| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনীতির ক্রম-রূপান্তর এবং কর্পোরেট পুঁজি (দ্বিতীয় পর্ব) : জয়ন্ত ভট্টাচার্য

Reporter
ডা. জয়ন্ত ভট্টাচার্য / ২৯৭ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৩ আগস্ট, ২০২১

১৯৫০-৭০-র দশক জুড়ে বিশ্বরাজনীতিতে দ্বিমেরু বিশ্বের জীবন্ত উপস্থিতি ছিল। প্রবল পরাক্রান্ত, আগ্রাসী ও মুক্ত পুঁজি এবং সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো ভিন্ন একটি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব— সমাজতান্ত্রিক বলে যার উপস্থিতি ছিল জনমানসে। দ্বিমেরু বিশ্বের উপস্থিতির জন্য রাজনৈতিক এবং সামাজিক একটি পরিসর তৈরি হয়েছিল যাকে বলতে পারি “তৃতীয় পরিসর”। বিশ্বের মানুষের স্বাভাবিক আশা-আকাঞ্খা এবং দাবী নিয়ে দর কষাকষির ক্ষমতা বেশি ছিল। পরবর্তীতে একমেরু বিশ্বের উদ্ভব এসবকিছুকে পরিপূর্ণভাবে বিনষ্ট করে দেয়— আজকের ভারত এর একটি প্রোজ্জ্বলন্ত উদাহরণ। এ সময়েই পৃথিবী জুড়ে শ্লোগান উঠেছিল— স্বাস্থ্য আমার অধিকার। আবার অন্যদিকে তাকালে প্রান্তিক অশিক্ষিত বুভুক্ষু মানুষের কাছে শিক্ষা এবং বই পৌঁছে দেবার আন্দোলন, শিক্ষার অধিকারের আন্দোলন জনচেতনায় চেহারা নিচ্ছিল। এর উদাহরণ লাতিন আমেরিকায় পাউলো ফ্রেইরে-র আন্দোলন। ব্রেখটের সেই বিখ্যাত যুক্তি যেন নতুনভাবে জন্ম নিল— “ভুখা মানুষ বই ধরো, ওটা তোমার হাতিয়ার”। যদিও এ পরিসরে এ বিষয়ে আর কোন আলোচনা সমীচীন নয়। বরঞ্চ আমরা একটু ইতিহাসে ফিরে যাই। দেখে নিতে চেষ্টা করি কিভাবে ধীরে ধীরে “সকলের জন্য স্বাস্থ্য”-র শ্লোগান স্বাস্থ্যপরিষেবার পণ্য চেহারায় রূপান্তরিত হল। কিভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেট পুঁজির চাপে এবং খোদ মেডিসিনের জগতের বিভিন্ন পরিবর্তন এ ঘটনা বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করলো, WHO হয়ে উঠলো অনুঘটক বা ঢাল।

ভুলে যাবার এক মনোজ্ঞ কাহিনী

ভারী কৌতুহলোদ্দীপক একটি কাহিনী বলছেন স্বয়ং একজন যাঁদের হাত ধরে আধুনিক বিশ্বের আন্তর্জাতিক দরবারে প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্যনীতি জন্ম নিয়েছিলো। ১৯৪৫ পর্যন্ত স্বাস্থ্য একটি “ভুলে যাওয়া” তথা “forgotten” বিষয় ছিলো — One interesting example is that health was “forgotten” when the Covenant of the League of Nations was drafted after the first World War. Only at the last moment was world health brought in, producing the Health Section of the League of the Nations, one of the forerunners of the present FAO, as well as WHO. (K. Evang, “Political, national and traditional limitations to health control”, in Health of Mankind eds. G. E. W. Wolstenholme and Maeve O’Connor  [CIBA Foundation Symposium], 1967, pp. 196-211) সেসময়ে মাত্র কয়েকটি দেশ ছিলো লীগ অব নেশনস-এ। আমেরিকা কখনো সদস্য-ই হয় নি, ১৯৩৩-এ জার্মানি বেরিয়ে যায়, সাত বছর সদস্য থাকার পরে জাপানও ১৯৩৩-এ বেরিয়ে যায়, ইটালি ১৯৩৭-এ, সোভিয়েট রাশিয়াকে বহিস্কার করে দেওয়া হয় ১৯৩৯-এ। ইভাং আরেকবার বিস্মিত হন — Who would have thought, therefore, that health would again be “forgotten” when the Charter of the United Nations was drafted at the end of the Second World War? ঠিক এ ঘটনাটিই ঘটেছিলো যখন বিশ্ব স্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ নিয়ে ১৯৪৫-এর বসন্তে সান ফ্রান্সিসকোতে জরুরী ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য-কে আলোচ্য তালিকায় আনা হয়। তিন জন মানুষ সেদিন উদ্যোগ নিয়েছিলেন — ব্রাজিলের তরফে ডাক্তার Paula Souza, চীনের তরফে ডাক্তার Szeming Sze এবং নরওয়ের তরফে ডাক্তার ইভাং স্বয়ং। ফলে এ বয়ানের গুরুত্ব এতো বেশী!

এখানে যেকোন জিজ্ঞাসু পাঠককে ভাবাবে, স্বাস্থ্যের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারেবারে ভুলে যাওয়া হচ্ছিলো কেন? সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তর হবে সম্ভবত বাণিজ্য হিসেবে স্বাস্থ্য কতোটা লাভজনক হতে পারে এবং কি পরিমাণ মুনাফা দিতে পারে তা তখনো অব্দি বহুজাতিক কোম্পানী এবং বিশ্বে প্রভুত্বকারী ইউরো-আমেরিকার দেশগুলোর মাথায় আসে নি, বোধ করি ভালোভাবে নজরেও আসে নি।

২০০৫ সালে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীগুলোর পৃথিবীতে বিক্রীর পরিমাণ ছিল ৫০০ বিলিয়ন ডলার, ২০০৭-এ হল ৭১২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দু বছরে বিক্রী বেড়েছে শতকরা ৪০ ভাগেরও বেশী। (সূত্রঃ Adriana Petryana — When Experiments Travel, Princeton University Press, 2009) ২০১৮-তে এর পরিমাণ হবার কথা ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো। আরো গুরুত্বপূর্ণ হল এশিয়া এবং আফ্রিকায় ওষুধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বাজার বৃদ্ধির হার ১৭%, পূর্ব ইউরোপে ১১% এবং লাতিন আমেরিকায় ১০%। অথচ সমগ্র বিশ্বে এ হার মাত্র ৪%। আরেকটা তথ্য হল ২০০৫ সালে প্রযুক্তি-নির্ভর মেডিসিনের চাপে পড়ে ব্রাজিলকে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।

এরকম একটি লাভজনক বিনিয়োগের চিত্র যতোদিন না স্পষ্ট হয়ে ঊঠেছে, ততদিন অব্দি নিও-লিবারাল অর্থনীতির কান্ডারীরা স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিনিয়োগ কর্মে সেভাবে হাত লাগায় নি। ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকে স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ ও বিপুল মুনাফার ধারণা নির্দিষ্টভাবে দানা বাঁধতে শুরু করে। সাথে সাথে বদলাতে শুরু করে ১৯৪৫ সাল অব্দি আন্তর্জাতিক জগতে “forgotten” বিষয়টির চরিত্র। এক নতুন যাত্রাপথ জন্ম নেয় — ১৯৭৮ সালের আলমা আটা সম্মেলনের “সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা”-র (comprehensive primary health care) এবং “২০০০ সালের মধ্যে সকলের জন্য স্বাস্থ্য”-র বোধ থেকে ২০১৫-তে এসে অতিমাত্রায় বিক্রয়যোগ্য “স্বাস্থ্য পরিষেবা”-র পণ্য বাজারের বোধে প্রায় পূর্ণত রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া। অধুনা গবেষকেরা দেখিয়েছেন, আফ্রিকার যে দেশগুলোতে এবোলা (Ebola) এরকম মারনান্তক চেহারা নিল সে দেশগুলোতে IMF এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর চাপে জনস্বাস্থ্যখাতে ক্রমশ খরচা কমিয়ে প্রযুক্তি নির্ভর (যে প্রযুক্তি যেমন সিটি স্ক্যানার বা MRI কিনতে হয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে) স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়েছে। ফলে এবোলা যখন মহামারির চেহারা নিয়েছে তার সাথে মোকাবিলা করার মতো কোনরকম পরিকাঠামো এ দেশগুলোতে ছিল না।

আমাদের এ আলোচনায় আমরা চারটে বিষয় নিয়ে ভেবে দেখবো — (১) “সকলের জন্য স্বাস্থ্য”-র শ্লোগান কি করে স্বাস্থ্য পরিষেবার মুক্ত বাজারের অর্থনীতির আওতায় চলে এলো; (২) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সংহত ধারণা কিভাবে বেছে-নেওয়া (selective) স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণাতে রূপান্তরিত করা হল, যার ফলে ঝাঁ চকচকে অত্যন্ত দামী (নামীও বটে) পাঁচতারা হাসপাতাল বা নার্সিং হোম “ভালো স্বাস্থ্য”-র সমার্থক হয়ে উঠলো; এবং (৩) ক্লিনিক্যাল হেলথ বা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও এর চিকিৎসা এবং পাবলিক হেলথ বা জনস্বাস্থ্যের মধ্যেকার দার্শনিক অবস্থানগত পার্থক্য মুছে গিয়ে দুটোই একাকার হয়ে গেলো, এবং (৪) কিভাবে জনমানসে “ভার্টিকাল হেলথ” অর্থাৎ ব্যক্তিরোগীর রোগ ধরে চিকিৎসা প্রতিস্থাপিত করছে “হরাইজন্টাল হেলথ” অর্থাৎ জনস্বাস্থ্য বলতে যা বোঝায় সে ধারণাকে। একইসাথে আমরা নজরে রাখবো মেডিসিনের জগতে শিক্ষাক্রমের ক্রম-রূপান্তর এই সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে ত্বরাণ্বিত করলো এবং এ পরিবর্তনের একটি উপাদান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিল।

সলতে পাকানোর কাহিনী

আমরা গত শতাব্দির ৬০-৭০-এর দশকের কথা ভাবি। দীর্ঘকালীন উপনিবেশিকতার পরে এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর একটা বড় অংশ ধীরে ধীরে স্বাধীনতা অর্জন করছে। দুটি বিষয় এসব দেশের কাছে গুরুত্ব নিয়ে হাজির হল। একদিকে, নিজস্ব যা যৎসামান্য সম্পদ আছে (বিশেষ করে মানব সম্পদ) তার সর্বোচ্চব্যবহার করতে হবে; অন্যদিকে, যুদ্ধ-দারিদ্র্য-বুভুক্ষা-দীর্ণ অগণন মানুষের কাছে স্বাস্থ্যের ন্যূনতম সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। ১৯৬৭ সালে একটি গবেষণা দেখালো – Some developing countries have developed health care programmes at the most peripheral level to meet the health and development needs of the deprived populations. Each experience has followed a particular approach. China uses mass education programmes and “barefoot doctors” to deliver primary health services. (Amor Benyoussef, Barbara Christian, “Health care in developing countries”, Social Science and Medicine 1967, 11 (6-7): 399-408) এদের আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলা হল চীনে নগ্নপদ চিকিৎসক বা “barefoot doctors” এ সমস্যার অনেকটা সমাধান করেছে। এছাড়াও তানজানিয়া, কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং নাইজেরিয়াতে প্রায় একইরকম পদ্ধতিতে ফল পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীতে সূচনা হল প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণার। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই মেক্সিকোতে ডেভিড ওয়ার্নার-এর (সুবিদিত গ্রন্থ Where There Is No Doctor-এর লেখক) উদ্যোগে তৃণমূল স্তরে গ্রামের সাধারণ মানুষকে সামিল ও প্রশিক্ষিত করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশেই ওয়ার্নারের প্রভাবে জনস্বাস্থ্য আন্দোলন পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। আমাদের ভারতে শুরু হয়েছিল জামখেদ আন্দোলন যা পরে জনস্বাস্থ্য অভিযান-এর রূপ নেয়।

একেবারে হালে পৃথিবীর সবচেয়ে মান্য ও চিকিৎসক মহলে সর্বাধিক পঠিত নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ এমন মন্তব্য করা হয়েছে যে আমেরিকা থেকে আগত একজন পর্যটকের কাছে কিউবা “অবাস্তব” এবং “মাথা ঘুরিয়ে দেবার মনে হয়”। হুবহু জার্নালের ভাষায় বললে – For a visitor from the United States, Cuba is disorienting…Cuban health care system also seems unreal. There are too many doctors. Everybody has a family physician. Everything is free, totally free — and not after prior approval or some copay. The whole system seems turned upside down. It is tightly organized, and the first priority is prevention. Although Cuba has limited economic resources, its health care system has solved some problems that ours has not yet managed to address. [আমেরিক থেকে আগত একজন পর্যটকের কাছে কিউবা মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো…কিউবার স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টি কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়। প্রত্যেকের একজন করে পারিবারিক চিকিৎসক আছে। সমস্ত কিছু বিনামূল্যে — কোন ইন্সিউরেন্স কোম্পানির আগাম অনুমোদন ছাড়াই। সমস্ত ব্যবস্থাটি মনে হয় আপাদ-মস্তক উল্টে আছে। সমগ্র ব্যবস্থা সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত, এবং প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিরোধ বা প্রিভেনশন-এর ওপরে। যদিও কিউবার অর্থনৈ্তিক সামর্থ্য নিতান্ত সীমিত, এর স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা এমন কিছু সমস্যার সমাধান করেছে যা আমাদের ব্যবস্থা এখনো নজর করে উঠতে পারেনি।] (Edward Campion and Stephen Morrissey, “A Different Model — Medical Care in Cuba”, New England Journal of Medicine 2013, 368(4): 297-299)

মোদ্দা বিষয় হল, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৮-এর মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের বিভিন্ন রূপ তৈরি হতে থাকে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮-এর মধ্যে চীন সোভিয়েট রাশিয়ার সহযোগিতায় এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সমর্থনে হু-কে তৃণমূল স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রসারিত করা এবং রোগের ক্ষেত্রে সামাজিক ভূমিকার ব্যাপারে আরো বেশী যত্নবান ও সক্রিয় হবার জন্য চাপ দিতে থাকে। এক গবেষক দেখিয়েছেন (Anne-Emmanuel Birn, “The stages of international (global) health: Histories of success or successes of history?”, Global Public Health 2009, 4(1): 50-68), যদিও সোভিয়েট রাশিয়া ১৯৪৯-১৯৫৭ পর্যন্ত সময়ে হু-র সদস্য ছিলো না কিন্তু হু-র বাৎসরিক বাজেটের ৬% যোগাত এ দেশটি। ১৯৫৯ সালে সদস্য হবার পরে এর পরিমাণ বেড়ে হয় ১৩%।

১৯৭৮ — সকলের জন্য স্বাস্থ্য, ২০০০ সাল

১৯৭৮ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সেসময় অব্দি সবচেয়ে বড়ো সম্মেলন হল অবিভক্ত রাশিয়ার কাজাখিস্তানে, ৬-১২ সেপ্টেম্বর। ১৩৪টি দেশের প্রতিনিধি, ৬৭টি আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং বহুসংখ্যক অ-সরকারী সংগঠন এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলো। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO এবং শিশুদের আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF ছিল এ সম্মেলনের যৌথ আহ্বায়ক। উল্লেখজনকভাবে, চীন এ সম্মেলনে অংশ নেয় নি। ১৯৭৮-এ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব ছিলেন ডঃ হাফডান ম্যালার (Halfdan Mahler)। তাঁর দার্শনিক অবস্থানের ও চিন্তার একটি প্রতিফলিত চেহারাও বটে এ সম্মেলন। ইতিহাস বহু সময়েই নৈর্ব্যক্তিক হলেও ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে ব্যক্তির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ঐতিহাসিক সম্মেলনে ঘোষণা করা হল — Health for All by 2000 A.D (২০০০ সালের মধ্যে সকলের জন্য স্বাস্থ্য)। এ ঘোষণা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অভিমুখ ও গতিবেগের জন্ম দিলো। ২০০০ সালের মধ্যে সকলের জন্য স্বাস্থ্য ভীষণভাবে অধরা থেকে গেলেও বেশ কয়েকটি দেশে সরকারী স্তরে ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ-সরকারীভাবে comprehensive primary health care বা সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা ক্রমশ বেগবান হয়ে ওঠে। ডঃ ম্যালারকে আমরা আরেকবার দেখি ২০০০ সালে, বাংলাদেশের সাভারে। First People’s Health Assembly সংগঠিত হয়েছিল সাভারে। মজার ব্যাপার হল, comprehensive primary health care বা সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার কথা এ সম্মেলনে বলা হলেও একমাত্র ডঃ ম্যালার ছাড়া হু-এর তরফে আর কোন উচ্চপদস্থ কর্তা ব্যক্তি এ সম্মেলনে উপস্থিত হন নি। হু-এর মধ্যেকার বিভাজন সামনে আসতে শুরু করলো ২০০০ সালের মধ্যেই। এ সম্মেলনে আক্ষেপ করে বলা হল — The WHO must be an open and democratic organization that can also respond to the grass roots: listening to the people should not be difficult for Gro Harlem Brundtland, a former politician, and it is regrettable that she is not attending the People’s Health Assembly. Her success as director general depends on the growth of popular health movements all over the globe which will be able to back up her call to make health central to the development process. (“The People’s Health Assembly”, British Medical Journal 321 (2000): 1361-2)

একদিকে চীন থেকে কিউবা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য লাগাতার প্রয়াসের ফলিত চেহারা, হু-র তৎকালীন ডিরেক্টর জেনেরাল ডঃ ম্যালার-এর বিশেষ মতাদর্শগত অবস্থান, আবার অন্যদিকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির বর্তমান সর্বগ্রাসী শক্তি ও উপস্থিতির তুলনায় দুর্বলতর অবস্থান এবং একমেরু বিশ্ব না থাকা — সবকিছুর সামগ্রিক যোগফলে ও ফলশ্রুতিতে জন্ম নিল ১৯৭৮-এর সনদ। মোট ১০টি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট ভাষায় বলা হল — “that the attainment of the highest possible level of health is a most important world-wide social goal whose realization requires the action of many other social and economic sectors in addition to the health sector”। অর্থাৎ স্বাস্থ্য-কে অর্জন করা এবং একে রক্ষা করা আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষের মধ্যে একটি এবং এ লক্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের বাইরেও আরো অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ জড়িয়ে আছে। এক কথায় বলা যায় স্বাস্থ্য একটি ব্যতিক্রমহীনভাবে রাজনৈতিক বিষয়ও বটে। আরো বলা হল — The people have the right and duty to participate individually and collectively in the planning and implementation of their health care. অর্থাৎ একজন নাগরিকের (প্রজার নয়) প্রতিচ্ছবি এলো ঘোষণাতে।

ইংরেজি উদ্ধৃতি রয়েছে যথেষ্ট সংখ্যক আমার এই প্রবন্ধে। যেহেতু আমার আলোচিত বিষয়-সংক্রান্ত প্রায় সমস্ত তথ্যই ইংরেজিতে তাই সবক্ষেত্রে অনুবাদ সম্ভব হয়নি। যেখানে সম্ভব করে দিয়েছি। তা সত্ত্বেও পাঠকদের অসুবিধের জন্য দুঃখিত।

(চলবে)

লেখক : চিকিৎসক এবং প্রবন্ধাকার, ই-মেইল : drjayanta@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev