বিজেপি বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মুম্বাই বৈঠক শেষ হতে না হতেই সংসদীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশি ১৮ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর- পাঁচ দিনের সংসদের বিশেষ অধিবেশন ঘোষণা করেন। যদিও কেন বিশেষ অধিবেশন এবং কী বিষয় জরুরিভিত্তিতে আলোচনা, সে বিষয়ে সরকার একটি কথাও খরচ করেনি। ফলে নানা জল্পনা শুরু হয়, তাছাড়া এর পরের দিনই পিটিআই জানায়, সারা দেশে এক সঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন করানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে কেন্দ্র সরকার কি ২৪-এর লোকসভা ভোটের সঙ্গে সব রাজ্যের বিধানসভা ভোটও একসঙ্গে করে ফেলতে চাইছে? যদিও সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার কারণ, কমিটি গঠন কিংবা ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি কার্যকর করার খবর যে মিথ্যা সে কথাও কেন্দ্র সরকার বলছে না। ইতিমধ্যে বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন, কিন্তু কেন, সে বিষয়ে তিনিও কিছু বলেননি। ফলে দেশের রাজনীতিতে আচমকাই এক জল্পনা শুরু হয়েছে, তবে কি নরেন্দ্র মোদি নতুন কোন চমক দেখাতে চলেছেন?
স্বাভাবিক ভাবেই ‘ইন্ডিয়া’ জোটের তৃতীয় সম্মেলন আর ঠিক সেই সময়েই বিশেষ অধিবেশনে ডেকে মোদি বিরোধীদের পালের হাওয়া ঘোরাতে চাইছেন অথবা লোকসভা ভোটের সময় এগিয়ে আনতে চাইছেন, এই সব জল্পনাও পাক খেতে শুরু করে। প্রসঙ্গত, ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি বিষয়টি এ দেশে নতুন নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এই নীতিতেই লোকসভা ও বিধানসভা ভোট হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫৯ সালে কেরলে নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে হয়েছিল। এর পরের বছরই কেরলে বিধানসভার অন্তবর্তী নির্বাচন করাতে হয়। তাছাড়া রাজনৈতিক বিরোধের কারণেই ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে দেশের বহু রাজ্যে অন্তবর্তী নির্বাচন করাতে হয়। তারপর থেকেই আলাগা হয়ে যায় লোকসভার সঙ্গে বিধানসভার ভোটের রুটিন। তাছাড়া ‘এক দেশ এক ভোট’ ব্যবস্থায় কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারে যদি রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয় তখন কি মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে- এই প্রশ্ন থেকেই যায়। যদিও বিশেষঞ্জরা বলেন, এক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য, দুই ক্ষেত্রেই বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা করা হবে। আর তা যদি না হয়, তাহলে রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি শাসন হবে, কিন্তু বিধানসভা চালু থাকবে। পাঁচ বছর পর যেমন বিধানসভার ভোট হয় তাও হবে। কিন্তু কেন্দ্র? সেখানে তো রাষ্ট্রপতি শাসনের সুযোগ না থাকায় বিকল্প সরকার গঠনই একমাত্র পথ।
আসলে মোদী ও তাঁর সরকার চাইছেন ‘এক দেশ এক ভোট’ ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে ‘এক দেশ এক দল’-এর শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছে। তাদের ভাবনা অনুযায়ী লোকসভা ও বিধানসভা ভোট একই সঙ্গে হলে তারা জাতীয় ইস্যুকে সামনে রেখে বিধানসভা ভোটেও বাজিমাৎ করতে পারবে। কংগ্রেস সর্ব ভারতীয় দল হলেও এখন তারা আর আগের শক্তি বা ক্ষমতায় নেই। আঞ্চলিক দলগুলিকে সেই জায়গায় থেকে ক্ষমতাচ্যুত করাটাও খুব কঠিন কাজ নয়, অতএব দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন দখল করাও সম্ভব।
অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মোদি ও তাঁর দল ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি কার্যকর করে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে ফেলে দেশে প্রেসিডেন্ট ধাঁচের ব্যবস্থা চালু করতে চাইছেন। তাঁদের এ ধরণের ভাবনার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রথমত, এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিরোধী জোট ভেঙে দেওয়া যাবে। বিরোধীরা লোকসভা ভোটে জোটবদ্ধ হলেও বিধানসভা ভোটে কি তারা জোটবব্ধ থাকতে পারবেন? সেটাও লাখ টাকার প্রশ্ন। জোটে দলীয় স্বার্থের সংঘাত তীব্রতর হওয়ার সম্ভবনা যথেষ্ট আর তা হলেই পদ্ম শিবিরের লাভ। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মত, বিজেপি সরকারের এই নীতি ভাবনার পিছনে কাজ করছে মোদি ফ্যাক্টর। কারণ, বিজেপির তুরুপের তাস হলেন মোদী। তাঁর বক্তৃতা থেকে আচরণে দেশের বহু মানুষ মুগ্ধ, কেন্দ্রীয় নীতি নিয়ে যতই বিরোধীতা থাক না কেন শেষমেশ মোদীতে এখনও মানুষ সম্মোহীত হন, এখনও তাঁর জনপ্রিয়তায় তেমন আঘাত লাগেনি — এই সব কথা অতি সত্য হলেও দীর্ঘদিন সরকারে থাকার ফলে সেই সত্যেও শ্যাওলা জমেছে, আর সেটা বিলক্ষণ জানে বিজেপি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। তাই মোদী বিজেপির স্বস্তির আশ্রয় হলেও ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতিতে ভোট বৈতরণী পার হওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ হবে বলেই মনে করছে।
১৪টি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, সংখ্যাটি আগামী দিনে যদি বাড়ে, তবে তা গেরুয়া শিবিরের পক্ষে মাথাব্যথার কারণ তো বটেই। অন্যদিকে ইন্ডিয়া জোটের শক্তি যে বাড়ছে তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আসন-রফার অঙ্কে বিরোধী দলগুলি যদি নিজেদের মধ্যে সমঝোতার জায়গায় পৌঁছাতে পারে, সেটাও বিজেপির জন্য খুব চিন্তার। তাই ‘এক দেশ এক ভোট’ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভোটটা হবে সেই স্বস্তির আশ্রয় মোদী বনাম বাদবাকিরা। বিজেপি আগেও এই সমীকরণ চেয়েছে আজ আরও বেশি করে চাইছে। কারণ ভোট টানতে মোদীর মুখই এই নীতিতে একমাত্র কার্যকর। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এক দেশ এক ভোট নিয়ে কেন্দ্রের তৎপরতার মূল রহস্য এটাই।