মঙ্গলবার রাষ্ট্রসংঘের তরফে প্রকাশ করা রিপোর্ট থেকে জানা গেল, বিশ্বের জনসংখ্যা ৮০০ কোটি ছাড়িয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৭৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৪০০ কোটি পেড়িয়েছিল। তার মানে মাত্র ৪৮ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেল। এরপর ২০১১ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছাড়ায় ৭০০ কোটি। অর্থাৎ ১১ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ কোটি বেড়েছিল। মঙ্গলবারের ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা সাড়ে ৮০০ কোটি হবে। আর ২০৫০ সালে হবে ৯৭০ কোটি। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি যদি এই হারে বাড়তে থাকে তাহলে কি পৃথিবী বাসযোগ্য থাকবে? অনেকেই মনে করেন, জনসংখ্যা এই হারে বৃদ্ধি পেলে জলবায়ুও আরও দ্রুত হারে পরিবর্তীত হতে থাকবে এবং তার ক্ষতিকর প্রভাবও বাড়বে সমান তালে। ফলে ৮০০ কোটি মানুষের এই পৃথিবী আরও বাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে৷
কারও কারও কথায় জানা যাচ্ছে, গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় অনেক কমেছে৷ জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সারা হার্টগ জানাচ্ছেন, সারা পৃথিবীতেই শিক্ষার প্রসার আগের তুলনায় বেড়েছে, এর ফলে মেয়েদের সচেতনতা বেড়েছে, তাছাড়া মানুষ আগের থেকে অনেক বেশি করেই পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে শিখেছে৷ মানুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় আস্থা রাখায় জন্মনিয়ন্ত্রণে নানা উপকরণের প্রয়োগ বেড়েছে৷ এই কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আগের থেকে কম এমনটাই লক্ষ্য করা গিয়েছে৷ যদিও অনেকের মত, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমার কথা বলা হলেও বাস্তবে কিন্তু বাড়ছে৷ সারা হার্টগ অবশ্য মনে করেন, চিকিৎসা শাস্ত্রের অগ্রগতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি আগের থেকে বৃদ্ধি না পেলে ১৯৫০ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সারা বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু যে ২৫ বছর বেড়েছে, তা কখনোই সম্ভব হতে না৷ পাশাপাশি জাতিসংঘের এক হিসেব জানাচ্ছে, জনসংখ্যা ও গড় আয়ু বৃদ্ধির এই হার বজায় থাকলে ২১০০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ১১০০ কোটি!

অনেকেই বলেন সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং এশিয়ার এক অংশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি, তাঁরা এই দুটি অঞ্চলকে সারা বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির জন্য অনেক বেশি দায়ী করেন৷ উল্লেখ্য, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলেই গোটা দুনিয়ায় গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ ও প্রাকৃতিক সম্পদহানি বাড়ছে, যার ফলে পরিবেশ দূষণের সার্বিক পরিস্থিতিও দ্রুত গতিতে ভয়ংকর হয়ে উঠছে৷ তবে সাম্প্রতিককালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ ধনী দেশে রেফ্রিজারেটর, গাড়ি, টেলিভিশন, এসি ইত্যাদির ব্যবহার অনেক বেশি। বস্তুতপক্ষে পরিবেশ দূষণের জন্য ওইসব দেশের দায়ও অনেক বেশি৷ গবেষণা এও জানাচ্ছে, আফ্রিকার ২১ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ নাইজেরিয়ার আম জনতার মতো যদি বিশ্বের সবার জীবন যাপন হত তাহলে বর্তমান বিশ্বের ৭০% প্রাকৃতিক সম্পদ বছরে ব্যবহৃত হত৷ এশিয়া এবং বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ ভারতেরও খুব কম মানুষেরই নিজের রেফ্রিজারেটর, গাড়ি, টেলিভিশন ও এসি আছে৷ তাই বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষ গড়পড়তা ভারতীয়দের মতো জীবনযাপন করলে বছরে বিশ্বের সর্বোচ্চ ৮০% প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার হত৷ ৮০০ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে প্রকৃতি যেখানে ধুঁকছে, জনসংখ্যা ১১০০ কোটি হলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াতে পারে?
এবার আমাদের দেশের কথা- রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সালের মধ্যেই ভারত জনসংখ্যা চিনকে টপকে যাবে। মাত্র এক বছর পেরলেই ভারতের জনসংখ্যা গোটা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হবে। এই মুহূর্তে ভারত এবং চিন দুই দেশের জনসংখ্যাই ১৪০ কোটির বেশি। তার মধ্যে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার চিনের থেকেও বেশি। ‘মাত্র একটি সন্তান’- এই নীতিতে চলে চিন গত কয়েক বছরে জনসংখ্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু ভারতে কি এই নীতি চালু করা সম্ভব। এমনিতেই জনসংখ্যার ভারে ভারতের অবস্থা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পরিবার পরিকল্পনা নীতিও যে যথেষ্ট চালু সেকথাও বলা যাবে না। এর উপর রয়েছে খাদ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সমস্যা। যা নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতি মুহুর্তে কঠিন লড়াই করতে হয়। দিন দিন কমছে চাষযোগ্য জমি। তার ওপর জনবিস্ফোরণ। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে ভারত যে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হবে তা বলাই বাহুল্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ভারতকে যে সমস্ত সমস্যার সামনে পড়তে হবে তা দেশে দ্রুত আর্থিক উন্নতি ঘটলেও মোকাবিলা করা কঠিন। তবে উদ্বেগের পাশাপাশি আশার কথা এই যে ২০২১-র সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের মহিলাদের সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা সামান্য হলেও কমেছে। বিগত কয়েক বছরের শতাংশের হিসেব অনুযায়ী মহিলা পিছু এই সংখ্যা ছিল ২.১। কিন্তু গত বছরের হিসেব অনুযায়ী, তা কমে দাঁড়িয়েছে ২-তে।