সংক্ষিপ্তসার : ডাইনি বা ডাইনিবিদ্যা কোনো পেশা নয় তা লোকসংস্কারের বিচারে নারীর অলৌকিক ক্ষমতা ও অশুভ স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। অথচ সেই বাস্তব নারী মানবিক বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। তাহলে ডাইনি নামের যৌক্তিকতা কি? ভারতবর্ষের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে ডাইনিবিদ্যা চর্চার সম্যক পরিচয় পাওয়া গেলেও লোকমানসসম্ভূত সেই ধারণা-বিশ্বাসজাত শুভ-অশুভ ডাইনির অস্তিত্ব আজ অবলুপ্ত। বরং কুসংস্কারজাত মন্দ ডাইনি-বিশ্বাস লোকজীবনে এখনো বিদ্যমান। বাংলা ছোটগল্পে ডাইনি চরিত্রের স্বরূপ অন্বেষণ করতে গিয়ে ডাইনিবিদ্যার নৃতাত্ত্বিক কিংবা সমাজতাত্ত্বিক পরিচয়ের পরিবর্তে লোকসংস্কারকে কেন্দ্র করে রচিত ‘ডাইনি’ শিরোনামে গল্পগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গল্পকাররা লোকবিশ্বাস ও সংস্কারে চিহ্নিত ডাইনি চরিত্র রূপায়ণে মানুষের মানবিক প্রবৃত্তিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। লোক-প্রচারিত নারীর ডাইনিসত্তাকে আবৃত করে দিয়েছে তার মাতৃস্নেহ মমত্ববোধ আর সন্তানবাৎসল্যের অবারিত প্রকাশে। প্রকৃতপক্ষে লোকবিশ্বাসের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি যাই থাকুক না কেন নারীর ডাইনিসত্তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই- গল্পকারদের প্রত্যেকের অন্তিম ভাষ্য ঠিক তাই।
ডাইনিবিদ্যা হলো বিভিন্ন ধরনের জাদুকরি বা অতিমানবিক ক্ষমতা নিয়ে চর্চা। এসব জাদুকরি ক্ষমতা নিয়ে যিনি কাজ করেন বা ক্ষমতা দাবি করেন তাকে ডাইনি বলা হয়ে থাকে। ‘ডাক’ হিন্দু দেবতা শিবের অনুচর। ডাক হচ্ছে এক ধরনের পিশাচ। ডাকের স্ত্রী লিঙ্গ ডাকিনী। ডাকিনী থেকেই ‘ডাইনি’ শব্দের উৎপত্তি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ (১ম খণ্ড)-এ ডাইন বা ডাইনি অর্থ নির্ণয়ে কয়েকটি বিষয় লিপিবদ্ধ রয়েছে। জাদুবিদ্যাবলে দৃষ্টিমাত্রে শিশুর অনিষ্টকারিণী স্ত্রীলোকই ‘ডাইনি’। কথিত আছে, এরা মন্ত্রবলে শিশুর রক্ত চুষে শিশুকে শীর্ণ করে। এদের দৃষ্টি শিশুর স্বাস্থ্যভঙ্গ করে। (২০০৮ : ৯৯৬) অর্থাৎ উপদ্রবকারিণী নারী হিসেবে ডাইনিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতকোষ (তৃতীয় খণ্ড)-এ লেখা আছে- ডাকিনী শব্দটি ডাক শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। ‘ডাক’ অর্থ মন্ত্রসিদ্ধ গুণী পুরুষ, বিজ্ঞ অভিজ্ঞ ব্যক্তি। ডাক শব্দ এখন অপ্রচলিত তবে ডাকিনী শব্দ (তদ্ভব ‘ডাইনি’) মন্ত্রসিদ্ধ দৃষ্টিবিষ বৃদ্ধা গুণিনীর অর্থে এখনো প্রচলিত। এখন ডাকিনী হয়েছে ডাইনি। এরা শিশুর অরিষ্টকারী। যেমন চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যে আছে- ‘ডাকিনী শাকিনী হৈতে শঙ্কা উপজিল চিতে ডরে নাম থুইল নিমাই।’ (ভারতকোষ তারিখবিহীন : ৬৪৩) নিমাই শব্দের অর্থ মাতৃহীন বা নিমের মতো তেতো। এ নাম দেওয়ার কারণ ডাকিনী-শাকিনীর মনে দয়ার উদ্রেক হবে এবং তারা শিশুর প্রাণ নাশ করবে না। এই ছিল বিশ্বাস। অপরদিকে ‘তেতো হওয়ায় অনিষ্টকারীরা শিশুটিকে গ্রাস করা থেকে বিরত থাকবে।’ (দেবব্রত ভট্টাচার্য ২০০৮ : ৪১) মঙ্গলকাব্যেও এ ধরনের প্রসঙ্গ রয়েছে। বিশেষ শক্তিসম্পন্না ডাকিনীরা তাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের জন্য হিন্দু সমাজে বিশেষ নিন্দনীয় হতো। তবে কোনো কোনো ডাকিনী পরবর্তীকালে মঙ্গলচণ্ডীর সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যাওয়া আশ্চর্য নয়। মঙ্গলকাব্যে ‘ডাইনি-ডাকিনী’ উভয় শব্দই আছে। যেমন, ‘তোমার মোহিনী বালা/ শিখিয়া ডাইনী কলা/ নিত্য পূজা ডাকিনী দেবতা।’ (আশুতোষ ভট্টাচার্য ২০০৯ : ৩৬০) মূলত এক সম্প্রদায়ের তান্ত্রিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে ডাকিনী বলা হতো। বৌদ্ধগীতি সাহিত্যে ডাকিনী শব্দ আছে। যেমন সরহপাদের রচনা — ‘ডাকিনীবজ্রগুহ্যগীতি’। (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ১৪০৮ : ১৩০) আবার হিন্দু তন্ত্র সাধনায় ডাকিনী শক্তির কথা পাওয়া যায়। (১৪০৮ : ৪৩৯) আসলে প্রাচীন শব্দ ডাকিনী তন্ত্রশাস্ত্রে প্রযুক্ত হলেও এটি দ্বারা ইন্দ্রজাল বিদ্যায় পারদর্শিনী এক শ্রেণির নারীকে বোঝানো হতো। পূর্বেই বলা হয়েছে ‘ডাইনি’ শব্দটি ডাকিনী শব্দের অপভ্রংশ। ‘ডাকিনী’ শব্দের উদ্ভব সম্পর্কে শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন — ‘ডাক’ কথাটি তিব্বতী, অর্থ জ্ঞানী; এর স্ত্রীলিঙ্গ ডাকিনী। ‘আমাদের খনার বচনের ডাকের বচন কথার মূল অর্থ বোধ হয় জ্ঞানীর বচন। ডাকিনী কথার মূল অর্থ বোধ হয় ছিল ‘গুহ্যজ্ঞানসম্পন্না’; আমাদের বাঙলা ‘ডাইনী’ কথার মধ্যে তাহার রেশ আছে; মধ্যযুগের নাথসাহিত্যেও রাজা গোপীচাঁদের মাতা ময়নামতী মহাজ্ঞানসম্পন্না এক-জাতীয় ‘ডাইনী’ ছিলেন। সুতরাং মনে হয়, এই ‘ডাকিনী’ দেবী কোনো নিগূঢ় জ্ঞানসম্পন্না তিব্বতী দেবী হইবেন। (শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্ত, ১৩৬৭ : ১৩) ডাকিনীরা নানাবিধ তান্ত্রিক আচার পালন এবং ঐন্দ্রজালিক বিদ্যা-প্রদর্শন করে সাধারণ লোকের মনে শ্রদ্ধা ও বিস্ময় সৃষ্টি করত।
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত চেম্বার্সের বিশশতকের অভিধানে ‘উইচ’ শব্দের বুৎপত্তি হলো — অ্যাংলো স্যাক্সন ‘উইটিগা’ বা ‘উইগা’ থেকে ‘উইচ’ বা ডাইনি শব্দটির সৃষ্টি। উইটিগা বা উইটগার অর্থ হচ্ছে ‘উইচডম’; অর্থাৎ ‘প্রজ্ঞা বা জ্ঞান’। (মাসুদুজ্জামান ২০১৩ : ৪৪) ‘ডাইনি তারাই যারা প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের অনুসারী।’ (২০১৩ : ৪৫) এদের অলৌকিক এবং মানববিরোধী অপশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইউরোপে। ইউরোপে ভাবা হতো, জীবনকে বদলে দেবার নানা কৌশল তাদের আয়ত্তাধীন। ইউরোপে ‘পুরুষতন্ত্রই ডাইনিপ্রথার দ্রষ্টা। পুরুষতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ‘ডাইনি’ ধারণার প্রচলন ঘটে। সাধারণত পুরুষের প্রাধান্য খর্ব হলে বা খর্ব হওয়ার ভীতি সৃষ্টি হলে পুরুষের তুলনায় মেধাবী, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও প্রতাপশালী নারীকে ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে; পুরুষের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।(২০১৩ : ৪১) ডাইনি হিসেবে খ্যাত নারীরা কেউ কেউ ছিল লোকচিকিৎসক; গরিব মানুষের ভরসার স্থল। বিশেষত নারীর রোগ-যন্ত্রণা উপশমে প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা প্রতিষেধক বা বন্য গাছগাছালি ব্যবহার করা হতো। কবিরাজি প্রথার প্রচলন তাদের মাধ্যমেই শুরু হয়; কেউ বা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিল।
ভারতবর্ষের লোকজীবনে শুভ-অশুভ ধারণা কিংবা অনিষ্টকর চিন্তায় নিজেদের অসহায়বোধ থেকে ডাইনি-ভীতির সৃষ্টি অনেক পুরানো। উপরন্তু এখানে ডাইনিবৃত্তি একটি আদিম সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃত। এই সংস্কৃতিজাত অন্ধবিশ্বাস সমকালেও জীবন্ত। ডাইনিবৃত্তি সম্পর্কীয় ধর্মীয় সংস্কার, আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, টোটেম-ট্যাবু ইত্যাদি পুরুষানুক্রমিকভাবে মৌখিক রীতিতে প্রাণবন্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীজীবনে। মনে রাখতে হবে ‘প্রাচীন ভারতের তক্ষশিলা, নালন্দা ও বিক্রমশিলার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় ডাকিনীবিদ্যা অধ্যয়ন ও গবেষণা করা হতো।’ (দেবব্রত ভট্টাচার্য ২০০৮ : ১৮৬-১৯১) সে সময় সাধারণ মানুষ জানত যে, ডাইনিবৃত্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, আকাশচারণের ক্ষমতা এবং ডাকিনীদের মধ্যেই এর ব্যাপক চর্চা হয়ে থাকে। তারাশঙ্করের ‘ডাইনী’ গল্পে এই প্রাচীন বিশ্বাসের প্রকাশটি লক্ষ করা যায়। আসলে বৌদ্ধযুগে জাদুবিদ্যা, মায়াবিদ্যা ও রহস্যবিদ্যার যথেষ্ট প্রসার হয়েছিল। বিশেষত বৌদ্ধ তান্ত্রিক আচারের মধ্য দিয়েই ডাকিনীচর্চার সূত্রপাত ঘটে। তখন ডাকিনী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়- এরা হঠাৎ হঠাৎ হিংস্র হয়ে ওঠে, কারণে-অকারণে লোকের অনিষ্ট করে, মন্ত্রমুগ্ধ করে মানুষকে ভুল পথে চালিত করে, রূপের পরিবর্তন করে, আকাশপথে বিচরণ করে, নরমাংস ভক্ষণ করে ইত্যাদি।(দেবব্রত ভট্টাচার্য ২০০৮ : ১৮২) ছোটগল্পে ডাইনি চরিত্র রূপায়ণের ক্ষেত্রে বাঙালি লেখকরা ঠিক এসব বৈশিষ্ট্য বা অনুষঙ্গই ব্যবহার করেছেন। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে বৈদিকযুগে মায়াবিদ্যার চর্চা হয়েছে। হিন্দু তান্ত্রিক যুগের তন্ত্রেও ষড়াধারের মূলাধার চক্রে ডাকিনী দেবীর অধিষ্ঠান লক্ষ করা যায়। আদিম ধর্ম বিশ্বাস থেকে গড়ে ওঠা ডাইনিবৃত্তির চর্চার ঐতিহ্যকে ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষ বহন করে এসেছে। তা লোকজীবনের অঙ্গ, লোকসংস্কৃতির অংশ।
ইউরোপীয় ‘উইচক্রাফট’ ভারতীয় ডাইনিতন্ত্র থেকে আলাদা যদিও ভারতের ডাইনিরা ইউরোপের মতো একসময় শিষ্ট ও দুষ্ট এবং কালো-সাদা হিসেবে দু-ভাগে বিভক্ত হয়েছে। কিছু কিছু আদিবাসী এখনো প্রকাশ্যে ডাইনিচর্চা করে। নিয়মমাফিক গোষ্ঠীজীবনকে নিরাপদ করতে এবং রোগ, ব্যাধি, যন্ত্রণা, অশুভ শক্তির আক্রোশ ও কালো ডাইনির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাদা ডাইনির শরণাপন্ন হয় তারা। ইউরোপের ডাইনিতন্ত্রকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা গণমৃগী রোগ বা ‘ম্যাস হিস্টিরিয়া’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তাকে। ডাইনিবিদ্যা চর্চায় যারা নিয়োজিত ছিল তারা চিকিৎসক হিসেবে খ্যাত হয়। একসময় ইউরোপে ‘ডাইনি চিকিৎসক’ অভিধা প্রচলিত ছিল। ডাইনিদের ভালো-মন্দ, ইষ্ট-অনিষ্ট ইত্যিাদি যাবতীয় চিন্তা করতে হতো সেই চিকিৎসককে। সেই চিকিৎসক ভেষজবিদ্যা, জাদুবিদ্যা এবং জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শী হতো। ইউরোপে চৌদ্দ শতক থেকে সতেরো শতক পর্যন্ত এসব গুণবতী নারীকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে বিচারের নামে গণহত্যা করা হয়। প্রায় পাঁচ লাখ নারীকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে মারা হয়। কারণ ‘যে নারীর শরীরে কোনো পুরুষ প্রবেশ করেনি, সে যখন আইবুড়ো হয় তখন পুরুষ তাকে মনে করে ডাইনি, অভিচারিণী।… পুরুষের কাছে পোষ না-মানা, বিদ্রোহী নারীমাত্রেই দানবী বা ডাইনি; কেননা সে পুরুষের সূত্র ও অনুশাসন মেনে নেয়নি।’ (হুমায়ুন আজাদ ১৯৯৫ : ৪৬) [ক্রমশ]