বাংলার মহিলারা কি একেবারেই ঘরকুনো ছিলেন? ছবির এই মন্দিরটি বীরভূম জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ইটান্ডায় অবস্থিত। রীতিতে জোড়বাংলা মন্দির। কোন স্থায়ী বিগ্রহ নেই। কালীপুজোর সময় কালীর মৃন্ময়ী প্রতিষ্ঠা করে পুজো করা হয়। বেশ কিছু অনন্য সাধারণ প্যানেল থাকলেও এই প্যানেলটি বেশ উল্লেখ যোগ্য বলে আমার মনে হয়েছে। এখানে দুই মহিলা কুস্তিগীররের কুস্তির দৃশ্য দেখানো হয়েছে। একসময় নাকি অজয় নদ এই গ্রামের পাশে দিয়ে প্রবাহিত হতো। আর অজয়ের হাত ধরেই ব্যাবসা বাণিজ্য আর তাতেই এসেছিল এই গ্রামের সমৃদ্ধি।

আজকের মরা অজয় নয়, তখন রীতিমতো নাব্যতা ছিল অজয়ের। অষ্টাদশ শতকের এই মন্দির আজও হারিয়ে যাওয়া সেইদিন গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। বাঙালি মেয়েরাও যে শরীর চর্চাতেও কোন অংশে কম ছিলেন না তার প্রমাণ এই মন্দির গাত্রে। আপনারা আগ্রহ নিয়ে WWE Women’s Championship দেখেন কিন্তু সেই একই দৃশ্য চিত্রায়িত বাংলার মন্দিরগাত্রে, তা কি আপনাদের নজরে আসবেনা ? তাছাড়া শরীর চর্চাতে নারীর কাজ কোতুলপুরে ভদ্র পরিবারের পঞ্চরত্ন শ্রীধর মন্দিরগাত্রে দেখতে পাই। এ সবই প্রায় অজানা বাংলার অজানা নারীকে আমাদের সামনে তুলে ধরে।

মাথায় রাখতে হবে উপনিবেশ মহিলাদের সম্পত্তি, রোজগার আর ব্যবস্থাপনার অধিকার কেড়ে অধমর্ণ বানিয়ে দিল। দেশ, সমাজে মহিলাদের জন্যে যতটুকু ফাঁকফোকোর ছিল সে সব কেড়ে নিয়ে, স্তরে স্তরে অধিকারগুলি ছিন্ন করে সমাজ হয়ে উঠল চরমতম পুরুষতান্ত্রিক। ব্রিটিশবাবারা বাংলায় আসার আগে বাঙলার মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার ছিল, বিশেষ করে বিধবাদেরতো বটেই, বিবাহিত মহিলাদের অনেক সম্পত্তিতে পুরুষের হক ছিল না — আশ্চর্যের এই বিধানগুলো মনুস্মৃতি অনুসারী — সেই সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নিল উপনিবেশ।

এ প্রসঙ্গে পাঞ্জাবের প্রেক্ষিতে দুটি বই বীণা তলোয়ারের ডাউরি মার্ডার এবং নীলাদ্রি ভট্টার দ্য গ্রেট এগ্রারিয়ান কনকুয়েস্ট পড়া যেতে পারে। রাণী ভবানী, দেবী চৌধুরাণীরা ছিলেন সমাজের ব্যবস্থাপক, জমিদার, আজকের ভাষায় সিইও। সেই ভূমিকাটাও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে কেড়ে নেওয়া হল। উপনিবশে মহিলাদের শুধু সম্পত্তির অধিকার গেল না, প্রকাশ্যে খেলাধুলার অধিকার, উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশিদারির অধিকার অর্থাৎ চরকা কাটা কেড়ে নিয়ে অন্যান্য কারিগরি থেকে রোজগার ধ্বংস করে তাদের বেরোজগার করে দেওয়া হল।

ছিয়াত্তরের গণহত্যা, ৯৩-এর সম্পত্তির অধিকার হ্রাস অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, চলতে থাকা বিপুল বিশিল্পায়ন, তাঁতিদের উচ্ছেদ ইত্যাদির পরেও ১৮০৮-এর হ্যামিলটন বুকানন পাটনা, যেটা খুব বড় কাপড় উৎপাদনের এলাকা ছিল না, ৩ লক্ষ কাটনি দেখছেন! তাহলে পূর্ণ উৎপাদন সময়ে ঢাকা, শান্তিপুর, কাশিমবাজার ইত্যাদি বাঙলার হাজারো এলাকায় কত মহিলা চরকা কাটত? চরকা কাটা ছিল জাতপাতহীন একটি কারিগরি।

আপনারা যদি সমাচার চন্দ্রিকা, ৫ জানুয়ারি ১৮২৮, ২২ পৌষ ১২৩৪-এর পত্রিকায় প্রকাশিত শান্তিপুরের এক কাটনির চিঠি পড়েন অবাক হয়ে যাবেন, তিনি পেশাদার কাটুনি নন, তা সত্ত্বেও বিধবা কাটুনি তিন মেয়ের বিয়ে শ্বশুরের শ্রাদ্ধ দিয়েছেন যতটা পারাযায় খরচ করে। আগেই বলেছি, উপনিবেশপূর্ব সময়ে বাংলায় বহু মহিলা জমিদার ছিল। অর্থাৎ তারা সামাজিক সম্পত্তি বিকাশ ইত্যাদির কাজ ব্যবস্থাপনা করতেন, সেটাও কেড়ে নেওয়া হল। আমরা দেখলাম শুধু মহিলাদের সম্পত্তি কাড়ল না উপনিবেশ, তার রোজগার এবং তার প্রশাসনিক ভূমিকা ধ্বংস হয়ে গেল।
কুস্তির ছবি শুভদীপ সান্যাল। শরীরচর্চায় নারীর ছবি বিপ্লব বরাট।