রতনকুমার নন্দী
রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগেই ছাত্রাবস্থায় একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় সেকালের নারীদের অবস্থা সম্পর্কে মধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন— “In India,… women are looked upon as created merely to contribute to the gratification of the animal appetites of men.” (On the importance of educating Hindu Females)। দীর্ঘকাল প্রচলিত রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ নারীর এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এর পূর্বে ও পরে অনেকেই ভেবেছেন। আধুনিক বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ রবীন্দ্রনাথও তাঁর দীর্ঘ সাহিত্য সাধনায় এ সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা করেছেন গভীরভাবে। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নারীর অবস্থান ও ভূমিকা সম্পর্কে রবীন্দ্রভাবনা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তার সাক্ষ্য বহন করছে তাঁর বৈচিত্র্যময় সাহিত্যসম্ভার। যার মাত্র দু-একটি দৃষ্টান্ত উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হবে।
১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে পুণায় রমাবাই-এর বক্তৃতা শুনে এবং বক্তৃতা প্রদানের সময় পুরুষ শ্রোতাদের দুর্ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ‘রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে’ রচিত একটি ‘পত্র-প্রবন্ধ’-এ লিখেছিলেন—‘মেয়েরা সকল বিষয়েই যদি পুরুষের সমকক্ষ, তা হলে পুরুষের প্রতি বিধাতার নিতান্ত অন্যায় অবিচার বলতে হয়। কেননা কতক বিষয়ে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, যেমন, রূপে ও অনেকগুলি হৃদয়ের ভাবে…।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন—‘…প্রকৃতিতে একটা অর্থাৎ ক্ষতিপূরণের নিয়ম আছে। শারীরিক বিষয়ে আমরা যেমন বলে শ্রেষ্ঠ, মেয়েরা তেমনই রূপে শ্রেষ্ঠ; অন্তঃকরণের বিষয়ে আমরা যেমন বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ, মেয়েরা তেমন হৃদয়ে শ্রেষ্ঠ; তাই স্ত্রী-পুরুষ দুই জাতি পরস্পর পরস্পরকে অবলম্বন করতে পারছে।’ প্রবন্ধটির মধ্যে এমন আরও অনেক কথা বলা আছে যা ‘প্রগতি পরিপন্থী’। কারণ অল্পবয়সে রবীন্দ্রনাথ বিষয়টিকে দেখেছিলেন শারীর-বৃত্তির দৃষ্টিকোণ থেকে। নারীকে গর্ভধারণ করতে হয়। এ সময় সন্তানকে আশ্রয় করে নারীকে ‘নিতান্ত অসহায়ভাবে’ সময় কাটাতে হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন, ‘তখন সমকক্ষভাবে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা মেয়েদের পক্ষে কী রকমে সম্ভব হবে?’ তাই এ সময়ে তাঁর মনে হয়েছিল, নারীর কর্মক্ষেত্র স্বতন্ত্র। প্রায় সমসাময়িককালে লেখা ‘রাজা ও রানী’ নাটকে সুমিত্রা-বিক্রমের সম্পর্কের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ অনুরূপ ভাবনাকেই প্রকাশ করেছিলেন। রানী সুমিত্রা বিক্রমকে বলেছিলেন, ‘তোমরা পুরুষ দৃঢ় তরুর মতোন। আমরা লতার মতো তোমাদের শাখে।’ পুরুষকে আশ্রয় করেই বিকশিত হবে নারীর জীবন। আরও অনেক পরে আমেরিকায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় বলেছিলেন যে, পশ্চিমী দেশগুলিতে নারীদের মধ্যে যে restlessness দেখা যাচ্ছে তা ‘Cannot be the normal aspect of her nature. For women who want something special and violent in their surroundings to keep their interests only prove that they have lost touch with their own true world.’ (Personality : Women, 1917)
যেহেতু তিনি রবীন্দ্রনাথ এবং চিন্তনজগতে প্রতিনিয়ত গতিশীল, তাই নারী সম্পর্কিত তাঁর ভাবনা একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে স্থিতিশীল ছিল না। তাঁর সাহিত্যসম্ভারের বিবিধ প্রকরণে বিভিন্ন সময় নারী সম্পর্কিত ভাবনাকে বিবর্তিত হতে দেখা যায়। প্রয়াণের অনতিকাল পূর্বে লেখা ‘তিনসঙ্গী’-র গল্পগুলিতে, বিশেষ করে ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের সোহিনী চরিত্রে আবিষ্কার করেছেন নারীচরিত্রের ঝকঝকে ক্যারেকটারের তেজ। মধ্যবর্তী স্তরে প্রবন্ধ, রম্যরচনা, কাব্য, গল্প, উপন্যাসে নারী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে ভিন্নভাবে এবং ক্রমশ তা একটি পরিণামমুখী গতিলাভ করেছে।
কৌলীন্য প্রথার নিয়মনীতি মেনে নানাবিধ অযৌক্তিক সামাজিক বিধান, একান্নবর্তী পরিবারের বিধিনিষেধ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কীভাবে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার বিকাশ ব্যাহত হয়, তা নানাভাবে ধরা পড়েছে রবীন্দ্রনাথের গল্পে, উপন্যাসে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রথা ও সংস্কারের বিরোধিতা করেছেন বারেবারে। তবে অনেকক্ষেত্রেই তা উপস্থাপিত গল্পের প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র হিসেবে। সমাজজীবনে মাতৃত্ব-প্রেয়সীত্ব-পত্নীত্বের গণ্ডিবদ্ধ জীবনটাতেই যে নারীজীবনের চরিতার্থতা নয়, এ কথাকে রবীন্দ্রনাথ কখনওই মেনে নিতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে স্মরণ করা যেতে পারে ‘পলাতকা’-র ‘মুক্তি’, ‘ফাঁকি’ এবং ‘মহুয়া’-র ‘সবলা’ কবিতাগুলির কথা। ‘মুক্তি’ কবিতার অসুস্থ রমণীটি ন-বছর বয়সে স্বামীগৃহে এসে ‘সতীলক্ষ্মী’, ‘ভালোমানুষ’ সুনামের জন্য সনাতন একান্নবর্তী পরিবারের রীতিনীতি মেনে বাইশটি বছর কাটিয়ে দিয়েছিল। দশের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে নিজের জন্য ভাবনার একটুও সময় ছিল না তার। রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা বাইশ বছর এই এক চাকাতেই তাঁর জীবন বাঁধা ছিল। রোগগ্রস্ত অবস্থায় মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন অনুভব করল ‘আমি নারী, আমি মহিয়সী’ তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল ‘ফাঁকি’ কবিতার বিনুর, সামনে-পিছে শ্বশুর-ভাসুরের ভিড়ে সে কখনও তাঁর স্বামীকেই একান্তে আপন করে পায়নি। ‘মহুয়া’-র ‘সবলা’ কবিতায় এজন্যই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে—‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার/কেন নাহি দিবে/অধিকার হে বিধাতা।’
কবিতার এই মৃদুকণ্ঠে উচ্চকিত হয়ে ব্যক্ত হলো গল্পে, উপন্যাসে। ‘গোরা’ উপন্যাসে সুচরিতা এবং ললিতাকে পাওয়া গেছে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বময়ী নারী হিসেবে। তবে উচ্চকিত প্রতিবাদ নিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিমায় আপন ব্যক্তিত্বে প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে প্রথম উদ্ভাসিত হতে দেখা যায় ‘স্ত্রীর পত্রে’-র মৃণালকে। বাড়ির মেজো বউ মৃণাল পনেরো বছরের দাম্পত্যজীবনের পরে, সংসার থেকে বহুদূরে শ্রীক্ষেত্রের সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে প্রথম জানতে পেরেছিল তাঁরও একটি জগৎ আছে। তাঁর বিয়ে হয়েছিল বারো বছর বয়সে। তাঁর রূপ ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল বুদ্ধি। মৃণালের মা উদ্বিগ্ন ছিলেন মেয়ের বুদ্ধির জন্য। কারণ এদেশের সেকেলে ধারণায় ‘মেয়ে মানুষের পক্ষে এ এক বালাই।’ যাকে বাধা মেনে চলতে হয়, সে যদি বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে চলতে চায়, তাহলে ঠোকর খেয়ে তার কপাল ভাঙবেই। মৃণাল এজন্য কুণ্ঠিত নয়, পরাজয় স্বীকার করে মরণকে বরণ করতে সে অনাগ্রাহী। সে ভাবে—‘বাঙালির মেয়ে তো কথায় কথায় মরতে চায়। কিন্তু, এমন মরার বাহাদুরিটা কী?’
শেষ পর্বে লেখা গল্প-উপন্যাসে নারী সম্পর্কে রবীন্দ্রভাবনায় আরও নতুন দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়। ‘দুইবোন’ উপন্যাসে ‘শর্মিলা’ শীর্ষক অংশে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, মেয়েরা দুই জাতের— ‘এক জাত প্রধানত মা, আর এক জাত প্রিয়া।’ নারীর এই দুই রূপ যখন মিলে যায়, তখনই নারীজীবন সার্থক। কিন্তু এরা যখন স্বতন্ত্র সত্তায় দুই রূপে পুরুষের জীবনে আবির্ভূত হয়, তখন বিপর্যয় ঘটে। ‘পঞ্চভূত’ গ্রন্থে দীপ্তি এবং স্রোতস্বিনী চরিত্রের পরিকল্পনায় রবীন্দ্রনাথ এই দিকটির প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। লক্ষণীয় যে, ‘মা’ বা ‘প্রিয়া’—এঁরাও তো পুরুষনির্ভর। তাহলে, ‘আমি নারী, আমি মহিয়সী’ এই ঘোষণার গুরুত্ব কোথায়?
আপন নারীত্বকে বজায় রেখেই নিজেকে পুরুষের পাশাপাশি স্বতন্ত্র সত্তায় তুলে ধরার যে দৃষ্টান্ত সুচরিতা বা ললিতার মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন, তা আরও স্পষ্টতর হলো ‘শেষের কবিতা’-র লাবণ্যের মাধ্যমে। তবে নারীত্বের চূড়ান্ত পরিণতি মনে হয় অভিব্যক্ত হয়েছে ‘ল্যাবরেটরি’-র সোহিনীর মধ্যে। নন্দকিশোর সোহিনীর মধ্যে দেখতে পেয়েছিল ‘ঝকঝক করছে ক্যারেকটারের তেজ।’ আসলে নারীর মধ্যে ক্যারেকটারের তেজকে আবিষ্কারের চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। প্রথম জীবনে, রবীন্দ্রনাথ যে Law of Compensation তত্ত্বের কথা বলেছিলেন তা লক্ষ্য করা গেল সোহিনী চরিত্রে। নারী, সোহিনীর রূপ-লাবণ্যের সঙ্গে মৃণালকথিত বুদ্ধিও যুক্ত হয়েছিল। সে নন্দকিশোরের স্ত্রী, তবে প্রথাগতভাবে এই বিবাহ হয়নি। নন্দকিশোরও সোহিনীকে তৈরি করেছিলেন ‘নিজের বিদ্যের ছাঁচে।’ কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘স্বামী হবে এঞ্জিনিয়ার আর স্ত্রী হবে কোটনা-কুটনি; এটা মানবধর্মশাস্ত্রে নিষিদ্ধ।’ তাই সোহিনীকে তাঁর যথার্থ সহধর্মিণী রূপেই গড়ে তুলেছিলেন। নন্দকিশোরের মৃত্যুর পর সোহিনীকে দেখা গেল ভিন্নরূপে। নারীত্বের মোহজাল বিস্তার করে, অর্থাৎ সহজাত অস্ত্রে পুরুষ শক্তিকে হার মানিয়েছে। সব শেষে যখন জানা যায় নীলা সোহিনীর কন্যা হলেও নন্দকিশোর তাঁর পিতা ছিল না এবং নন্দকিশোর তা জানতেন, তখন পাঠক সচকিত হয়। বিবাহ এবং একান্নবর্তী পরিবারের বন্ধন থেকে, রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধার জগতে আবদ্ধ না থেকে সোহিনী বুঝিয়েছে, নারী, সে যথার্থই নারী এবং মহিয়সী। আপন ভাগ্য জয় করবার অধিকার সে স্বয়ং অর্জন করেছে নারী-শক্তির জোরেই এবং সামাজিক বিধি ব্যবস্থাকে ভেঙে নিজের রূপ, বুদ্ধি ও কর্মক্ষমতাকে আশ্রয় করে।
(লেখক বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর সম্পাদক)
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ৫ মে ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত