কী অদ্ভুত ব্যাপার! সেদিন আচমকাই ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে এক মধ্যবয়সী মহিলা বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, আমার ঘুম হচ্ছে, কিন্তু ঘুম পাচ্ছে না। কী করি বলুন তো?’ অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পরে ডাক্তার বুঝলেন সমস্যাটা আসলে মনের। মহিলাকে তিনি পাঠালেন মনের পরামর্শদাতার কাছে। আবার আর একজনকে দেখা গেল যে তিনি দিব্যি ভালোই ঘুমোন, তবুও আক্ষেপ যে তাঁর নাকি মোটেই ঘুম হচ্ছে না। এই সমস্যাটাও কিন্তু মনের। আসলে পর্যাপ্ত ঘুম হলেও হয়তো ডিপ্রেশিভ ডিসঅর্ডারের ফলে ঘুমের তৃপ্তিটা পাচ্ছেন না তিনি। তবে ঘুমের প্রয়োজনীয়তাটা তো আর অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই কোনওভাবেই। কারণ, মনোচিকিৎসক এবং মনোবিদদের অনেকেই এখন মনে করছেন যে অনিদ্রা, স্বল্পনিদ্রা বা অতিনিদ্রা আসলে আদৌ তেমন কোনও রোগই নয়, কিন্তু তা অবশ্যই হতে পারে অনেক কঠিন মানসিক বা দৈহিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। আর ঘুমের বিশৃঙ্খলাটা যতটা না বিপজ্জনক তার থেকে অনেক বেশি বিপজ্জনক হচ্ছে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
ঘুম কী?
প্রথমেই জেনে নিতে হবে ঘুম ব্যাপারটা আসলে কী। ফিজিওলজি বা শরীরবিদ্যা বলছে, ঘুম হলো এমন একটা নিয়মিত দৈহিক ক্রিয়া, যার ফলে মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সের মোটর এবং সেন্সরি কাজকর্মে inhibition তথা অভ্যাসগত বিরতি ঘটে। সদ্যোজাতদের ক্ষেত্রে এই বিরতিটা ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। কৈশোরে দিনে ঘুমের প্রয়োজন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা অবশ্য সাধারণত ঘুমোন অনেক কম। হতে পারে মাত্র ৪থেকে ৬ ঘণ্টা। তবে একজন সুস্থ সবল মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা সাধারণত দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা। ঘুমের সময় সাধারণত কমে যায় হৃদস্পন্দনের গতি। প্রভাব পড়ে পালস রেটে। কমে যায় রক্তচাপ। শ্বাসগ্রহণ ধীর কিন্তু গভীর। স্নায়ুর গভীর রিফ্লেক্স থাকে না। তবে বাহ্যিক রিফ্লেক্স থেকে যায়। কমে যায় বেসাল মেটাবলিক রেট। ঘুমের কারণ নিয়েও নানা মত। নানা থিয়োরি। মস্তিষ্কের শ্রান্তি এবং অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যাওয়া থেকে শুরু করে কন্ডিশনড রিফ্লেক্সের ফলে সেরিব্রাল কর্টেক্সে ইনহিবিশন, সেরিব্রাল কর্টেক্সে অ্যাসিটাইল কোলিন জমা হওয়া, টিস্যুতে ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়া, পিটুইটারির কেরামতি কিংবা স্পাইনাল কর্ডের ইম্পালসের সক্রিয়তা এবং নিষ্ক্রিয়তা — এই রকম নানা কারণ ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে ঘুমের নেপথ্যে। তবে ঘুমের সময় শারীরিক পরিবর্তন সঠিকভাবে জানা যেতে পারে পলিসোমনোগ্রাফ, ইলেক্ট্রো এনকেফালোগ্রাম (ইইজি)এবং ইলেক্ট্রো মায়োগ্রাম(ইএমজি), ইলেক্ট্রো ওকুলোগ্রাম বা ইওজির সাহায্যে।
মধ্যমণি মেলাটোনিন
ঘুমিয়ে পড়া এবং জেগে থাকাটা আসলে কিন্তু মেলাটোনিন নামে একধরনের হর্মোনের নিয়ন্ত্রণে। এর উৎপত্তি মস্তিষ্কের পিনিয়াল বডি বা গ্ল্যান্ডে। এর মূল কাজ বায়োলজিকাল ক্লক তথা সারকার্ডিয়ান রিদিমস নিয়ন্ত্রণ। রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝরাত থেকে ভোরের দিকে রক্তে এর মাত্রাটা সব থেকে বেশি হয়। তাই বাড়ে ঘুমের গভীরতা। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে মানবদেহে মেলাটোনিন উৎপাদন কমে যায়, তাই কমে যায় ঘুমও। মজার ব্যাপার, রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তে এই রসায়নের সক্রিয়তা বাড়লেও, দিনের আলোয় তা ক্রমশ কমতে থাকে। তাই জেগে ওঠে মানুষ। অথচ এর উৎপাদনটা কিন্তু অনেকটাই নির্ভর করে সূর্যের আলোর ওপরেই।
ঘুমের দেশের কথা
ঘুম ব্যাপারটা কিন্তু খুব সহজ সরল নয়। বেশ কয়েকটা পর্যায় আছে এর মধ্যে। প্রথমটা হলো নন র্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ বা নন আর ই এম স্লিপ বা এন রেম এবং দ্বিতীয় ধাপটা হলো র্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ বা আর ই এম স্লিপ বা রেম। প্রথমটায় আবার ৪টে দশা। প্রথমটার ক্ষেত্রে আই বল তথা চোখের মণি কার্যত স্থির, কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে চোখের মণি নড়াচড়া করে বেশ। সাধারণত ঘুম আসতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এর পরেই শুরু হয় এন রেম। চলে ৯০ থেকে ১১০ মিনিট পর্যন্ত। প্রথম দু-টো দশায় প্রাথমিকভাবে একটু হাল্কা ঘুম আসে। বাইরের শব্দ কানে আসে মৃদুভাবে। একটু ডাকলেই ভেঙে যেতে পারে ঘুম। কিন্তু পরের দু-টো দশায় ক্রমশ বেড়ে যায় ঘুমের গভীরতা। ডাকাডাকি করলেও চট করে ভাঙতে চায় না ঘুম। এই সময়তেই ভীড় জমাতে পারে স্বপ্ন। ঘুমের এই পর্যায় চলতে পারে ৪০মিনিট পর্যন্ত। ঘুমের মধ্যে এন রেম এবং রেম পর্যায়ক্রমে আসে যায় বেশ কয়েকবার।
দৈহিক এবং মানসিক রোগের লক্ষণ
কিন্তু ঘুম নিয়ে মানুষের এতো সমস্যা কেন?চিকিৎসাশাস্ত্র বলছে, এর কারণ মূলত দু’টো — দৈহিক এবং মানসিক। হরমোন সংক্রান্ত অসুখ, কিডনির সমস্যা, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত অসুবিধে, হজমের গোলমাল, দৈহিক ব্যথাবেদনার মতো কারণেও যেমন ঘুমে বিঘ্ন ঘটতে পারে তেমনি মানসিক কারণ, যেমন উদ্বেগ, অবসাদ, হতাশা, বিষন্নতাও ডেকে আনতে পারে ঘুমে গুরুতর সমস্যা। আবার অতিরিক্ত আলকোহল, ড্রাগ বা অন্যান্য নেশাসক্তি এমনকী কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ডেকে আনতে পারে গুরুতর জটিলতা। তবে সবসময়ই কিন্তু শুধুমাত্র নিদ্রাহীনতা বা বিঘ্নিত ঘুমকেই সমস্যা বলে চিহ্নিত করলে চলবে না, চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে অতিরিক্ত ঘুমও। কারণ কোনও কঠিন মানসিক ব্যধির লক্ষণ হতে পারে লাগাতার অনিদ্রা বা অতিনিদ্রা। বার্তা দিতে পারে অন্য কোনও দৈহিক অসুস্থতারও।
নানা রূপে বিশৃঙ্খলা
আসুন একটু গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখা যাক ঘুমের বিশৃঙ্খলা ব্যাপারটা। অনেক সময়ই দেখা যায় যে কোনও রকম মানসিক বা দৈহিক অসুস্থতা নেই অথচ ঘুম আসতে দেরি হচ্ছে কিংবা বারাবার ভেঙে যাচ্ছে ঘুম। একবার সামান্য ঘুমের পরে চলে যাচ্ছে ঘুম, আর আসছে না। এই ধরণের সমস্যা চলতে পারে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। সাইকিয়াট্রির ভাষায় একে বলে প্রাইমারি ইনসমনিয়া। অন্যদিকে কোনওরকম দৈহিক ব্যাখ্যা ছাড়াই যখন মানুষ একমাস বা তার বেশি সময় ধরে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের কবলে পড়ে যায় তখন তাকে বলে প্রাইমারি হাইপারসমনিয়া। আরও আছে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা, ঝিমুনি। একে বলে নার্কোলেপ্সি। ঘুমের মধ্যে হাতপায়ের মাংসপেশীর দুর্বলতা বা অসাড়তা ডেকে আনতে পারে ক্যাটাপ্লেক্সি অথবা স্লিপ প্যারালিসিস। ঘুম ভাঙার পরেও মিনিটখানেক চলতে পারে এই অবস্থা। অন্যদিকে নাক বা শ্বাসনালী আংশিক বন্ধ থাকার কারণে হতে পারে ভয়ঙ্কর নাসিকা-গর্জন তথা ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’। শিশুদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় ‘নাইট টেরর’ — আচমকা ঘুম থেকে উঠে চিৎকার, কান্না শুরু করে দেয়। একটু পরেই আবার ঘুমিয়ে পড়ে এবং সকালে উঠে কিছুই মনে করতে পারে না। আর ভয়ের স্বপ্ন দেখে আতঙ্কে জেগে ওঠা বা ‘নাইট মেয়ার’ও দেখা দেয় অনেকের মধ্যেই। আবার অন্যদেশে গিয়ে টাইম জোন বা কাজের সময় পরিবর্তিত হলে দেখা দিতে পারে ‘সারকারডিয়ান রিদিম স্লিপ ডিসর্ডার’। দীর্ঘ সময় উড়ানে কাটলে হতে পারে ‘জেট ল্যাগ’। অন্যদিকে ঘুমের মধ্যেই হাঁটাচলা করে পরে ঘুম থেকে উঠে সেসব কিছুই মনে করতে পারেন না ‘সোমনাবুলিজম’এ আক্রান্তরা। ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করাটাও কিন্তু একটা মৃদু রোগ।
তবে মনে রাখতে হবে, কম ঘুম, ঘুমে ব্যাঘাত কিংবা অনিদ্রা মানসিক রোগ ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, প্যানিক ডিসঅর্ডার, এমনকী সিজোফ্রেনিয়ারও লক্ষণ হতে পারে। অন্যদিকে অতিনিদ্রা লক্ষণ হতে পারে অ্যানিমিয়া, হাইপোথাইরয়েডিজম, পেপটিক আলসার, পার্কিনশন, ডিপ্রেশিভ ডিসঅর্ডার এবং ডিমেনসিয়ার। মস্তিষ্কে আঘাত লাগলেও মাত্রাতিরিক্ত ঘুম আসে। অ্যালকোহলাসক্তি বা অতিরিক্ত পরিশ্রমও একই রকম প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
এখন উপায়?
ঘুম না হলে তো নিস্তার নেই। দৈহিক অসুস্থতা তো বটেই, লোপ পেতে পারে বাস্তব বুদ্ধিও। দেখা দিতে পারে নাকি হ্যালুসিনেশন এবং ডিলিউশনও। ঝিমুনি, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষমতা হ্রাস, মনে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়া- সব যেন তছনছ করে দেয় জীবনকে। তা হলে মুক্তির পথ? ঘুমের ওষুধ, অ্যালকোহল?ঘুমের ওষুধের ব্যাপারে অবশ্য শেষ কথা বলতে পারেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই। কিন্তু দেখতে হবে আপনি ওষুধে আসক্ত হয়ে পড়ছেন না তো? আর অ্যালকোহল? প্রথম প্রথম মনে হবে প্রাণের বন্ধু। পানেই ঘুম। কিন্তু তারপরে জটিল থেকে জটিলতর হবে সমস্যাটা।
তাই ওষুধের বাইরেও সহজ পথ দেখিয়েছেন মনোচিকিৎসক এবং মনোবিদরা—
এ সব কথা শুনে নতুন বছরটা আবার শুধু ঘুমিয়েই কাটাবেন না যেন। পর্যাপ্ত ঘুম উপভোগ করে জেগে থাকার সময়টা যাতে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেন তার জন্যই এত কিছু বলা।