জগদীশ গুপ্তের (১৮৮৬-১৯৫৭) ‘হাড়’ গল্পে ডাইনির প্রসঙ্গ আছে। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস ইঙ্গিতে সুস্পষ্ট এখানে। রক্ষার স্বামী সনাতনের করুণ পরিণতি দেখানো হয়েছে এ গল্পে। কিন্তু এ গল্পে রক্ষার মাসি রসিকে ডাইনি আখ্যা দেওয়া হয়েছে লোকপ্রচলিত অন্ধসংস্কারের কারণে। রক্ষা রসি মাসিকে তার ছেলে মথুরের লালন-পালনের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল। সেই মাসিকেই সনাতন বলেছে ‘মাগি ডাইনি’। ‘ডাইনি শব্দটিও গাল, উপরন্তু নারীর মাতৃহৃদয়কে অপমান।’ (জগদীশ গুপ্তর গল্প ১৯৭৭ : ১৪০) লোকবিশ্বাস মতে রসি মন্ত্রতন্ত্র জানে। সে একটি শিকড়ের ছোঁয়া দিয়ে যে কোনো মানুষকে যে কোনো জন্তুতে পরিণত করতে পারে, ইচ্ছা করলেই সাড়ে তিন হাত লম্বা রসি হাত বাড়িয়ে তাল গাছের মাথা ছুঁতে পারে, কবর খুঁড়ে মড়ার মাংস সে চিবিয়ে খায়; অসংখ্য মড়ার মাথা তার ঘরের মেঝেতে পোঁতা আছে ইত্যাদি। দাশুর পুত্রবধূ মানীর গর্ভ নষ্ট হয় ভূত-আতঙ্কে। মূর্ছার ঘটনার পূর্বদিন রসি তাকে গর্ভ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল বলেই অপবাদ রটে — ‘রসিই খেয়েছে ওর ঐ পেটের ছেলেটাকে।’ (১৯৭৭ : ১৪২) রসিকে কেউ মা বলে ডাকেনি; কেউ ডাকবেও না। তবু একটি কচি প্রাণ নিঃশেষ করেছে সে। গর্ভের সন্তান যে বের করে খায় সেই রাক্ষসী চেয়েছে সনাতনের সন্তানকে। সনাতন-রসি ‘আঁটকুড়ি, ডাইনি’ (১৯৭৭ : ১৪২) কিংবা পূর্বে উল্লিখিত ‘মাগি ডাইনি’ — এসব বলে নারীত্ব ও মাতৃহৃদয়কে অপমান করেছে। কেবল সনাতনের কথা নয় সারা গ্রামে রটনা হয় রসি ডাইনি, মন্ত্রতন্ত্র জানে। এই ডাইনির ভয় আর সনাতনের রসিকে অপমান করার ঘটনায় গ্রামের লোক তটস্থ থাকে। অন্ধসংস্কারে তারা ভাবে রসির এই অপমানে হয়ত সারা গ্রামে নেমে আসবে চরম অশুভ শক্তির ছায়া। এই অপবিশ্বাস থেকেই মানীর ওপর মিথ্যা-কল্পনায় ভূতের ভর এবং গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হওয়ার যাবতীয় দায় গ্রামের লোকজন চাপায় রসির ওপর। রসি কিন্তু নারী হিসেবে এবং রক্ষার শেষ অনুরোধ পালন করতে মাতৃত্বের দায়েই একান্ত উৎসুক। এই ঘটনায় সনাতন গ্রামের অন্যদের মতো রসিকে অভিযুক্ত করেছে। গর্ভের সন্তান নষ্ট করে সে আবার তার ছেলেকে চায়। এভাবে ছোট ছোট ঘটনা-চিত্রে গল্পে রসির ডাইনিত্ব তুলে ধরা হয়েছে। রসি অপমানবোধ ও আত্মসম্মানবোধ থেকে রক্ষা করেছে নিজেকে। গ্রামের রটনায় রসিকে ডাইনি বলা হলেও সে কুসংস্কারের শিকার। ডাইনির মতো প্রথাসিদ্ধ কোনো মানসিকতা তার ছিল না। মথুরকে পোষ্য নিতে চেয়েছে কেবল রক্ষার মৃত্যুকালীন অনুরোধ রাখার জন্য। সে ন্যায়বোধে মানবিক। মানুষের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ আছে, অন্তঃসত্ত্বা নারী মানীর প্রতি তার মাতৃভাবই প্রকাশিত হয়েছে এ গল্পে। মানবিক ও সুস্থ নারীর আকাঙ্ক্ষা এরকম — ‘রসির একান্ত ইচ্ছা, মরা মানুষের কথাটা রাখে। অপমান হইয়াও সে নিজের হইতে চাহে নাই। এবার সে মনের ইচ্ছাটা মানুষের মুখে গুঁজিয়া দিলো। …ইহজম্মে রসিকে কেহ মা বলিয়া ডাকে নাই, কেহ ডাকিবে এ আশাও নাই… তবু একটি কচি প্রাণ, প্রথমে নির্লিপ্ত তারপর ধীরে ধীরে বেড়িয়া ধরিবে এ যে বড়ো লোভের জিনিশ…’ (১৯৭৭ : ১৪২)
জেলখাটা, বেপরোয়া, দাম্ভিক সনাতনের শ্বাসনালীর মুখে আটকে থাকা মাছের শিরদাঁড়ার হাড়ে মৃত্যু ‘কথিত ডাইনি’ রসির ভেতর কোনো আনন্দ-উল্লাস সৃষ্টি করেনি। তারাশঙ্করের ডাইনির মতোই এ নারী মাতৃরূপিণী; মানবিক ও সন্তানপিপাসায় বুভুক্ষু। ‘হাড়ে তেমন জোর নাই, মুখের দন্ত নাই; কিন্তু মনের জোর বেজায়।’ — সে না করিতে পারে এমন কাজ নাই।’ (১৯৭৭: ১৪৩) মাছ ধরতে যাবার আগে সনাতনের ‘তুই মরবি কবে’ বলায় অভিশাপ দেয় সে। এই দৃশ্যটিও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ গল্পে ভীত পলায়নপর বাউরি যুবককে লক্ষ করে বৃদ্ধার ক্রুদ্ধ মূর্তির অভিব্যক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘রসির মূর্তি ক্রুদ্ধ মার্জারীর মতো ভয়ঙ্কর। …রাগে তার গা ফুলিয়া রোঁয়া খাড়া হইয়া উঠিয়াছে…দৃষ্টি স্থির…চক্ষু জলপূর্ণ… চোখের উপরকার লোল চর্মটা পর্যন্ত যেন কাঁপিতেছে।’ (১৯৭৭ : ১৪৪) রসির অভিসম্পাত প্রকৃতপক্ষে তার বেদনারই প্রকাশ — অযাচিত দোষারোপে বিভ্রান্ত নারীর রক্তক্ষরণ। তবে এ গল্পে দরিদ্র অশিক্ষিত সনাতন গ্রামের প্রচলিত (ডাইনি) অন্ধবিশ্বাসকে ভেঙেছে; চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। গ্রামের কেউ রসিকে চটাতে সাহস করে না, মাতব্বর পর্যন্তও। সে তাদের বিপরীতে রসিকে পরাজিত করতে চায়। কিন্তু সমাজসত্য ভিন্ন। তাকে দিয়ে ডাইনি অপবিশ্বাস তাড়িয়ে গল্পকার বিপ্লব সংঘটিত করেননি। বরং তার করুণ পরিণতি ও মৃত্যুর ছবি এঁকেছেন। শেষে রসিকে তার সামনে এনে এবং নীরবে প্রস্থান করিয়ে গল্পটির মানবিক দিকই তুলে ধরেছেন। ‘রসিও আসিয়াছিল; অন্ধকারে দাঁড়াইয়াছিল। লুকাইয়া আস্তে আস্তে সে বাহির হইয়া গেলো।’(‘হাড়’ ১৯৭৭ : ১৪৯)
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) ‘ডাইনী’ মানবিক মমত্ববোধের গল্প; এখানে মাতৃস্নেহ তথা মায়ের বাৎসল্য রূপ অঙ্কিত হয়েছে। ‘ডাইনী গল্পে এক সন্তানহীনা বধূর সন্তান-স্নেহের প্রকাশ ডাইনীগিরির মতলবে ব্যাখ্যাত। গল্পটি মামুলি, নিবিড়তা বা বিস্ময় খুবই কম।’ (সুনীল চট্টোপাধ্যায় ১৯৮১ : ২৬৪) মূলত এ গল্পে এক মৃতসন্তান প্রসবকারী এবং অপর সদ্যোজাত শিশুর বিয়োগ-ব্যথায় কাতর গৃহবধূ কমলার সুতীব্র ও অস্বাভাবিক স্নেহ-ক্ষুধার বাৎসল্যরূপ প্রকাশিত।
চরিত্রনির্ভর এ গল্পে অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে কলকাতাবাসী মধ্যবিত্ত পরিবারের স্ত্রী বিজু অপর নারী কমলাকে ডাইনি বলে আখ্যায়িত করেছে। নারী চরিত্র রূপায়ণে বিভূতিভূষণ তাঁর অধিকাংশ গল্পে পারিবারিক পরিমণ্ডলে মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা নিজেরা হৃদয় মমতার অফুরন্ত ভাণ্ডার আর তা অযাচিত দান করার আকাক্সক্ষা পোষণে অকৃপণ। গল্পে মধ্যবিত্ত কথক তার স্ত্রী ও আড়াই বছরের কন্যা শানিকে নিয়ে যে বাসায় থাকেন তার পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী কমলা পরপর দুটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু প্রথমটি মৃত ও দ্বিতীয়টি জন্মের কিছুদিন পর গত হয়। একারণে তার প্রতিবেশী শিশু কন্যাটির প্রতি গভীর মমত্ববোধ অনুভব করেছে। আর এই মমত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে পোড়াকপালী নারী অপর নারী কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে। অভাগা নারীর সন্তানবাৎসল্যকে ডাইনির নজর হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিজু — ‘চারিদিকে সব ডাইনী। একটা মেয়ে নিয়ে যাও বা ঘর করছি, তা যদি ওদের সহ্যি হয়।’ (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ডাইনী’, ২০১০ : ২৩৭) কথক ওই অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেননি এবং বারবারই কুসংস্কারবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করেছেন। যেমন তিনি যথার্থই ভেবেছেন, কমলার স্বামীর সিফিলিসের কারণে সন্তান সুস্থ হচ্ছে না। অপরদিকে কন্যা শানি অসুস্থ হলে কমলার ওপর তার স্ত্রীর দোষারোপকে পাত্তা না দিয়ে অনবরত টক খাওয়া এবং পরে ডাক্তারের ওষুধে নিরাময় হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁর স্ত্রীর বিশ্বাস জলপড়ায়; এজন্যই শাবক হারা বিড়ালের করুণ সুরের বিলাপকে অলক্ষুণে বলেছে। বিজু কমলাকে রাক্ষুসী বললেও কথক তার মাতৃহৃদয়ে কন্যা বিচ্ছেদের বেদনাকে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর স্ত্রীর ভাবনা — ‘কমলা রোজ রোজ শানির পানে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলবে আর কাঁদবে। বাছার আমার অকল্যাণ হবে তাও বুড়ো মাগী ভুলে যায়।’ (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ডাইনী’, ২০১০ : ২৩৮) নিজের সন্তান হারিয়ে অপরের সন্তানকে আকড়ে ধরার আকুতিকে কেবল অন্ধবিশ্বাসের কারণে ডাইনিত্ব অভিধা দেওয়া হয়েছে। কথক জানিয়েছেন কমলার কুনজর থেকে বাঁচার জন্য স্ত্রীর উপর্যুপরি অনুরোধে বাসা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। এ গল্পে শিশুর অনিষ্টকারিণী হিসেবে ডাইনি চরিত্রের একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু লোকবিশ্বাসের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখানে অনুপস্থিত। যদিও শিশুর প্রতি আগ্রহী নারী চরিত্রের বিশেষ দিকই ডাইনি শিরোনামের গল্পগুলোর একটি বিশিষ্টতা। তবে ‘ডাইনী’ গল্পের মতো শিশুদের প্রতি বাৎসল্যে উচ্ছ্বসিত নারীচরিত্র (আতুরী ডাইনি) সৃজনে আলাদা পরিবেশ-পরিস্থিতি রয়েছে বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে। [ক্রমশ]