বিশ্বব্যাপী নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের কাজের প্রশংসা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করে সমাজে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য, ‘প্রগতিকে দাও গতি’ অর্জনের উৎসব হিসেবেই পালন করা হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
২০২২-এ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের থিম হলো ‘Gender Equality Today for a Sustainable Tomorrow’ অর্থাৎ মজবুত ভবিষ্যতের জন্য আজ লিঙ্গ সমতা। জলবায়ু সংকট এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের প্রেক্ষাপটে লিঙ্গ সমতার অগ্রগতি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।
নারীদের ওপর হওয়া নির্যাতন, বৈষম্যর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নারীদের জাগ্রত করাই নারী দিবস পালনের উদ্দেশ্য। কারণ এই স্বয়ংসিদ্ধাদের উপর নির্ভর করে আছে পরিবার, দেশের ভাগ্য বা কোম্পানির ভবিষ্যৎ।
“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
সমাজ বিনির্মাণে নারী-পুরুষ উভয়েরই সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। নারীর উন্নতি বাদ দিয়ে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বহু মনীষীরা উপলব্ধি করেছিলেন নারীকে যোগ্য সন্মান দিয়ে সমাজ গঠনের কাজে ঠিক মতো যদি না লাগানো যায় তবে প্রতিনিয়ত অবমাননা, অবমূল্যায়ন নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই ভারতীয় নারীদের মুক্তিলাভ সম্ভব।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ আধুনিক হচ্ছে, সমাজের প্রয়োজনে মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে, উচ্চ-শিক্ষা লাভ করছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আজো নিজের মতো জীবনযাপন, জীবিকা নির্বাচন, জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে … বাধা পাচ্ছে।
তবে শুধু নারী নয়, পুরুষেরও অনেক দুঃখ, বঞ্চনা আছে। পুরুষ ও নারীর অনেক সমস্যা এক মনে হলেও তার ফল মেয়েদের জীবনে সব সময় বহুমাত্রিক। মেয়েদের এবং ছেলেদের অবস্থানে আজও অনেক ফারাক।
আসলে, নারীবাদ মানে নারী বনাম পুরুষের যুদ্ধ নয়। নারীবাদ ক্ষমতার সোপানতন্ত্র ভাঙতে চায়। ক্ষমতাবানের সঙ্গে ক্ষমতাহীনের লড়াই, প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে মুক্ত চিন্তার জেহাদই হল নারীবাদ। এই ক্ষমতার ভিত্তি হতে পারে লিঙ্গ, শ্রেণি, ধর্ম, জাতপাত, বর্ণ, যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচিতি। নারীবাদী চিন্তা অনুযায়ী, পিতৃতন্ত্রে পুরুষও বঞ্চিত হয়, পুরুষকেও অনিচ্ছা-সত্ত্বে অনেক দায়ভার গ্রহণ করতে হয়। স্ত্রীকে সংসারের কাজে সাহায্য করলে তাদের ‘স্ত্রৈণ’ বলে খাটো করা হয়। নারীবাদ পুরুষকেও পিতৃতন্ত্রের বাঁধন থেকে মুক্তি দিতে চায়। নারীবাদ সমাজ-নির্মিত পৌরুষের ধারণার বিরুদ্ধে সরব। নারী দিবস শুধু নারীর দিন নয়, সমস্ত পিতৃতন্ত্রবিরোধী মানুষের উৎসব।
নারীর অধিকার আদায়ে একজন নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি পরিবারেরও বেশ কিছু ভূমিকা রয়েছে। নারীর নিজেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। নারীর নিজেরও কিছু দায়িত্ব থাকবে। স্বেচ্ছাচারী হয়ে পুরুষের প্রতি বিরূপ আচরণ করবে তা নয়। সর্বোপরি কথা হচ্ছে নারী-পুরুষ উভয়কে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের সহনশীল হতে হবে।
একই মা-নারী অথচ বউ নারীকে মেয়ে নারী ভাবে না, বউ নারী শাশুড়ি নারীকে মা ভাবতে পারে না, ননদ-নারী বৌদি-নারীকে বোন ভাবতে পারে না বা তার বিপরীত!
দিন শেষে চাকরি থেকে ফেরা ক্লান্ত-শ্রান্ত পুরুষটির কাছে নিজেদের একগাদা নালিশ নিয়ে উপস্থিত হয় বাড়ির সকল নারীরাই। অফিসে কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি পেলে হিংসায় জ্বলে দল পাকাতে থাকি নারীমন্ডলী । রাস্তায় কোনো মেয়েকে বিপদে দেখলে সবার আগে নিজের অবস্থান নিরাপদ করে একটা নারী।
২০১৫-১৬-র জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের ৪২ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, সঙ্গত কারণ থাকলে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারেন স্বামী এবং অবাক করার মতো কথা, মহিলাদের মধ্যে সংখ্যাটি ৫২ শতাংশ। ঘরের কাজে অবহেলা করা, শ্বশুর শাশুড়িকে অপমান করা, যৌন মিলনে আপত্তি জানানো….এ রকম বেশ কয়েকটি কারণের কথা বলা হয়েছিল সমীক্ষাটি তে।
মূলত জন্মলগ্নের সূত্রপাত থেকে সিস্টেমের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয় ‘আদর্শ নারীর’ ধারণাটি। পিতা ও স্বামীর বংশের শুদ্ধতা রক্ষার দায় তার। বাংলা সিনেমার মা যখন বয়ঃসন্ধির মেয়েকে ঘরে বন্ধ রাখে বা সিরিয়ালের শাশুড়ি-বৌমা যখন চুলোচুলি করে, তখন পুরুষ মুচকি হেসে বলেন, ‘মেয়েরাই মেয়েদের আসল শত্রু।’
কোভিড অতিমারী সঙ্কটের আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গিয়েছে গার্হস্থ্য হিংসা এবং নির্যাতনের হার। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা, মনস্তাত্বিক, আইনি, পুলিসি সাহায্য ও আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করতে হবে। অতিমারী উত্তর পরিস্থিতিতে নারীর কর্মভূমিকে সমান করার দায়িত্ব সকলের।
সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তন এসেছে ধীরে। সকালে, বিকালে মানুষের ঢলে দেখা যায় কাঁধে দুই ব্যাগ, পায়ে ফিতে বাঁধা জুতো, পাশ্চাত্যের পোশাকে তাঁরা কর্মস্থলে যান; অপেক্ষা করেন পাবলিক ট্রান্সপোর্টের; রোডের ধারের দোকান থেকে কিনে খান বাদামভাজা, এগরোল… এদের দেখলে আশা জাগে। মনে হয়, কর্মভূমিতে নিজেদের জন্য একটুকরো পৃথিবী খুঁজে নিচ্ছে এরা।
আপনি কারো মিসেস বা কন্যা বা মা হতেই পারেন কিন্তু সবার আগে আপনি একজন সুন্দর নারী যে দশভূজা হতে পারে, প্রয়োজনে হতে পারে রণচন্ডী, যে গভীর অনুশীলনে হতে পারে কল্পনা চাওলা, এস্থার ডাফলোও, মেরি কম বা সকলের জন্য নিবেদিত প্রাণ মাদার টেরিসা। নিজের সিদ্ধান্তটা নিজে নিন।
প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে অনেক আয়োজন করে নারী দিবস পালিত হবে। কিন্তু নারী দিবস পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্য তা যেন শুধু মুখের বুলিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন সত্যিই কার্যকর হয় এ চাওয়া অন্যান্য সচেতন মানুষের মতো আমারও চাওয়া। সমাজে এগোতে হলে নারী-পুরুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। পরিবর্তন দরকার পুরাতন রীতিনীতির, কুসংস্কার ও মানসিকতার। সূত্রপাত ঘটুক মূল থেকে। সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলুন নিজের কন্যা সন্তানটিকে। তবেই সংকীর্ণতার বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে।
নারী আজ নিজগুণে ঝলমলে রোদ্দুর, মনখারাপি বিকেল, বৃষ্টির শব্দ, মায়ের হলুদমাখা আঁচল বা সিঁদুরের প্রলেপ পেরিয়ে স্বতন্ত্র, স্বাবলম্বী, আদুরে গোটা এক আকাশের নাম। সেই আকাশটা রোজ উদযাপিত হোক।
Woman empowerment
বাহ বাহ