২০০৯ সালে কালনা থেকে শুরু করে সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগণার দত্তপুকুরের নীলগঞ্জ — বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের ফলে যে মৃত্যু মিছিল তা শুধু আমাদের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে না, আরও বহু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। তথ্য বলছে, গত ১৫ বছরে এই বঙ্গে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের ২৭টি ঘটনায় ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে আর ৩৬ জন পঙ্গু হয়েছেন। এলাকাবাসীদের অভিযোগ অনুসারে প্রায় প্রতিটি বিস্ফোরণের ঘটনার পরই দেখা গিয়েছে, প্রথমে কিছুদিন অভিযুক্তরা গা ঢাকা দিয়েছে, পরে ফের তারা সক্রিয় হয়ে আগের মতো বেআইনি বাজি কারখানা চালু করেছে। প্রসঙ্গত, ১৯৯৫ সালে বাগনানের হাতুরিয়ায় বাজি কারখানায় যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে তাতে ১৩জন শিশুশ্রমিক মারা যায়। কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি এস বি সিন্হা সমস্ত অবৈধ বাজি কারখানা বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশ কি মানা হয়েছে? আদালতের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় রমরমিয়ে চলছিল বাজি কারখানা, যেখানে ২০১৫ সালে এক ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে সাত জন শিশুর মৃত্যু হয়। সেই শিশুদের আনা হয়েছিল মুর্শিদাবাদের সুতি থেকে।
২০১৫ নভেম্বর এবং ২০১৬ অগস্ট ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল স্পষ্ট জানায়, এ রাজ্যে বাজি কারখানার আড়ালে বোমা তৈরি হয়, এবং তা প্রশাসনের নাকের ডগায়। জাতীয় পরিবেশ আদালত রাজ্য সরকারকে সমস্ত বেআইনি বাজি কারখানা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তারপর? বজবজ, নীলগঞ্জ, চম্পাহাটি, আমডাঙ্গা, হালিশহর, কাঁথি, মহেশতলা, কেশপুর, নৈহাটি, নোদাখালি… রমরমিয়ে চলতে থাকে অবৈধ বাজি কারখানা। বারাসতের নীলগঞ্জ এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহু দিন ধরেই বেআইনি ভাবে এই বাজি কারখানা চলছিল৷ প্রশাসন জানা স্বত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি৷ এর আগে ১৬ মে পূর্ব মেদিনীপুরের এগরার খাদিকুল গ্রামের বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল ১০ জনের। খাদিকুল গ্রামে বাড়ির মধ্যে একাধিক অবৈধ বাজি কারখানা রয়েছে বলে গ্রামবাসীরা অভিযোগ জানান, তাঁরা এও বলেন, পুলিশ–প্রশাসনের এই কারখানাগুলির ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই কারণে আগেও এই গ্রামে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় পর পর বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পঞ্চায়েত ভোটের ঠিক আগে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটায় বাজির আড়ালে বোমা তৈরি হচ্ছিল কিনা সে প্রশ্নও ওঠে।
এ রাজ্যের মতো অন্য কোনো রাজ্যের বাজি কারখানায় কি এত বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে? এটা ঘটনা এ রাজ্যে গড়ে প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো বাজি কারখানায় ছোট বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, মৃত্যুও হয়, সব ঘটনার খবর মেলে না। কিন্তু এ রাজ্যে বাজি কারখানা তৈরির আইন আছে, প্রসঙ্গত, এ রাজ্যে ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের লাইসেন্স প্রাপ্ত বাজি কারখানা ছিল চব্বিশটি। দুঃখের বিষয় কয়েক মাস আগে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ জানায়, রাজ্যের কোনও বাজি কারখানাই সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত সবুজ বাজি উৎপাদন করছে না। তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে কি এ রাজ্যের বাজি কারখানাগুলি বৈধ? সাধারণভাবে বাজি কারখানাগুলি হয় গ্রামীণ এলাকায়। সেই বাজি কারখানাগুলি পরিদর্শনের জন্য একটি কমিটি থাকে। সেই কমিটিতে থাকেন বিডিও এবং থানার ওসি। কোথাও অবৈধ কারখানা গড়ে উঠলে তাঁরা দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাছাড়া কড়া হাতে আইন কার্যকর করা গেলে দুর্ঘটনা ঘটতো না, শিশু-মহিলা সহ মৃত্যু মিছিলও বন্ধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে, এবং পুলিশ-প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে, এক শ্রেণির মানুষ ব্যবসার নামে বাজি কারখানার নামে মৃত্যুফাঁদ গড়ে তুলছে।
গত দু-তিন দশক ধরেই বাংলায় শিল্পের যে অবস্থা তাকে বেহাল দশা বললেও কম বলা হয়। কর্মসংস্থানের অবস্থাটাও বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। বিগত পাঁচ বছরে ২১ হাজার শিল্প কেন্দ্র লাটে উঠেছে। ২০২১ সালে স্টেট অফ এনভায়রনমেন্ট যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তা থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৬ থেকে ‘২১ এই পাঁচ বছরে এ রাজ্যের বড়, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের মোট ২১,৫২১টি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে ২৭১টি বৃহৎ শিল্প। এই পরিস্থিতিতে অবৈধ বাজি কারখানা গড়ে ওঠা বা সেখানে সামান্য রোজগারের আশায় কাজ করাটা কি খুব অস্বাভাবিক ঘটনা? এর উত্তর দেবেন কে? বাজি কারখানায় বাজি তৈরির মশলায় কত বড় বিস্ফোরণ হতে পারে সেকথা বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। তবে পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বাজি কারখানা বন্ধের দাবি করে আসছেন আর মৃতদের সংখ্যা গুনছেন।