দেশ বিদেশের রুপোলি পর্দায় কোথাও যেন সিগারেটকে দেখানো হয় পৌরুষ ও বুদ্ধিজীবীর প্রতীক হিসেবে। পর্দার সেলিব্রিটিরা, যারা ঐতিহ্যগতভাবে ধূমপানকে জনপ্রিয় করার জন্য বিজ্ঞাপনে আসেন, সমাজে বিশেষত কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই কু-অভ্যাসের বীজ বপন করানোর জন্য তারা দায়ী বলে বিবেচিত। শুধু তাই নয়, তারা নিজেরাই তামাকের বিপদ থেকে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।
বিখ্যাত অভিনেতা, পরিচালক, গায়ক, প্রযোজক এবং অন্যান্য সিনেমা-শিল্পীদের সংখ্যা যাঁরা তামাকজনিত রোগে অকাল মৃত্যুবরণ করেছেন বা অপরিসীম কষ্টে ভুগছেন তাদের সংখ্যা প্রায় প্রচুর। পরিচিত সেলিব্রিটি তামাক-শিকারের তালিকা সম্ভবত অন্যান্য অনুরূপ তালিকার মধ্যে সবচেয়ে বড়।
আমেরিকান অভিনেতা হ্যামফ্রি বোগার্ট (Humphrey DeForest Bogart) দুঃসাহসিক অভিনেতা হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তার সিগারেট মুখের ছবি ছিল ফ্যানেদের হার্টথ্রব। কিন্তু এই সিগারেটই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে দুর্বিষহ কষ্টের মধ্যে দিয়ে ইসোফেগাসের ক্যান্সারে মারা যান। শেষ জীবনে এতটাই কাশি হতো যে তিনি আর অভিনয় করতে পারেননি।

হ্যামফ্রি বোগার্ট
অ্যানিমেটেড চরিত্রের বিখ্যাত স্রষ্টা এবং ডিজনি চলচ্চিত্রের প্রযোজক ওয়াল্ট ডিজনি (Walt Disney) তার ফুসফুসের ক্যান্সার অপসারণের অস্ত্রোপচারের পরে তীব্র রক্তসঞ্চালন পতনের কারণে মারা গিয়েছিলেন। বিখ্যাত কার্টুন সিরিজ ফ্লিন্টস্টোনস-এ অভিনয় করা জিন ভ্যান্ডার পাইলও একই রকম শিকার হয়েছিলেন।
ভারতে, ‘মেরা নাম জোকার’ খ্যাতির উজ্জ্বল অভিনেতা-প্রযোজক রাজ কাপুর (raj kapoor) দাদাসাহেব ফালকে (Dadasaheb Phalke) পুরস্কারের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে দিল্লিতে পুরস্কার নিতে আসেন অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে। কোনরকমে পুরস্কার নিয়ে সোজা হাসপাতালে। রাজ্য কাপুরের ছিলো এমফাইসিমা। এক মাস লড়াই করে শ্বাসের ক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে মৃত্যু।
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির আরও অনেক লোক তামাক ধূমপানের কারণে সৃষ্ট অসুস্থতায় ভুগছিলেন। সমস্ত বিয়োগান্তক কাহিনীর অন্তরালে রয়েছে একমাত্র ভিলেন — তামাক।

ওয়াল্ট ডিজনি
মুখে গোঁজা সিগারেট, একমেবাদ্বিতীয়ম অ্যাটিটিউডে সেরা নায়ক উত্তম কুমারের (Uttamkumar) অল্প বয়সে মৃত্যুর কারণ এই সিগারেট।
এছাড়া এই দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন অনেক গায়ক, সুরকার, ডিজাইনার, কোরিওগ্রাফার, লেখক, পরিচালক এবং প্রযোজক। এছাড়াও ইতিহাসবিদ, লেখক, দার্শনিক, নির্বাহী, রাজনৈতিক নেতা এবং রাজারা রয়েছেন যারা ধূমপানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে হেরেছেন। আইনস্টাইন পাইপ হাতে ক্লাসে পড়াচ্ছেন, চার্চিল চুরুট ছাড়া মিটিংয়েই বসতে পারেন না…. সিগারেট যেন বুদ্ধিজীবীর অহংকার।
আমাদের বাংলায় তামাক সেবনকারীর অনুপাত প্রচুর। এর মধ্যে ধূমপায়ীরা (সিগারেট, বিড়ি, পাইপ, হুকো) যেমন আছে, তেমনি আছে ধোঁয়াবিহীন (খৈনি, জর্দা, গুটখা) তামাক সেবনকারি। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ব্যবহার করার ফলে জিভ, মাড়ি, গলা, খাদ্যনালীর ক্যান্সারের প্রকোপ বেড়েছে। আজকাল মধ্যবয়সীদের যে হৃদরোগ দেখা যায় তার প্রধান কারণ তামাক আর ডায়াবেটিস। ধূমপান করলে সব অসুখের প্রবণতা বেড়ে যায়।
এনএফএইচএস-৫ (National Family Health Service) রিপোর্ট বলছে, তামাক সেবনকারী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের শতকরা অনুপাত মহিলাদের তুলনায় তিন চার গুণ বেশি। জর্দা বা দাঁত মাজার জন্য গুলের ব্যবহার নিম্নবিত্ত মানুষের ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে প্রায় সমান।

রাজ কাপুর
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ১৩-১৫ বছর বয়সী তামাক সেবনকারীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরীদের ব্যবধান সামান্যই। পশ্চিমবঙ্গের তিন লক্ষ ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ওরাল ক্যান্সারই প্রায় এক লক্ষ।
ঘরের ভেতরের দূষণের অন্যতম কারণ সিগারেট। প্যাসিভ স্মোকিং, অর্থাৎ বাড়িতে কেউ ধূমপান করলে সেই ধোঁয়া নাকে টেনেও স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে।
ধুমপায়ীদের প্রতি দু-জনের এক জন তার নির্ধারিত আয়ুর প্রায় ১৪ বছর আগেই মারা যান। প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়ে মারা যান বছরে প্রায় ৬ লক্ষ মানুষ।
অনেকেই বলেন, কম বয়সে ধূমপান করবো আর বয়স বাড়লে ছেড়ে দেবো। মনে রাখবেন, অল্প বয়সে যে সিগারেট আপনি খাচ্ছেন, বয়স বাড়লে তার প্রভাব খাবে আপনার শরীরকে। হুঁকো সম্পর্কে শোনা যায়, জলের মধ্যে দিয়ে ধোঁয়া আসে বলে ক্ষতিকারক নয়। এটা একদম বাজে কথা। এ নিয়ে একটা মজার গল্প বলি —
গ্রামের এক মোড়ল সব সিগারেট খোর লোককে একত্র করলেন। সিগারেটের অপকারিতা সর্ম্পকে বুঝানোর জন্য। প্রথমে তিনি একটি কাঁচের জারে সিগারেটের ধোঁয়া ঢুকালেন। তারপর ঐ জারে একটি পোকা ঢুকিয়ে দিলেন। … কিছুক্ষণ পর পোকাটি মারা গেল। তারপর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এ থেকে আপনারা কি শিখলেন?
এক সিগারেট খোর লোক দাঁড়িয়ে বললো, এ থেকে আমরা শিখলাম, “সিগারেট খেলে পেটের সব পোকামাকড় মারা যায়”।

উত্তমকুমার
কেউ কেউ বলেন, তামাক দিয়ে বানানো গুল বা মিশ্রি দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত ভালো থাকে, ব্যাথা কমে। এটিও ভুল কথা।
আমাদের সমাজে নানান গল্প, উপন্যাস, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে সিগারেটকে দেখানো হয় স্মার্ট, বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষের প্রতীক রূপে। তাইতো ব্যোমকেশ বক্সীকে জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজতে হয় বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিয়ে। শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক ক্যাপসান লিখেও অক্ষয় কুমার, শাহরুখ খান, অজয় দেবগনের মতো বিখ্যাত অভিনেতারা তামাক প্রস্তুতকারক সংস্থার বিজ্ঞাপন করেন। তাদের দেখে নকল করতে থাকে অন্ধ অনুরাগীদের দল।
জনসম্মুখে ধূমপান করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সমাজের প্রতি সকলের শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিৎ। আজ ৩১ মে, বিশ্ব ধূমপান বিরোধী দিবস। প্রত্যেকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করেই বলছি, নিজে সুস্থ থাকতে এবং পরিবারকে সুস্থ রাখতে যত তাড়াতাড়ি পারুন ধূমপান বা অন্য তামাকের নেশা ছাড়ুন।
তথ্যঋণ : গ্লোবাল অ্যাডল্ট টোব্যাকো সার্ভে, সম্পর্কিত জার্নাল এবং নিউজ আপডেট।
ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে সত্যিই ক্ষতিকারক।
একদম।
প্রয়োজনীয় লেখা। সকলের পড়া দরকার।
থ্যাংক ইউ ❤️