মার্কসবাদ ও ধর্মের মধ্যে সম্পর্কটি ঐতিহাসিকভাবে জটিল এবং তাত্ত্বিকভাবে প্রায়শই বিরোধিতাপূর্ণ। কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে ধর্মকে “জনগণের আফিম” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, এবং মার্কসবাদী তত্ত্ব সাধারণভাবে ধর্মকে শাসকশ্রেণির দ্বারা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমের একটি উপায় বলে বিবেচনা করে। এর ফলে বিংশ শতাব্দীতে বহু কমিউনিস্ট দেশ — যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন, আলবেনিয়া বা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো — ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দমনপীড়ন ও রাষ্ট্রনির্দেশিত নাস্তিকতা প্রচারের পথ বেছে নিয়েছিল।
তবে পরবর্তীকালে বাস্তব শাসন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সংহতির প্রয়োজনে বহু সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রকে কঠোর মতাদর্শের পরিবর্তে বাস্তববাদী পথ অনুসরণ করতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা কেবল ধর্মকে সহ্যই করেনি, বরং সক্রিয়ভাবে ধর্মীয় ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেছে। যেখানে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলি ধর্মকে অস্বীকার না করে তাকে নিজেদের সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের অংশ করে নিয়েছে, সেদিকে একটু তাকানো দরকার।
১. ভিয়েতনাম: বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও সমাজতন্ত্রের সহাবস্থান
ভিয়েতনাম এমন এক দেশ যেখানে কমিউনিস্ট শাসন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে আপস ও সহাবস্থানের একটি আদর্শ উদাহরণ দেখা যায়। ১৯৭৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির বিজয় অর্জনের পর সোভিয়েত ধাঁচের নাস্তিকতা নীতিকে প্রাথমিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক প্রভাবের কারণে সরকার দ্রুত তাদের নীতি পরিবর্তন করে।
বর্তমানে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, কাও দাই ও হোয়া হাও সহ একাধিক ধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্র বৌদ্ধ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সমাজকল্যাণ ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের মতো বিষয়েও কাজ করে। ১৯৮১ সালে সরকার-সমর্থিত “ভিয়েতনাম বৌদ্ধ সংঘ” গঠিত হয়, যা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থেকেও শিক্ষা, দাতব্য ও ত্রাণকার্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। করুণা ও সমতার মতো বৌদ্ধ নৈতিক মূল্যবোধকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দেখা হয়।
২. চীন: সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ধর্মের চৈনিকায়ন
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) অধীনে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে ধর্মকে নির্মূল না করে রাষ্ট্র তা নিয়ন্ত্রণের পথে এগিয়েছে। মাও সেতুং-এর যুগে ধর্মবিরোধী অভিযান অত্যন্ত কঠোর ছিল। কিন্তু দেং শিয়াওপিং-এর সংস্কার পর্বের পর (১৯৭৮-এর পর) রাষ্ট্র “ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা”কে সংবিধানে স্বীকৃতি দিয়ে আরও নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে।
চীন সরকার বর্তমানে পাঁচটি ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়, বৌদ্ধধর্ম, দাওধর্ম, ইসলাম, প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টধর্ম ও ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম। এসব ধর্মকে রাষ্ট্র-অনুমোদিত সংগঠনের অধীনে কার্যক্রম চালাতে হয়। রাষ্ট্র এখনও পুরনো দর্শন অনুসারে মার্কসবাদী নাস্তিকতা প্রচার করে, তবে একইসাথে ধর্মকে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক স্থিতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উৎস হিসেবে দেখে।
রাষ্ট্রপতি শি চিনপিং-এর “ধর্মের চৈনিকায়ন” নীতির মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষাকে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টা চলছে। অনুমোদিত মসজিদ ও মন্দিরগুলোকে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধর্মকে সরাসরি দমন না করে রাজনৈতিক লক্ষ্যে ব্যবহার করতে পারে।
৩. কিউবা: ক্যাথলিক ধর্ম ও সমাজতন্ত্রের মিলনস্থল
কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারও ধর্মকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার প্রথমে কঠোর ধর্মবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু দেশের গভীর ক্যাথলিক ঐতিহ্য ও গির্জার সামাজিক ভূমিকা সরকারকে তাদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করে।
১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবা সংবিধান থেকে “নাস্তিক রাষ্ট্র” শব্দটি বাদ দিয়ে “ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র” ঘোষণা করে। আজ ক্যাথলিক নেতারা সরকারের সঙ্গে সমাজনীতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন, এবং ধর্মীয় উৎসব প্রকাশ্যে পালিত হয়। কাস্ত্রো নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে মার্কসবাদ ও খ্রিস্টধর্ম উভয়েই সামাজিক ন্যায় ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণের প্রতি সমানভাবে ক্রিয়াশীল — যা লাতিন আমেরিকার ‘লিবারেশন থিওলজি’র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
৪. লাওস: বৌদ্ধধর্মের অন্তর্ভুক্তি
১৯৭৫ সাল থেকে শাসনরত লাও পিপলস রেভলিউশনারি পার্টি প্রথমে ধর্মবিরোধী নীতি গ্রহণ করলেও দ্রুত বুঝতে পারে যে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে বিরোধ বিপজ্জনক হতে পারে। আজ সরকার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত “লাও বৌদ্ধ ফেলোশিপ অর্গানাইজেশন”-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।
বৌদ্ধ মঠগুলো শিক্ষা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণের কাজে সরকারের সঙ্গে অংশদারিত্ব করে। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেরাও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন। শৃঙ্খলা, সমবায় ও সামাজিক সমতার মতো বৌদ্ধ শিক্ষা সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫. উত্তর কোরিয়া: রাজনৈতিক ধর্ম ও ঐতিহ্য
উত্তর কোরিয়া বিশ্বে সবচেয়ে নাস্তিক রাষ্ট্রগুলির একটি হলেও এর রাজনৈতিক মতাদর্শ ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। কিম ইল-সুং ও তাঁর উত্তরসূরিদের চারপাশে গড়ে ওঠা ব্যক্তিপূজা এমন এক প্রকার “রাজনৈতিক ধর্ম”, যেখানে আচার, মিথ ও পূজা ধর্মীয় অনুশীলনের রূপ ধারণ করেছে।
যদিও প্রচলিত ধর্ম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, পূর্বপুরুষ পূজা ও সামন্ততান্ত্রিক উপাদানের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রথাগুলি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে টিকে আছে। এটি দেখায় যে কঠোরতম মার্কসবাদী রাষ্ট্রেও আধ্যাত্মিক চাহিদা বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
কেন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধর্মকে গ্রহণ করে
ধর্মের দমনপীড়ন থেকে ধর্মকে গ্রহণ করার এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে :
১. সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা : ধর্ম জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে অস্বীকার করলে জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকি থাকে।
২. সামাজিক স্থিতি : ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমাজকল্যাণ, শিক্ষা ও নৈতিক দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং তা সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যকে সহায়তা করে।
৩. রাজনৈতিক বৈধতা : ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সহযোগিতা রাষ্ট্রের বৈধতা ও সামাজিক ঐক্য বাড়ায়।
৪. আদর্শগত সাদৃশ্য : করুণা, সমতা ও ন্যায়বিচারের মতো ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের সঙ্গে মিল খুঁজে পায়।
যদিও মার্কসবাদ প্রাথমিকভাবে ধর্মমুক্ত সমাজ কল্পনা করেছিল, বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায় যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নীতি অনেক বেশি জটিল। ভিয়েতনাম, চীন, কিউবা, লাওস এবং এমনকি উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ প্রমাণ করে যে কমিউনিস্ট সরকার ধর্মকে অস্বীকার না করে এখন বরং তাকে পরিচালনা, তার আংশিক রূপান্তর বা ধর্মের ব্যবহার করতে শিখেছে।
এটি মার্কসবাদ থেকে বিচ্যুতি নয়, বরং তার একপ্রকার অভিযোজন, যেখানে সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এক সময়ে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত কমিউনিজম ও ধর্ম আজ অনেক রাষ্ট্রে সহাবস্থান করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরকে শক্তিশালী করছে।

কম্বোডিয়ায় (কামপুচিয়া) প্রাপ্ত বিশ্বকর্মামূর্তি
ভারতে বামপন্থা ও ধর্মের মধ্যে সম্পর্ক বড়ই বিচিত্র।কেরালায় বামপন্থীরা যখন বড় বড় মন্দিরের অছিপরিষদের সদস্য, মন্দিরকমিটির মাথায় থাকেন বামপন্থী নেতামন্ত্রীরা, পশ্চিমবঙ্গে পুজো নিয়ে এখানকার নেতাদের মধ্যে এত ছ্যুৎমার্গ কেন, তা বামসমর্থকদের জানানো দরকার রাজ্যনেতৃত্বের। না হলে ভবি ভুলবে না, পার্টিকেও পস্তাতে হবে।
পূজামণ্ডপের আশপাশে লাল শালু টাঙিয়ে মার্ক্স-লেলিন-কাকাবাবুর বই বিক্রি করে দায় সারছেন নেতাকর্মীরা। তা না করে মণ্ডপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলেই ভালো হত কিনা সেটা নিয়েও সর্বস্তরে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বইয়ের স্টল দেওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কী বলে তা জানা আশুকর্তব্য। বইবিক্রি কি সুবিধাবাদী নীতি!
কেউ কেউ ভাবেন, এটা চরম সুবিধাবাদী মানসিকতা। যে ধর্মকে আফিম বলা হচ্ছে, তার পোস্তটা নিয়ে ব্যবসা করা কি ঠিক ? পুজোর মণ্ডপে ঢুকব না, সুভাষ চক্রবর্তী, গৌতম দেব, তন্ময় ভট্টাচার্যদের গালাগালি দেব, আর ধর্মের বাইপ্রোডাক্ট ‘ভিড়’-এর সুযোগ নিয়ে বাণী-ব্যবসা করব, এটা তো হয় না!
বামপন্থী নেতাদের পূজা সম্পর্কে উন্নাসিক মনোভাব ঝেড়ে ফেলতে হবে। কেরালা-লাইন ধরতে না পারলে বঙ্গে শূন্যদশা কাটানো শক্ত। ঘটা করে বিশ্বকর্মা পূজা তো করা যেতেই পারে! কাস্তে-হাতুড়ি তো তাঁর ডিপার্টমেন্টেই!