আর ক’দিন পরেই পেশ হতে চলেছে কেন্দ্রীয় বাজেট। চলতি বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারি পেশ হতে যাওয়া বাজেটে শেষ তুলির টান পড়ছে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। সারা দেশে এবারের বাজেট নিয়ে চর্চা চলছে। করোনা-কালে অর্থনীতির দারুণ বিপর্যয় হয়েছিল। মনে রাখা দরকার, করোনার আগে থেকেই ভারতীয় অর্থনীতি ধুঁকছিল। ২০২০ সাল থেকে কোভিড অতিমারি আরও সংকটের মধ্যে ফেলে দেয় দেশকে। নানা দিকের মধ্যে একটি হলো মূল্যবৃদ্ধির চাপ, যা অসহনীয় হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় বাজেটে কমবে কি মধ্যবিত্তের করের বোঝা? প্রশ্নটা গত বছর বাজেটের সময়েও উঠেছিল, কিছু না পেয়ে হতাশ হয়েছিলেন মধ্যবিত্ত তথা বেতনভুক কয়েক কোটি মানুষ। এবার কী হবে?

মধ্যবিত্ত বেতনভুক কর্মচারীদের আরেকটু আয়করের সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি প্রতি বছর থাকলেও মহামারীর সময়ে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের সমস্যা। যেমন ওয়ার্ক ফ্রম হোম। করোনা লক-ডাউনের সময় থেকেই এই বিষয়টা এসে গেছে। ব্যাপারটা কী? যাদের পক্ষে সম্ভব তাঁরা বাড়ি থেকেই কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাজটা করবেন ও কর্মস্থলের নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠাবেন, ইত্যাদি। এটা একটা নতুন জিনিস, যা আমরা আগে দেখিনি। নয়া ধরনের কাজের জন্য এবারের বাজেটে কিছু আশা করা যায় কি? বাড়ি থেকে কাজ করা কর্মচারীরা কি পাবেন কিছু সুবিধা? উঠছে প্রশ্ন।
ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে চলবে
করোনা দুঃসময় এখনও চলছে। তৃতীয় ঢেউয়ে লকডাউন না হলেও মোটেই স্বাভাবিক হয়নি অর্থনীতি। পর্যটন, পরিবহণ, বিনোদনের মতো বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভয়াবহ। মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে নির্মম ভাবে। আবার করোনা-কালে কর্মীদের জীবনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। তারই একটি হলো ওয়ার্ক ফ্রম হোম। লক্ষ লক্ষ কর্মচারী বাড়ি থেকে মূলত ইন্টারনেট, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করে মাসের পর মাস কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আগে ভাবা হয়েছিল, লকডাউনের মতো বিধিনিষেধ উঠে গেলেই এই কাজের ধরনটা বন্ধ হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এটা একটা স্থায়ী রূপ পেতে চলেছে। প্রথম দিকে বাড়ি থেকে কাজ সুবিধাজনক ও টাকা-পয়সা সাশ্রয়কারী বলে মনে হয়েছিল, কেননা যাতায়াতের খরচ সেভাবে লাগছে না কর্মীদের। কিন্তু যত দিন গিয়েছে, দেখা যাচ্ছে, কর্মচারীদের খরচ কমবার বদলে বেড়েছে। খরচ কমেছে কেবল যাতায়াতের খাতে।

বাড়তি খরচ ওয়ার্ক ফ্রম হোমে
যাতায়াতের খরচ কমলেও অনেক বেড়েছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, টেলিফোন বা মোবাইল, কম্পিউটারের খরচ। গত দু’বছরে যেভাবে ইন্টারনেট ও মোবাইলের খরচ বেড়েছে, তাতে আরও বোঝা চেপেছে। এমনকী যাঁদের একটা মোবাইল ফোনেই কাজ হয়ে যাচ্ছিল, নানা কারণে তাঁদের একাধিক ফোন লাগছে। একাধিক ফোন লাগার অন্যতম কারণ বিভিন্ন জায়গায় কিছু নেটওয়ার্ক খুব খারাপ থাকে। কোথাও জিও প্রায় চলেই না, কোথাও-বা এয়ারটেল কিংবা ভোডাফোনের সেই সমস্যা প্রকট। একটা সময়ে সব স্থানেই বিএসএনএল-এর কার্যকারিতা উন্নত মানের ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সে কোম্পানিটি প্রায় লাটে তুলে দিয়েছে। নেটওয়ার্কের সমস্যা ছাড়াও একাধিক ফোন ছাড়া কাজ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফলে যাঁরা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন, তাঁদের দু’টি বা তিনটি ফোন লাগছে। সেই সঙ্গে লাগাতার বাড়ছে ফোনের বিল মেটাবার খরচ। একই কথা কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আগে একটা ল্যাপটপ দিয়েই কাজ চলে যাচ্ছিল। মাঝেমাঝে সেটা খারাপ হলে সারিয়ে নেবার সময় পাওয়া যেত, যেহেতু অফিসে কম্পিউটার থাকে। কিন্তু বাড়িতে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেরই বাড়িতে ডেস্কটপ কম্পিউটার ছিল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে গিয়ে তাঁদের আরও একটা ল্যাপটপ কিনতে হয়েছে।
অন্য সমস্যাও খরচ বাড়াচ্ছে। অনেকের বাড়িতে অফিসের মতো কাজ করার যথেষ্ট জায়গা নেই। তাদের বাড়তি জায়গা ভাড়া নিতে হয়েছে বা কিনতে হয়েছে। একই বাড়িতে একাধিক ব্যক্তি ওয়ার্ক ফ্রম হোম করলে জায়গার সমস্যা আরও বাড়ছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের অনলাইন ক্লাসের জন্যও একই ধরনের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। বেড়েছে আসবাবপত্র, পেন ড্রাইভ সহ স্টোরেজ ডিভাইস ইত্যাদি নানা ব্যয়।

মালিকপক্ষের কিন্তু ব্যয় কমছে
সম্ভাব্য ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ কিন্তু ওয়ার্ক ফ্রম হোম ব্যবস্থায় সায় দিচ্ছে, কারণ তাদের খরচ বেশ খানিকটা কমছে। মালিক বা কর্পোরেটদের অফিসের জায়গা কম লাগছে, অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট বা টেলিফোনের খরচও খানিকটা কমেছে। কর্পোরেট অফিসে কম সংখ্যক হাজিরায় আরও নানা খরচ কমে। এসব কারণেই কর্মচারীদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা মোটেই অযৌক্তিক নয়।
বাড়বে কি স্টান্ডার্ড ডিডাকশন?
২০১৮-১৯ থেকে আবার স্টান্ডার্ড ডিডাকশনের সুবিধা পান বেতনভুক শ্রেণির করদাতারা। তবে তাদের পুরনো নিয়মে আয়করের হিসেব কষতে হবে। স্টান্ডার্ড ডিডাকশনের সুবিধা নিলে চিকিৎসা, যাতায়াতের খরচ ইত্যাদি সুবিধা বন্ধ করা হয়েছিল। এখানেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম কর্মীদের স্টান্ডার্ড ডিডাকশনে প্রাপ্য ছাড়ের বাড়তি কিছু আয়করের সুবিধার কথা জোরালো ভাবে উঠছে। তাছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে স্টান্ডার্ড ডিডাকশনের পরিমাণও বাড়াবার প্রয়োজন দেখা গিয়েছে।

ব্যক্তিগত ভাবে অনেকের সঙ্গে কথা বলেও এই সমস্যাটার কথা লেখক জেনেছে। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে আমি ৬৩ জন ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা মানুষের সঙ্গে কথা বলি। তাঁদের ৯১ শতাংশ বলছেন, অসুখ-বিশুখের ভয় না থাকলে তাঁরা অফিসে গিয়েই কাজ করতে আগ্রহী। এঁরা বলছেন, অফিসে গিয়ে কাজ করলে প্রতি মাসে বেশ কিছু টাকা বাঁচবে। তাছাড়া অফিসে সকলের সঙ্গে মিলে কাজ করার একটা সামাজিক উপযোগিতার কথাও বলেছেন এঁদের অনেকেই। যেসব কর্মচারীরা ওয়ার্ক ফ্রম হোমেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন, তাঁরা সকলেই বয়স্ক এবং খানিকটা অসুস্থ বা করোনা ভয়ে বেশ ভীত।
সম্প্রতি ডেলয়েট ইন্ডিয়ার পার্টনার সরস্বতী কস্তুরিয়াঙ্গন ও অন্যরা সম্প্রতি বলেছেন, অতিমারি সামলাতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম একটি জরুরি পন্থা। কর্পোরেট কর্তাদের অনেকেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম আরও বেশ কিছু দিন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই মত দিচ্ছেন। সেই পদ্ধতিকে উৎসাহ দিতে এই শ্রেণির কর্মীদের আয়করে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবার সময় এসেছে।