‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে, স্মৃতি যেন হৃদয়ের বেদনার রঙে রঙে ছবি আঁকে….’
আজ ২১ নভেম্বর ‘বিশ্ব টেলিভিশন দিবস’। বিগত শতাব্দীর এক বিস্ময়কর আবিষ্কার যা কিনা বিশ্বসমাজকে অভূতপূর্বভাবে বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের সঙ্গে টেলিভিশন (টিভি) এখন মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বকে গৃহে উপস্থিত করছে, এর ফলে পৃথিবী আজ পরিণত হয়েছে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এ। জন লগি বেয়ার্ড, স্কটল্যান্ডীয় ইঞ্জিনিয়ার যিনি বিশ্বের প্রথম কার্যক্ষম ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল টেলিভিশন উদ্ভাবন করেন ১৯২৬ সালে। সাদা-কালো ছবি বৈদ্যুতিক সম্প্রচারে পাঠাতে সক্ষম হন। স্কটিশ বিজ্ঞানী বেয়ার্ড যখন সর্বপ্রথম টেলিভিশন উদ্ভাবন করেন তখন তা বানাতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন পুরনো হ্যাটের বাক্স, এক জোড়া কাঁচি, কয়েকটা মোটা সুঁই, বাইসাইকেলের লাইটের লেন্স, চা পরিবহনের বাক্স, আঠা আর একটু মোম।
এরপর ১৯৩৬ সালে ফিলিপিনস-এ জন্মগ্রহণকারী মার্কিন মিডিয়া প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবর্গ এর কৃতিত্বে প্রথম টিভি সম্প্রচার করে বিবিসি। বাণিজ্যিকভাবে ১৯৪০ সালে টেলিভিশন চালু হয়। গ্রিক শব্দ ‘টেলি’ অর্থ দূরত্ব, আর ল্যাটিন শব্দ ‘ভিশন’ অর্থ দেখা। টিভি সারা বিশ্বের মানব সভ্যতাকে যে এক সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করতে সক্ষম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত হয়। গত শতাব্দীর ৫০ এর দশকে টেলিভিশন গনমাধ্যমের ভূমিকায় উঠে আসে।

আশির দশকের গোড়ার কথা। আমাদের একটা চনমনে ছোটবেলার সাদাকালো টিভি ছিল।
আমাদের বাড়ীতে প্রথম চার-পা ওয়ালা শাটার টানা নীল কাঁচের সাদা কালো টেলেরামা টিভি বাবা নিয়ে আসে। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা আমার শৈশবের। ছিলাম তখন নিতান্তই ‘কুচো’। দুরদর্শন কেন্দ্র বাংলার চাঁদ ওঠা দেখলেই মন খুশিতে ভরে উঠতো। আমাদের ছাদের উত্তর–পূর্বে কোনার দিকে অ্যানটেনা লাগানো হয়েছিল এক টুকরো বাঁশের সাথে। বাঁশটার নিচে ধরে ঘুরিয়ে টিভির ছবি পরিষ্কার করার জন্য অ্যানটেনার দিকনির্দেশন করা হতো। পূর্ব–উত্তর কোনার দিকে দিলে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় চ্যানেল দূরদর্শন আমরা দেখতে পারতাম একেবারে পরিষ্কারভাবে। বুস্টার লাগানো কোন বাড়ীর দিকে ঘোরালে বাংলাদেশের অনুষ্ঠান আমাদের টিভিতে বেশি পরিষ্কার না হলেও দেখা যেতো। বাঁশটার নিচের মাটির অংশ ফাঁকা রাখা হতো অ্যানটেনা ঘোরানোর সুবিধার্থে।আর সরু সরু ডাটির এন্টেনার উপর কাক কিংবা পাখি যদি বসত, তাহলে ছবিটা কাকের মতোই হয়ে যেত। উঁচু বাঁশের মাথায় অ্যানটেনা দেখেই অনুমান করা যেত কার বাড়িতে টেলিভিশন আছে। অ্যানটেনা তখন ছিলো স্ট্যাটাস সিম্বল। রেডিও থেকে টিভিতে উত্তরণের যুগ।
কসমস ক্লাবের হয়ে কলকাতায় খেলতে এলেন কিংবদন্তি পেলে। সালটা ১৯৭৭। মোহনবাগানের সঙ্গে সেই খেলা দুরদর্শন সম্প্রচার করেছিল …যে সব বাড়িতে টিভি ছিল পাড়া র লোকেরা ঝেঁটিয়ে দেখতে এসেছিল। ক্লাবে ক্লাবে নতুন টিভি কেনার ধুম পরে গিয়েছিল। যাদের কাছে টিভি বিলাসিতা মনে হয়েছিল তারাও ছাদেতে এন্টেনা বসিয়েছিল। এই ভাবে বাঙালীরা টিভি বিপ্লব শুরু করেছিল এবং এই রূপ আরো সার্থক হয়েছিল ১৯৮৩ সালে ভারত ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার পর। রেকর্ড পরিমানে টিভির সেল হয়েছিল। এই রেকর্ড ও ভেঙে গেল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো ফুটবল বিশ্বকাপে। যে বছর অভিষেক হয়েছিল ফুটবলের রাজকুমার মারাদোনা। সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় খেলা দেখার জন্যই ছাপোষা মধ্যবিত্ত থেকে বিত্তবানেরা টিভির সাথে বিশেষ ভাবে পরিচিত হয়েছিল।

সেই সময়ে ‘বোকাবাক্স’র মধ্যে ভরা থাকতো নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আসর। সাপ্তাহিকী, হরেকরকম্বা, চিত্রহার (যা মায়ের সীতাহারের চেয়েও দামী ছিল আমার কাছে), নেপালী ভাষার অনুষ্ঠান, কৃষি কথার আসর–মাজরা পোকা, তেলা পোকা… আবহাওয়া দপ্তর–রাজেন্দ্রনাথ গোলদার। বলা হতো, গোলদার মহাশয়ের আবহাওয়া দপ্তরের ভবিষ্যৎবাণী নাকি উল্টো ভাবে শুনতে হয়, ‘আজ বৃষ্টি পড়বে’ বললে বুঝতে হবে, আজ ছাতা না নিয়ে বেরোলেও হবে …ইত্যাদি।
মনে আছে ছোটবেলায় আমরা বাড়ির সবাই একসাথে বসে রাতের খবর দেখতে দেখতে রোজকারের একঘেয়ে রুটি তরকারি খেতাম। বাবা মা গম্ভীর মুখে রাজনীতির খবর শুনতেন, জেঠতুতো দাদা চোখমুখ কুঁচকে একাগ্র হয়ে খেলার খবর শুনত, আর আমাকে পুরো খবরটাই শুনতে হত কারণ ওটা ছিল আমার সাধারণ জ্ঞান শেখার ক্লাস।
সেই সময়ের সিনেমার নির্মাণশৈলীতে ছিল নান্দনিকতা ও মাধুর্যতা। সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের রুচি ও মূল্যবোধের চেতনাকে ধারণ করে নির্মিত হতো বাংলা সিনেমা। সিনেমার গান ছিল প্রাণ রসে ভরপুর। সংলাপে ছিল মাধুর্যতা। দৃশ্যায়নে ছিল সুরুচির নান্দনিকতা। প্রতিটি সিনেমা যেন সমাজ জীবন থেকে তুলে নেওয়া একেকটি কাহিনি। সিনেমায় থাকত মেসেজ। যেসব মেসেজ তরুণ প্রাণে শিহরণ জাগাত। উজ্জীবিত করত।
যদিও বা তখন এত বুঝতাম না। একবার দাদুর পাশে বসে টিকটিকি লজেন্স খেতে খেতে ছদ্মবেশী সিনেমার গান হচ্ছে ‘মন নিয়ে কাছাকাছি তুমি আছো আমি আছি…’ সবে মাত্র মাধবী আর উত্তমকুমার ক্লোজ হয়েছে শক্তিমানের মত বাবা প্রবেশ করে ঘেঁটি ধরে ঘরে চালান করে দিয়েছিল।তখন আমার ‘বড়দের’ সিনেমা দেখার পারমিশন গ্রান্ট হতোনা।
সিনেমাতে তখন ছায়াদেবীকে দেখলেই মনে হতো দজ্জাল শাশুড়ী, সন্ধ্যারানী মানেই আজীবন সংসারের জন্য স্যাক্রিফাইস, সুখেন দাসের প্রবেশ হতো গান দিয়ে, সত্য ব্যানার্জী নীতিবান বাবার পাঠ করতেন….।
সেই সময় টিভিতে দেখা সবকিছুর মধ্যে আমার প্রিয় ছিল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমা।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী গল্প ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’ অবলম্বন করে এই সিনেমা। কিন্তু, গল্পের সঙ্গে সাজসজ্জা, গীত রচনা, আবহসঙ্গীত-সহ চিত্রনাট্যে পরিচালক সত্যজিৎ রায় কিছুটা বদল এনেছিলেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুদি কানু কাইনের ছেলে গুপী কাইন ক্রমে ‘গাইন’ হয়ে যায়।
মনে হতো এই সিনেমায়, গল্প ও গান মিলেমিশে এক সর্বজনীন ভাষা তৈরি করেছে, যা শ্রোতাকে আকর্ষণ করে। তাঁকে প্রাণের আরাম জোগায়, মনের মুক্তি দেয়। প্রমাণ করে সাধারণের কাছে পৌঁছতে, ছোটদের কাছে পৌঁছতে গান কী ভাবে সবার অস্ত্র হয়ে ওঠে— ‘সুরেরই ভাষা, ছন্দেরই ভাষা, প্রাণেরই ভাষা, আনন্দেরই ভাষা/ এ ভাষা এমন কথা বলে বোঝেরে সকলে, উচা, নিচা, ছোট, বড় সমান’।
বোকাবাক্সে বন্দি যেন পুরো দুনিয়া। এই টেলিভিশনের মধ্য দিয়েই পুরো পৃথিবীর সংস্কৃতি আর সভ্যতার সাথে পরিচয় ঘটছে শিশু কিশোরদের।
মানুষের জীবনের ঘটনা এইরকমই নানা ছন্দহীনতায় ভরা। নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে ছুটে চলা হাউই বাজির চেয়েও আশ্চর্য উত্থানপতন ঘটে জীবনের নানা গতিপথে। নির্মম দারিদ্র্য, প্রতিকুলতা, প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এগিয়ে চলা কোনও কোনও সাদাকালো জীবন আমাদের শেখায় রঙিন পাখনা মেলার কাহিনী। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় আজও বলতে ইচ্ছা করে…
‘দেখব এবার জগৎটাকে,—
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে…’।।
**Laboured by memory and consolidated from various sources.