প্রতি বছর এপ্রিল মাসের তৃতীয় শনিবার “বিশ্ব সার্কাস দিবস” পালন করা হয়। সার্কাস শিল্পের প্রসার এবং সমাজে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত অপেশাদার এবং পেশাদার শিল্পীদের সম্মানে এই দিনটি পালন করা হয়।
“জিনা ইঁহা, মরনা ইঁহা, ইসকে সিবা জানা কাঁহা।— মেরা নাম জোকার সিনেমার বিখ্যাত গান যেখানে রাজু জোকার তার জীবনের সমস্ত দুঃখকে বুকে চাপা দিয়ে মানুষকে হাসানোর কাজ করতেন। জীবনে প্রতিনিয়ত এমন পরিস্থিতি আসে যেখানে দুঃখকে চেপে রেখে হাসি মুখে চলতে হয়, অনেকটা জোকারের মতন। তাই সার্কাস আমাদের জীবনের কোথাও একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শিল্পীর চোখে ১৭৬৮ সালে ইংলন্ডে সার্কাসের একটা ছবি।
শীতকালে আমরা স্কুলে পড়ার সময় বাবার হাত ধরে সার্কাস দেখতে যেতাম সপরিবারে। মাঠের উঁচু ঢিবিগুলোতে যেখানে বসে আড্ডা চলতো সারাবছর, শীত পড়তেই ওই ঢিবির ওপর পরতো শামিয়ানার ছায়া।
টিকিট কাউন্টারে পাওয়া যেতো তিন-ধরনের টিকিট, কমদামে পিছনের সারিতে, তার থেকে একটু দামি সাইডে-মাঝখানে আর সামনে রয়্যাল সিট। ইয়া বড়ো বড়ো হাতি শুঁড়ে জল নিয়ে ‘ফোঁস’। সেই জলের ছিটে গায়ে লাগলে মনে হতো শান্তির জল।
থাকতো আগুনের জ্বলন্ত রিঙের মধ্যে দিয়ে বাঘ-সিংহের লাফানো, ভাল্লুকের বল খেলা, কাকাতুয়ার সাইকেল চালানো, জলহস্তীর বাঁধাকপি খাওয়া, ব্যালেন্সের খেলা, জোকারের হাস্যরস, হান্টারের শপাং, বাইক আর ট্রাপিজের গা-শিহরণ খেলা… কত্তো কিছু।

ফিলিপ অ্যাস্টলি, ঘোড়া নিয়ে খেলার জনক।
সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে নিয়ম। বিশ্বের অনেক দেশে সার্কাসে জীবজন্তুর খেলা বন্ধ হয়েছে। আমাদের দেশেও বাঘ-সিংহ, হাতি, ঘোড়া, জলহস্তী, কুকুরের খেলা দেখানো বন্ধ করেছে “Animal Welfare Board of India (AWBI)”.
খুব অল্প বয়সে মা হাতির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় বাচ্চা হস্তীশাবককে। এরপর শাবকটিকে বারো ফুটের একটি শালকাঠের খাঁচায় আটকে রাখা হয়। দড়ি দিয়ে শরীর পেঁচিয়ে রাখা হয়, এমনকি কোথাও কোথাও চামড়া ঘষে তুলে দেওয়া হয় বাঁধনের জ্বালা বোঝানোর জন্য। লোহার আঁকশি লাগানো লাঠির আঘাতে শেখানো হয় কম্যান্ড। বালতি থেকে শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে থাকতো এই করুন কাহিনী।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ১৪ শতকে ইংরেজিতে প্রথম সার্কাস শব্দটি ল্যাটিন ‘circus’ থেকে পাওয়া যায়, যা গ্রীক κίρκος (কিরকোস) বা (krikos) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “বৃত্ত” বা “রিং”। ‘দ্য স্পেক্টাকুলিস’ বইতে খ্রিস্টান লেখক টারটুলিয়ান লিখেছেন— প্রথম সার্কাসের খেলাগুলি দেবী সার্স তার পিতা হেলিওস (সূর্য দেবতা) এর সম্মানে মঞ্চস্থ করেছিলেন। আবার বলা হয়, সার্কাসের জন্ম রোম সাম্রাজ্যে। সেই সময়ে, সার্কাস ছিল রোমানদের বিনোদনের প্রধান উৎস।

ভারতীয় সার্কাসের জনক বলা হয় কেরলের কিলেরি কুনাহিকান্নানকে।
আমরা যে ধরনের সার্কাস এখন দেখতে পাই তা ১৭৬৮ সালে এসেছিল। সেই সময়ে, ফিলিপ অ্যাস্টলি নামে ইংল্যান্ডের এক অশ্বারোহী ঘোড়ায় চড়ার নানান ধরনের কৌশল প্রদর্শন করতে শুরু করেন। ১৭৭০ সালে, অ্যাস্টলি তার অশ্বারোহী ইভেন্টগুলির মধ্যে অ্যাক্রোব্যাটিক স্কিল, জাগলিং শো এবং একজন ক্লাউন নিয়োগ করেছিলেন। এই কারণেই, অ্যাস্টলি “আধুনিক সার্কাসের জনক” হিসাবে পরিচিত হন। জন বিল রিকেটস নামের এক ইংরেজ সার্কাসটিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন। আমেরিকার প্রথম সার্কাস ১৭৯৩ সালে ফিলাডেলফিয়ায় সংঘটিত হয়েছিল।
২০০৬ সালে, মোনাকোর রাজকুমারী স্টেফানি মন্টে-কার্লোর আন্তর্জাতিক সার্কাস ফেস্টিভ্যালের সভাপতি হন। তিনি ২০১০ সালে “বিশ্ব সার্কাস দিবস” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল আমাদের ভাগ করা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সার্কাসের ভূমিকা প্রচার করা।

সার্কাস-কন্যা সুশীলাসুন্দরী ও লক্ষ্মী-নারায়ণের খেলা
ভারতে সার্কাসের প্রবর্তন করেন মহারাষ্ট্রের বিষ্ণুপন্থ ছাত্র। আনকাখোপ জেলার এই গ্রাম্য ছেলেটি রাজা কুর্দূওয়াদির আস্তাবলে ঘোড়ার পরিচর্যার জন্য নিযুক্ত ছিলো। দক্ষ অশ্বারোহী ছিলেন। তবে ভারতীয় সার্কাসের জনক বলা হয় কেরলের কিলেরি কুনাহিকান্নানকে।
আমাদের বাংলার সার্কাসের জনক বলা হয় ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিয়নাথ বসুকে। বাঙালির সার্কাস অভিযানে তিনি গগনচুম্বী সফলতা অর্জন করেন।
এখানে বহু দক্ষ বাঙালি পুরুষ ও মহিলা ক্রীড়াবিদ খেলা দেখাতো। এই সার্কাসের প্রধান আকর্ষণ ছিলো সুশীলা সুন্দরীর বাঘের সঙ্গে খেলা। বাঘের খাঁচায় ঢুকে রীতিমতো বাঘের সঙ্গে কুস্তি করতেন। বাঘের গর্জন থামানোর জন্য বাঘের মুখে মাথা অবধি ঢুকিয়ে দিতেন। এছাড়াও থাকতো বহু বাঙালি কলাকুশলীদের প্রদর্শন, যাদের হাত ধরে ঘটেছিলো বাংলা সার্কাসের নবজাগরণ।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে পাল্টিয়ে গেছে মানুষের রুচি ও চাহিদা। সার্কাস শো-এর আকর্ষণ অনেকটাই পাল্টিয়েছে। বড়ো একটি সার্কাস পার্টির নিজস্ব সমস্যাও প্রচুর। সার্কাসের প্রধান আকর্ষণ পশুর খেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শারীরিক কসরতের খেলার উপর দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হচ্ছে। টাকা কম অথচ ঝুঁকি বেশি হওয়ার জন্য এই প্রফেশনে কলাকুশলীদের সংখ্যা ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে।
সময় বদলের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে বিনোদনেরও। আধুনিক কালের বাচ্চারা খেলাধুলা করে ঘাম ঝরায় কম, মন দেয় মোবাইল গেমে। সন্ধের পর সার্কাস ময়দান তাই এখন নীল আলোয় বুঁদ হয়ে থাকে। তবুও আজো ‘সার্কাস’ নামের মধ্যেই রয়েছে এক অদ্ভুত নস্ট্যালজিয়া। বেঁচে থাক আমাদের বিনোদনের এই মাধ্যম।
খুবই ভালো
বাহ ! সুন্দর তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।