে মুক্তি পাবেন। আর তা নাহলে সমস্যা রয়ে যাবে।
এদিকে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের মন্ত্রী গজেন্দ্রসিং শেখওয়াত ও সচিব পঙ্কজ কুমারের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছে। কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র নায়ক বলেন, আর কোনও টালবাহানা নয়, অবিলম্বে কাজ শুরু করতে হবে। তানাহলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে কমিটি।
এদিকে মাস্টার প্ল্যান থেকে আরামবাগকে বাদ দেওয়ায় জনমানসে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। আরামবাগ জুড়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।