লাগাতার বৃষ্টি চলছে। এই আবহে উত্তরবঙ্গের ৫ জেলায় এবং তিস্তাতেও লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সিকিম ও ভুটানের একটানা বৃষ্টিতে জলস্তর আরও বেড়ে গিয়েছে জলঢাকার। এই পরিস্থিতিতে তিস্তা দিয়ে চার দফায় জল ছাড়া হয়েছিল। উত্তরবঙ্গের বহু জায়গাই এখন জলমগ্ন। তিস্তা কালিম্পং থেকে সমতলে তাণ্ডব চালাচ্ছে। জল ঢুকছে নদীর আশেপাশের এলাকায়। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল। তিস্তার রুদ্রমূর্তি দেখে আতঙ্কিত উত্তরবঙ্গবাসী, উদ্বেগে বাড়িঘর ছেড়ে অনেকেই ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। নদীর জলস্তর যেভাবে বাড়ছে, তাতে উত্তরবঙ্গে বড়সড় বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি জেলাগুলি থেকে ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে যে এমন পরিস্থিতি হতেই পারে তা কারও অজানা নয়। তাই বারে বারে উররবঙ্গবাসী সেই একই প্রশ্ন তোলেন, বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে আগে থেকেই ব্যবস্থা হয় না কেন? মানুষের সভ্যতার বিকাশে নদ-নদীর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। প্রাচীন পৃথিবীর সভ্যতাগুলিতো নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এখনো পর্যন্ত মানুষ নদ-নদীর জল ব্যবহার করে আসছে কৃষিকাজ, মাছ শিকার, শক্তি উৎপাদন, পর্যটন থেকে শুরু করে ধর্ম, সংস্কৃতি ও আরও নানা কাজে। তেমনি মানুষই নানাভাবে নদীর জল দূষিত করছে। বেশ কিছু ছোট নদীর অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে, নদীতে মাছের বৈচিত্র কমছে, মৎস্যজীবীরাও সঙ্কটে পড়েছে, তার থেকেও বড় কথা অনেক নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বেশি বৃষ্টিতে নদীর জল উপচে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
এ রাজ্যের উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় অসংখ্য ছোট-বড় নদী যেমন রয়েছে তেমনি আছে পাহাড়, ঝরনা, ঝোরা এবং অরণ্য। উত্তরবঙ্গের আটটি জেলা মিলিয়ে কমবেশি ২০০টিরও বেশি নদী রয়েছে। তার মধ্যে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা ছাড়াও উল্লেখ করতে হয় আত্রেয়ী, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, কুলিক, সংকোষ, কলজানি, রায়ডাকের কথা। উত্তরবঙ্গের এই নদীগুলি বর্ষাকাল এলেই ফুলে ফেঁপে ওঠে। অতিরিক্ত জলস্ফীতির কারণে নদী পাড়ের এলাকায় প্রায়ই ধসের দৃশ্য চোখে পড়ে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় দু-এক বছর অন্তর অন্তর বন্যার শঙ্কা প্রায় প্রচলিত হয়ে গিয়েছে। বন্যা কেবল ভয়াবহ নয়, বন্যার ফলে সাধারণ বিশেষ করে গরিব মানুষের জীবনে যে দুর্গতি নেমে আসে, তারা যে শোচনীয় পরিস্থিতিতে পড়েন তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।

কিন্তু বন্যার এই ভয়াবহতা থেকে কী আমরা কোনোভাবেই পরিত্রাণ পেতে পারিনা? আর যাই হোক, বন্যা মোকাবেলায় সরকারি তরফে আগাম প্রস্তুতির পাশাপাশি সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তো হয়েই থাকে, অন্তত সেরকমটাই তো আমরা জানি। নদীর পাড়ের ভাঙ্গন রুখতে বিশেষ প্রজাতির ঘাস লাগানো থেকে বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি কর্মসূচি ছাড়াও নদী খাত ড্রেজিং এবং নদী খাত পুনঃক্ষণন বা re excavation-এর কাজও তো প্রশাসনিক তরফে হয়ে থাকে। তবে কী বন্যা প্রতিরোধকারী বিভিন্ন নদীবাঁধগুলির অবস্থা ও স্লুইস গেটগুলি বর্ষা আসার আগে নিয়মিত নিরীক্ষণ করা হয়না? নদীর পাড় বাঁধ বা embankment ঠিক অবস্থায় রয়েছে কিনা সেই নজরদারি ঠিকঠাক হয়না? অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ার পরবর্তীতে যে অতিরিক্ত জমা জল, তাকে দ্রুত সরিয়ে দেবার জন্য যে নিকাশি ব্যবস্থা বা drainage system সেগুলি কতখানি কার্যকরী অবস্থায় রয়েছে, সেসব কি ঠিকঠিক ভাবে দেখে নেওয়া হয়না? Flood shelter বা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলি কি অবস্থায় রয়েছে, সেগুলি কী বর্ষা আসার আগে পরিদর্শন করা হয়? এই প্রশ্নগুলি উত্তরবঙ্গবাসীর? যা তারা গত কয়েকটি বন্যার চূড়ান্ত অব্যবস্থার পর স্থানীয় প্রশাসনকে করেছিলেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গের যেসব নদীগুলিতে বাঁধ এবং স্লুইস গেট রয়েছে সেগুলি থেকে বর্ষাকালে জল ছাড়া হয়। প্রশ্ন জল ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি বর্ষায় কি হতে পারে বা এলাকায় কি প্রভাব পড়তে পারে তার খবরাখবর কি নেওয়া হয়? উত্তরবঙ্গে বন্যা প্রবণতা বৃদ্ধি পাবার অন্যতম একটি কারণ হলো পরিবহন ব্যবস্থা। উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ নদী উত্তর থেকে দক্ষিন দিকে প্রবাহিত হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সড়ক পথ, রেলপথগুলি গিয়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। এই সড়ক পথ, রেলপথ নির্মাণের সময় থেকেই সংলগ্ন এলাকার নদীরগুলির প্রবাহ অনেকটাই সংকীর্ণ হয়েছে। প্রসঙ্গত, জলপাইগুড়ি থেকে ময়নাগুড়ি যাওয়ার পথে তিস্তা ব্রিজের ২কিমি আগে ও ২কিমি পরে নদীটি যথেষ্টই স্ফীত ও চওড়া, কিন্তু তিস্তা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নদীটি যথেষ্ট সংকীর্ণ। যার ফলে সেই অঞ্চলের তিস্তা নদীর পাড়ের ভাঙ্গন সেখানকার একটি বড় ধরনের সমস্যা।
এরপর রয়েছে তিস্তা ব্যারেজ, যার সঙ্গে যুক্ত আছে ফিডার ক্যানেল ও কৃষি ক্যানেল; সেখানে অনিয়মিত এবং ভারসাম্যহীন জলপ্রবাহ তিস্তায় বন্যার একটি অন্যতম কারণ। তাছাড়া উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ জায়গার নিকাশী ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়, ফলে বন্যা বিষয়টি কেব্লমাত্র নদীর আঙ্গিক থেকে ভাবলেই হয়না। পাশাপাশি আরও একটি অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হল আলিপুরদুয়ার জেলার নদীগুলি, বিশেষ করে জয়ন্তী নদীতে ভূটানের ব্যাপক হারে ডলোমাইট উত্তোলনের ফলে তার ধূলিকণা বা sediment ভূটান থেকে নেমে আসা স্রোত এসে মিশছে নদীগুলিতে। এতে নদীগুলির নাব্যতা ভীষণভাবেই কমেছে, যার ফলে আলিপুরদুয়ারের নদীগুলিতে প্রায়ই flash flood দেখা যায়। সেই সঙ্গে আছে নদীখাত থেকে অপরিকল্পিত ভাবে বালি-পাথর তুলে নেওয়া, এটা প্রকাশ্য চলছে, কোথাও কোথাও মেশিন বসিয়ে এবং প্রকাশ্যে। এর ফলে বেশ কিছু অঞ্চলে নদী পথ বদলে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। বূঝতে অসুবিধা নেই যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বন্যা এবং তারসঙ্গে বন্যা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়টি নিয়ে গভীর কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই, তা নিয়ে কোনো চিন্তা ভাবনাও করা হয়না। তার ফলে বন্যা উত্তরবঙ্গের ক্যালেন্ডারে স্থায়ীভাবে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, বাসিন্দারা কিছুতেই বন্যার আতঙ্ক থেকে দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না।