রাহুলবাবাজীবনকে কেমন যেন মনে হয়। জটিল-কুটিল নন, খুব একটা ফন্দিবাজও মনে হয় না। তাহলে? গোদা বাংলায় বললে তাঁকে একটু ছিটেল, একটু আঁতেল বলা যায়। সাধুবাংলায় বলা যায় ‘কেন্দ্রভ্রষ্ট’ মানুষ। কি যে করেন তিনি, কেন যে সে সব করেন তা হয়তো তিনি নিজেই জানেন না। এই তিনি মোদীবাবুকে জড়িয়ে ধরলেন, এই চোখ মেরে দিলেন, এই আবার গম্ভীরকণ্ঠে বললেন চৌকিদার চোর হ্যায়। নির্বাচনে পরাজয়ের দায় মাথায় নিয়ে দলে পদহীন হয়ে রইলেন কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য হাইকম্যাণ্ডে তাঁর গুরুত্ব একটুও কমল না। গান্ধী পরিবার যে! মাঝে মাঝে বিদেশে পাড়ি দেন তিনি। সেখানকার মানুষের কাছে এখানকার দুর্দশা বর্ণনা করে আসেন। বয়েসের চেয়ে নিজকে যাতে ভারি দেখায়, তাই দাড়ি রাখতে শুরু করেছেন। কিন্তু দাড়ি রাখলেই যে কাঁড়ি কাঁড়ি জনসমর্থন জুটবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? দেখলেন না, মোদীবাবুও বেশিদিন রাখতে পারলেন না দাড়ি।
রাহুলবাবা আবার ভারত জোড় আন্দোলন শুরু করেছিলেন। রাজ্যে রাজ্যে লোক জমেছিল বিস্তর। দেখে মনে হচ্ছিল মোদী-শাহের বিরুদ্ধে জুড়েই গেল বুঝি ভারত। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল আমাদের বুদ্ধবাবুর কথা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথা বলছি। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউণ্ডে মিটিং। বিশাল জমায়েত হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে দিন বদলের পালা এল বুঝি। বুদ্ধবাবু অসুস্থ। গাড়িতে এলেন। মঞ্চের বাইরে গাড়িতে বসে আছেন তিনি। রক্তিম অভিবাদন জানিয়ে এক উদ্দীপ্ত সহকর্মী বললেন, দেখছেন মানুষের ঢল নেমেছে। বুদ্ধবাবু শুধু বললেন, এত যে মানুষ, তাঁরা আমাদের ভোট দেবেন তো!
একই কথা রাহুলবাবা সম্বন্ধে। ভারত জোড় দেখতে ঢল নেমেছিল মানুষের। ভোটের সময় তারা কিন্তু খল খল করে ভোট দেয় নি রাহুলবাবার দলকে। আর ভারত জুড়তে গিয়ে বিরোধী ঐক্যের ফাটল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল বলে বিজেপি রইল স্বস্তিতে। রাহুলবাবাকে যদি ভারত জুড়তেই হয় তাহলে সর্বপ্রথম জাতীয় দলের গর্বটা ত্যাগ করতে হবে, বুঝতে হবে এককভাবে লড়ার শিরদাঁড়া আর তাঁর দলের নেই। নির্ভর করতেই হবে আঞ্চলিক দলগুলির উপর।
আর ঠিক এই জায়গায় বিজেপি আছে নিশ্চিন্ত হয়ে। এক এক আঞ্চলিক দলের এক এক নীতি। কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম নিয়ে চলার চেষ্টা আগে হয়েছে। ফল ভালো নয়। মিলি-জুলি সরকার আগেও হয়েছে। অচিরে সে সরকার পড়েছে গোঁত্তা খেয়ে। প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অহং আছে, সেটিকে বিসর্জন দিতে পারবে না তারা। যেমন কংগ্রেস পারবে না দাদাগিরি ছাড়তে।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথা বললে বোঝা যায় ব্যাপারটা। দেখবেন তিতিবিরক্ত মানুষ। দ্রৌপদীর শাড়ির মতো গ্যাসের দাম বেড়ে চলেছে। ক্রমাগত গ্যাস দিয়ে যাচ্ছে সরকার। বেসরকারিকরণ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক। কালো টাকা উদ্ধারের গল্পটা ফাঁপা। এর সঙ্গে তার লিঙ্ক আর তার সঙ্গে এর লিঙ্ক করতে করতে প্রাণান্তকর অবস্থা। তবু মানুষ মনে মনে একদলীয় সরকার পছন্দ করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটা জবরদস্ত মানুষকে পছন্দ করে। মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক অঙ্কেই বিজেপির জয়। বলুন তিনি মিথ্যে কথা, কিন্তু ছাতি বাজিয়ে তো বলতে পারেন। মনমোহনের মতো মিনমিনে নন, নরসীমার মতো ঘুমন্ত নন। হ্যাঁ, ইন্দিরার মতো। নরেন্দ্র মোদী স্বীকার করুন বা না করুন, তিনি কিন্তু প্রথম থেকে ইন্দিরা গান্ধীর মতো জাঁহাবাজ হতে চেয়েছেন। হয়েওছেন। আর একটা মারাত্মক প্লাসপয়েন্ট পেয়েছেন তিনি। এখনও পর্যন্ত পরিবারতন্ত্রের কালিমা খোঁচাতে পারে নি তাঁদের।
বিজেপির বিরুদ্ধে ভারত জোড়ার কাজটা জরুরি। কিন্তু আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলই ফুরায়ে যায় মা। কারণ বিড়ালের গলায় ঘন্টি বাঁধারকাজটা ঠিক ঠিক ভাবে করবে কে?
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক