এবার আমরা প্রবেশ করবো ক্লিনিক্যাল হেলথ তথা ব্যক্তি রোগীর চিকিৎসার ধরন ও পাবলিক হেলথ বা জনসমষ্টির চিকিৎসার ধরনের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্য এবং মেডিক্যাল পাঠক্রমের আধুনিক চরিত্র বোঝার দুনিয়ায়। Lancet-এ প্রকাশিত পূর্বোক্ত প্রবন্ধের পর্যবেক্ষণ ছিল ক্লিনিক্যাল সেক্টর সাধারণভাবে জোর দেয় “specialist curative over health promotion or preventive primary care”-এ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি প্রবন্ধ — আমরা কি মেডিক্যাল শিক্ষার জগতে বুদ্বুদের বাজারে বাস করছি? (Scott F. Dowell, Jordan W. Taperro and Thomas R. Frieden, “Are We Living in a Medical Education Bubble Market?,” 2011, 364(4): 300-301)
এ প্রবন্ধের লেখকেরা বলছেন যে আমরা বর্তমানে বাজার অর্থনীতির সাধারণ নিয়মের মতো মেডিক্যাল শিক্ষার জগতেও আমরা একটি বুদ্বুদের বাজারে অবস্থান করছি। এর পরিণতিতে একটি সময় সমাগত যখন সে বুদ্বুদ ফেটে যাবে এবং “At the extreme, we will march down the debt-to-income-ratio ladder, through psychiatrists to cardiologists to orthopedists … until no one is left but the MBAs.”

মেডিক্যাল শিক্ষার এ চেহারা তো আমরা এ দেশেও প্রত্যক্ষ করছি। কেন ঘটছে এরকম ঘটনা? কেন গভীরভাবে বদলে যাচ্ছে মেডিক্যাল শিক্ষার ধরন-ধারণ? কেন পরিহার্য কিন্তু অবধারিত “অ-মানবিকীকরণ” ঘটছে বারংবার? সুজান ব্লক এবং অ্যান্ড্রু বিলিং কয়েক বছর আগে একই জার্নালে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন “মৃত্যু থেকে শিক্ষা” শিরোনামে। (Susan Block nd Andrew Billing, “Learning from Dying,” New England Journal of Medicine 2005, 353(13): 1313-1315) এ প্রবন্ধে তাঁরা হাসপাতালের ওয়ার্ডের একের পর এক উদাহরণ তুলে ধরে দেখিয়েছিলেন যে বাস্তবে শেখানো শিক্ষাক্রমের বাইরে থাকে লুকিয়ে-থাকা তথা “informal or hidden curriculum”। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান সময়ের মেডিক্যাল শিক্ষার এই “hidden curriculum” এবং “especially the disease-centered, impersonal, high-throughput clinical years … still tends to undermine the best intentions of students and faculty members and the best interests of patients and families.”
আরও সাম্প্রতিক সময়ে নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে “How Medical Education is Mising the Bull’s Eye” (জুন ২৫, ২০২০)। এ প্রবন্ধে বলা হয়েছে— “Medical education is missing the bull’s-eye. The current standardized, homogeneous representation of white males in medical education is exclusionary and puts patients of color and women at risk for adverse health outcomes.” মেধাবী, আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন চোখে নিয়ে যে ছাত্র সমাজ মেডিক্যাল শিক্ষার জগতে প্রবেশ করে তারা ক্রমাগত এই অ-মানবিক শিক্ষাক্রম আর বাজারী হিংস্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বুদ্বুদের বাজারের মধ্য দিয়ে সুদীর্ঘ যাত্রা করে একজন পরিশীলিত ব্যবসায়িক চিকিৎসা-পরিষেবা বিক্রেতা হয়ে ওঠে। এ ট্র্যাজেডি কার? ছাত্রদের? সমাজের? চিকিৎসকের? রাষ্ট্রের? নাকি সম্মিলিতভাবে সবার?

এখানে আধুনিক মেডিসিনের জ্ঞানতত্ত্ব (epistemology) এবং ontology-র সাথে মেডিসিনের ছাত্র-ছাত্রীদের এক অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক জেরোম গ্রুপম্যান তাঁর পরিণত জীবনের উপলব্ধির কথা জানাচ্ছেন (যার কোন ভালো বাংলা করা যায় না) — I still find myself unable, except in retrospect, to retrieve the language of my youth and speak about “a great case.” It is as if medicine at this stage of my life has split into two streams— a current of marvelous biology and an undertow that pulls at the soul. From the bank where I stand, it is hard to imagine that these two streams can ever again flow as one. (“A Great Case”, New England Journal of Medicine, November 11, 2004 (351): 2043-2045)
আরেক বিখ্যাত লেখিকা জানান মৃত্যু ও বার্ধক্য-কে যদি নার্সিং হোম বা হাসপাতালে নির্বাসিত করতে হয় তাহলে — ways must be found to de-medicalize the final weeks or days, to nurture the dying and those who love them, an by this means to nurture ourselves. The real truth of healing lies in the nurture. (Sherwin B. Nuland, How We Die, New York, Vintage Bokks, 1993)
এ পথে আলো জ্বেলে
অথচ পাবলিক হেলথ-এর জগতে ডেভিড ওয়ার্নার বা এদেশের বিনায়ক সেন বা আরো অনেক ব্যক্তি বা সংগঠিত চিকিৎসকদের মতো নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসকেরা আছেন। এদের কাছে জনস্বাস্থ্য একটি অস্তিত্ত্বগত দার্শনিক অবস্থান। হু-র ২০০৫-এর “Make every mother and child count” রিপোর্টের মতাদর্শ ও তার পরিব্যাপ্ত রূপ বহুলাংশে মনে প্রাণে গ্রহণ করেন এঁরা।

আমাদের নির্ভুলভাবে বোঝা প্রয়োজন, জনস্বাস্থ্যের দর্শন একটি মূলগতভাবে ভিন্ন অবস্থান। এটা কোন মেডিক্যাল শিক্ষার বুদবুদের বাজার নয় বা এখানে কোন লুকনো শিক্ষাক্রম নেই। এখানে সবকিছুই অবারিত খোলা এবং পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ। নিজের নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন-চর্যা এবং সর্বোপরি পড়শি-চেতনা ধরে আছে ভারতের মতো আরো বহু দেশের অসমসত্ত্ব বিপুল জনসমষ্টিকে। এই বিশেষ অবস্থান বুঝতে না পারলে মেডিক্যাল কলেজের প্রশিক্ষণ শেষ করা মাত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী চিকিৎসক হয়ে ওঠা যায় না। মুক্ত বাজারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, বিশেষ করে এর উপজাত social psyche, এ দুয়ের প্রভেদ মুছে দিতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু খোদ আমেরিকার বুকেই চিকিৎসকদের একাংশও ভিন্নতর উপলব্ধিতে পৌঁছন – We find it terribly and tragically inhumane that Mr. Davis and tens of thousands of other citizens of this wealthy country will die this year for lack of insurance. (“Dead Man Walking”, New England Journal of Medicine 369 (2013): 1880-81)
জনস্বাস্থ্যের দর্শন একটি ভিন্ন অবস্থান। এটা কোন মেডিক্যাল শিক্ষার বুদবুদের বাজার নয় বা এখানে কোন লুকনো শিক্ষাক্রম নেই। এখানে সবকিছুই অবারিত খোলা এবং পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ। নিজের নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন-চর্যা এবং সর্বোপরি পড়শি-চেতনা ধরে আছে ভারতের মতো আরো বহু দেশের অসমসত্ত্ব বিপুল জনসমস্টিকে। এই বিশেষ অবস্থান বুঝতে না পারলে মেডিক্যাল কলেজের প্রশিক্ষণ শেষ করা মাত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী চিকিৎসক হয়ে ওঠা যায় না। মুক্ত বাজারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, বিশেষ করে এর উপজাত social psyche, এ দুয়ের প্রভেদ মুছে দিতে বদ্ধ পরিকর।

ঠিক এ ঘটনাটিই আজ ঘটছে। আমরা এর অনিবার্য শিকার হয়ে পড়ছি অধিকাংশ সময়ে। এর মুখোমুখি জ্ঞানতাত্ত্বিক সংগ্রাম আমরা গড়ে তুলতে পারবো কিনা বা কতোটুকু সাফল্য অর্জন করবো তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু আশু কাজ হল সমস্যাটিকে নিবিড়ভাবে বোঝা।
দানবীয় বহুজাতিক কোম্পানী এবং হিংস্রতম, আগ্রাসী কর্পোরেট পুঁজির কাছে মানুষ শব্দটির ততক্ষণই মূল্য আছে যতক্ষণ সে মুনাফা দিতে পারে। এজন্য ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা, দেহ ও মন থেকে অসুস্থতাকে বিযুক্ত করে দেখে কেবলমাত্র অসুখের জন্য সমস্ত ওষুধ ও প্রযুক্তি তৈরি হয়ে চলছে সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য, মেডিক্যাল শিক্ষাক্রমও বিপুল্ভাবে প্রভাবিত হয়। ৩০ লক্ষ ইয়েমেনী কিংবা ইয়েমেনের একটি প্রজন্ম নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এ দানবদের কাছে কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়।
এরপরেও বলার থাকে। আমেরিকায় গ্রামীণ চিকিৎসকের ঘাটতি নিয়ে হাহাকার উঠেছে। ২০১৯-এর জুলাই মাসে NEJM-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে “Implications of an Aging Rural Physician Workforce” বলা হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে (আমেরিকার) “Limited access to physicians can reduce access to preventive care and exacerbate unmet health needs, leading to costly hospitalizations and poor health status.” বলা হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ৬৬% ঘাটতি রয়েছে চিকিৎসকের। বলা হচ্ছে— “In 2030, residents of rural areas will have access to one third as many physicians per capita as their suburban and urban counterparts will.”

ঠিক একই কথা প্রযোজ্য ভারতের ক্ষেত্রেও। ২০১৫ সালের একটি প্রবন্ধে রমন কুমার দেখিয়েছিলেন — “বর্তমানে ৩৮০-র বেশি মেডিক্যাল কলেজ-সম্পন্ন (পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক) ভারতে বছরে ৫০,০০০-এর বেশি এমবিবিএস ডাক্তার তৈরি হচ্ছে। যে দেশে আমরা হেলথকেয়ার প্রফেশনালদের ঘাটতি নিয়ে কথা বলে চলি সেখানে নতুন করে তৈরি হওয়া ডাক্তারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হয় উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেনা কিংবা কর্মহীন। ২০৩০ নাগাদ ভারতবর্ষে আরও ১০,০০,০০০ ডাক্তার যুক্ত হবে। বর্তমানে বছরে ৫০,০০০ করে ডাক্টার তৈরি হচ্ছে যারা dysfunctional হয়ে থাকবে এবং ১৩০ কোটির দেশে কোন কাজ পাবেনা।” (“The leadership crisis of medical profession in India: ongoing impact on the health system”, Journal of Family Medicine and Primary Care, Apr-June 2015; 4(2) : 159-61)
আমেরিকান মডেলে অসাম্য এবং নিরুপয়তার কথা বারে বারে ধরা পড়ছে। অর্থনীতির জোরে ওরা এখনো অব্দি খানিকটা সামাল দিতে পারছে। ভারতবর্ষ নির্ভুল্ভাবে সেদিকেই যাত্রা করছি। জনতার স্বাস্থ্যের এবং, বিশেষ করে, সজীব প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধ্যমতো আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হবে, জোরালো দাবী তুলতে হবে। তা নইলে অর্থনীতির মতোই আমাদের স্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎও অসুরক্ষিত, অনিশ্চিত।
ইংরেজি উদ্ধৃতি রয়েছে যথেষ্ট সংখ্যক আমার এই প্রবন্ধে। যেহেতু আমার আলোচিত বিষয়-সংক্রান্ত প্রায় সমস্ত তথ্যই ইংরেজিতে তাই সবক্ষেত্রে অনুবাদ সম্ভব হয়নি। যেখানে সম্ভব করে দিয়েছি। তা সত্ত্বেও পাঠকদের অসুবিধের জন্য দুঃখিত।
লেখক : চিকিৎসক এবং প্রবন্ধাকার, ই-মেইল : drjayanta@gmail.com
Ekdom sir
একদম ঠিক