বোম্বেতে বসবাস করতে গিয়ে বটবেলবাবু মানে জেপি বটবেল তার একমাত্র নাতনি ক্যামেলিয়াকে নিয়ে নাস্তানাবুদ। জেপি বটবেলের পুরো নাম জিতেন্দ্রপ্রসাদ বটবেল। ক্যামেলিয়ার বাপ সিংগাপুরে এক বছরের ট্রেনিং-এ, তাই জিতেন্দ্রপ্রসাদ বটবেল গ্রামের বাড়িতে ছোট ছেলের কাছে গিন্নিকে রেখে বোম্বে এসেছেন তা ছয় মাস হতে চললো। সঙ্গে করে গিন্নিকে আনার ইচ্ছে জেপি বটবেলেবাবু’র ষোল আনাই ছিল। সিংগাপুর যাওয়ার আগে নিতুন পই পই করে ফোনে বলেছিল, ‘তুমি ও মা আমি না ফেরা পর্যন্ত জুহু বিচের আমার বাড়িতে এসে থাকবে। একটা বছর তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে।’
পশ্চিমবঙ্গের ভীমপুরের বাড়িতে গিন্নি বিরজাসুন্দরীকে রেখে এসে বটবেলবাবু ভালই করেছেন এখানে আসার পর থেকেই তিনি ভাবছেন। বিরজাসুন্দরীর দৌড় রানাঘাটের বড় মেয়ে সুজাতার বাড়ি পর্যন্ত। সুজাতা দেওর, ভাসুর, স্বামী আর ছেলেমেয়ে নিয়ে একান্নবর্তী পরিবারে মিলেমিশে ভালই আছে। গিন্নি বিরজাসুন্দরী বোম্বেতে বড় ছেলের বাড়ি এলে বলিউড নগরীর অনেক কিছু অবলোকন করে ভিমরি খেয়ে পড়তো।
বটবেলবাবু মনে মনে বললেন, ‘আমার নাতনি ও নাতনির বান্ধবীদের পোশাক-আশাক দেখে আমারই ভিমরি খাওয়ার জোগাড়। ‘ক্যামেলিয়া এবারই কলেজে ভর্তি হয়েছে নাম করা কলেজ। যেমন ইচ্ছে তেমন পোশাকে কলেজে যাওয়া যায়। ক্যামেলিয়া জীবনে শাড়ি পরেনি, বৌমা বাইরে শাড়ি না পরলেও বাড়িতে শাড়ি পরে। বৌমার বাপের বাড়ি বাঙ্গাল দেশে।
যাক বৌমার কথা। আমার আদরের নাতনি ক্যামেলিয়ার আবদারের শেষ নেই। স্কুলে থাকাকালে ইউনিফরম পরে স্কুলে যেত, এখন স্বাধীন কলেজে পোশাকের ব্যাপারে। পরনে জিন্সের প্যান্ট গায়ে আটোসাটো সর্ট পরে কলেজে যায়। একদিন বটবেলবাবু নাতনিকে বললেন, ‘কী জামা গায়ে দিয়েছিস্! বুকে একটা কাপড় দিতে পারিস না। বুক উঁচু করে দেখছি কলেজে যাচ্ছিস। এই পোশাকে কলেজে গেলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা কিছু বলে না তোদের?’ আমার কথা শুনে নাতনি অবাক হয়ে বললো, ‘ব্যাক ডেটেড দাদু বলে কী! তুমি তো হিন্দি সিনেমা দেখনা তাই তুমি এই পোশাক দেখে ভিমরি খাচ্ছো। জুহু বিচেও গেলেনা আজ পর্যন্ত আজকালকার মেয়েদের পোশাকের মর্ম তুমি কী বুঝবে!’
কয়েকদিন পরে বটবেলবাবু নাতনি ক্যামেলিয়ার সঙ্গে তার বান্ধবী গ্লোরীকে আসতে দেখে অবাক হলেন না, কারণ সে প্রায়ই তাদের বাড়িতে আসে। মেয়েটি তার নাতনির চেয়েও আর্ল্টা মর্ডান। কথাটা তার নাতনি ক্যামেলিয়াই একদিন তার দাদু বটবেলবাবুকে বলেছিল। ‘ও বিশাল বড় লোকের মেয়ে। গাড়ি আছে তিনখানা। তিনখানার মধ্যে একখানা গ্লোরি’র। গাড়ি আমাদের গলিতে ঢোকে না, তাই গাড়ি মেইন রোডে ড্রাইভারের কাছে রেখে ও হেঁটে আমাদের এখানে এসেছে।’ নাতনির কথা শুনে বটবেলবাবু’র বিশ্বাস হলো না ক্যামেলিয়া সত্যি কথা বলছে, তার বান্ধবী যদি এত বড় লোকই হবে তবে তার পরনের জিন্সের প্যান্টের হাঁটুর উপর থেকে নিচে স্থানে স্থানে ছেঁড়া কেন? ‘দাদু’র কথা শুনে ক্যামেলিয়া বললো,’ গ্লোরিকে বলবো আমাদেরকে বলিউডের স্টুডিওতে নিয়ে যেতে। ওতো আবার হিরোইনদের ফ্যান। ‘বটবেলবাবু আর ঠিক থাকত পারলেন না, রেগে বলে উঠলেন,’ ও যদি এতই বড় লোক হবে তবে ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট পরে কেন?’ দাদু’র কথা শুনে ক্যামেলিয়া হেসে কুটি কুটি হয়ে বললো,’ দাদু তোমাকে তো সাধে ব্যাক ডেটেড বলি না! ওটাই তো এখনকার ফ্যাসান। এখন তো হিরোইনরা পর্যন্ত এই ফ্যাসানের জিন্সের প্যান্ট পরছে। আমি জানালা কাটা জিন্সের প্যান্ট পরিনা বলে আমার বান্ধবীরা আমাকে সেকেলে, আর ব্যকডেটেড মেয়ে বলে খ্যাপায়!’
ক্যামেলিয়া দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া অবলোকন করে এবার বলে, ‘তোমাকে আজ আমার সঙ্গে নিউমার্কেটে যেতে হবে আমার জন্যে দুটো ওই ফ্যাসানের একটা জিন্সের—’ তার কথা শেষ করতে না দিয়ে বটবেলবাবু বলে উঠলেন, ‘ওহ! এখন আমি সব বুঝেছি, ফর্সা হাঁটু, দুধে আলতায় মেশানো থোড়া এমনকি, নিতম্ব, হাঁটু ভাঁজ দেখানো জন্য জিন্সের প্যান্টের জানালা রাখা।’
‘ভালই বুঝেছো দাদা ভাই!’ ‘তুই রেডি হয়ে থাকিস বিকেলে তোকে জানালা কাটা জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে জানালা কাটা জামাও কিনে দেবো। জানলা কাটা জামা পরলে তোকে বলিউডের —’ ‘থামবে দাদু, তা না হলে তুমি নারী বিদ্বেষী হিসাবে ধরাখাবে, কিন্তু!
মনোজিৎকুমার দাস, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, মাগুরা, বাংলাদেশ।