মাতৃ বন্দনার কাল সমাগত। বেজে উঠেছে পুজোর ঢাক। দেবীর মহিষাসুর মর্দিনীরূপে পূজিতা হবেন। রাবণ বধের উদ্দেশ্যে দশরথ পুত্র রাজা রাম অকালে দেবীকে উদ্বোধিত করেছিলেন। তাই এই পুজো অকালবোধন। পরবর্তীকালে মধ্যযুগে বঙ্গদেশের রাজা কংস নারায়ণ রায় শুরু করেন অকালবোধনের রীতিতে পুজো। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে ৮৮৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসের মহাষষ্ঠী তিথিতে সেই দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল।
ঐতিহ্যগতভাবে বসন্তকালে দুর্গাপূজা হত তবে শরৎকালে দুর্গাপূজার শুরু নিয়ে একাধিক ইতিহাস রয়েছে। অকালবোধন শব্দটি কৃত্তিবাসের রামায়নে প্রথম পাওয়া যায়। যদিও বাল্মিকী রচিত রামায়নে এর কোন উল্লেখ নেই। কৃত্তিবাসের রামায়ণ অনুসারে অকালে মা দুর্গাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল বলেই অকালবোধন।
শ্রীশ্রীচন্ডীতে মহর্ষি মার্কণ্ডেয় তার শিষ্যকে বলেছিলেন মহাশক্তির কথা। ভারতে যুগের পরিমাপ করা হয় মনুর শাসন অনুসারে। এক এক মনুর রাজত্বকাল এক এক মন্বন্তর। এভাবে পুরান ও মহাকাব্যে আমরা ১৪ জন মনুর উল্লেখ পাই। এদের মধ্যে স্বারোচিষ মনুর কথা শ্রীশ্রী চন্ডিতে উল্লিখিত আছে। ব্রহ্মার মানসপুত্র স্বায়ম্ভুব, স্বায়ম্ভুব পুত্র প্রিয়ব্রত ও প্রিয়ব্রত পুত্র স্বারোচিষ। এই স্বারোচিষের জ্যৈষ্ঠ পুত্র চৈত্রের বংশে সুরথ নামে এক রাজা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাজা সুরথ পৃথিবীপালক, জনপ্রিয়, প্রজাবৎসল রাজা ছিলেন। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কোলা।
একসময় কাশ্মীর প্রান্তদেশের যবনরা রাজা সুরথের রাজ্য আক্রমণ করে। বিধ্বংসী যবনগণের সঙ্গে যুদ্ধে রাজা সুরথ পরাজিত হন। মনের দুঃখে তিনি নিজের রাজ্যে ফিরে আসেন। কিন্তু পরাজিত রাজা নিজ রাজ্যেও শান্তি পেলেন না। এখানে এসে তিনি আত্মীয় বন্ধু কর্তৃক প্রতারিত হতে থাকেন। তাকে দুর্বল জেনে রাজধানীতে দুষ্ট বলবান অমাত্য ও মন্ত্রীগণ শত্রুদের সাথে মিলিত হয়ে আক্রমণ করলেন। সকলের হাত থেকে রক্ষা পেতে সর্বস্য হারিয়ে রাজা সুরথ মৃগয়ার ছলে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন।
বনে প্রবেশ করে সুরথ মেধা ঋষির আশ্রম দেখতে পেলেন। সে আশ্রম বড় বিচিত্র। সেখানে হিংস পশুরা শান্তস্বভাব ধারণ করে বাস করছে। শ্বাপদদের সঙ্গে শিষ্যাদি-সহ বাস করছেন মেধা বা মেধস ঋষি। আশ্রমে প্রবেশ করলে ঋষি তাকে সাদরে আমন্ত্রণ করলেন এবং আশ্রয় দিলেন।
ঋষির আশ্রমে সমাদৃত হয়ে রাজা বনের মধ্যে ইতস্তত বিচারণ করতে লাগলেন। মন তার বড় অস্থির, চঞ্চল। মন স্থিরকরতে পারছেন না। কেবলই মনে হচ্ছে আমি বনে আছি বটে কিন্তু আমার পরিবার কেমন আছে, তাদের কোন সংবাদে আমি পাচ্ছি না। তারা কি এখনো অসৎ পথে চলছে? আমার কষ্টে অর্জিত ও সঞ্চিত ধন কী সঠিকভাবে খরচা হচ্ছে!
এমন সময় তার সঙ্গে দেখা হলো সমাধি নামক এক বৈশ্যের। সুরথ রাজার মতোই বনের মধ্যে তিনিও ইতস্তত ভ্রমণ করছিলেন। তাকে বিভ্রান্ত দেখে সুরথ এগিয়ে এসে বললেন, ‘হে ভদ্র তুমি কে? তোমার কুল জাত কি? এই বনের শোকমগ্ন হয়ে কি খুঁজে বেড়াচ্ছ?’
গভীর অরণ্যে রাজার সহানুভূতি সম্পন্ন বাণী শুনে দুঃখী বৈশ্য আনন্দিত হলেন।এতক্ষণ তিনি উন্মাদের মতো ভ্রমন করছিলেন। সবকিছু থেকেও তিনি আজ সংসারে একাকী, ধনের লোভে পরিতক্ত হয়েছেন সকলের কাছ থেকে। তাই তিনি সংসার ছেড়েছেন।
মানুষ দুঃখের কথা মনের মতো বন্ধুর কাছে ব্যক্ত করে শান্তি পায়। রাজা এবং বৈশ্য একে অপরকে তাদের নিজেদের দুঃখের কাহিনী শোনালেন। রাজা বললেন, ‘আমরা দুজনেই আত্মীয় বন্ধু কর্তৃক বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের লোভী আত্মীয় পরিজন আমাদের পরিত্যাগ করেছে। অথচ যারা পিতৃস্নেহ, পতিপ্রেম, স্বজনপ্রীতি বিস্মৃত হয়েছে, তাদের কথা বারবার স্মরণ আসছে কেন? কেন আমরা তাদের ভুলে যেতে পারছি না! এর কারন কি?’
এই রহস্য উন্মোচনের জন্য তারা উপস্থিত হলেন মেধস ঋষির কাছে। তাঁর জানতে চাইলেন কেন তাদের এই মানসিক অবস্থা। সমাধি বৈশ্য ও রাজা সুরথের কথা শুনে ঋষি তাদেরকে মহাশক্তির কথা বললেন। এই বিশ্ব মায়ার দ্বারা আবৃত করেছেন মহামায়া। তাঁকে তুষ্ট করলে তবেই মায়ার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব।
কে এই মহামায়া?
মেধস ঋষি বর্ণনা করলেন, এ এক বিচিত্র শক্তি — যিনি সম্মোহনের মাধ্যমে অত্যন্ত বিবেকী জীবের মনকেও মোহাবৃত করেন, তারা মমতাবর্তে ও মোহগর্তে পড়ে হাবুডুবু খায়। যেমন, মা পাখি নিজে আহার না করে কি মায়ায় তার শাবকের ঠোঁটে খাবার গুঁজে দেয়। মানব সন্তানদের পালনের সময় কত মায়ার বশবর্তী হয়ে চিন্তা করে এর সঙ্গে আমার চিরকালের সম্বন্ধ। পেঁচা যেমন রাতে দৃষ্টিহীন, ঠিক মোহগ্রস্ত জীব দৃষ্টিহীন হয়ে এই জগতে বিচারণ করে। মায়ার কারণে আপনাদের মন মমতায় পূর্ণ। তাই যাঁরা আপনাদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী নন, তাদের প্রতি মন আপনাদের আকৃষ্ট হচ্ছে। নিজেদের আবেগকে সংযত করতেও অসমর্থ হচ্ছেন।
যিনি সমগ্র চরাচর সৃষ্টি করেন, তিনি মহামায়া। তিনি প্রসন্ন হলে মানুষকে মুক্তিলাভের জন্য অভীষ্ট বরপ্রদান করেন। সেই মহাশক্তির বর্ণনায় মেধস ঋষি প্রথমে মহিষাসুরমর্দিনী, পরে চন্ড মুন্ড বধের কাহিনী শোনালেন। পরব্রহ্মের পট্টমহিষী হলেন দেবীচন্ডী। তাঁর আরাধনাই মানুষকে দুর্গতি থেকে ত্রান করে।
মেধস ঋষি মহাশক্তির রূপ বর্ণনা ও দেবী পূজা করার পরামর্শ দান করলেন। সমাধি বৈশ্য ও রাজা সুরথ সেই অনুযায়ী বসন্তকালে মাটির মূর্তি গড়ে পূজা করলেন দেবীর।সেই থেকে বাসন্তী পূজার সূচনা। পরে শ্রীরাম শরতের দেবী পূজা সম্পন্ন করলে তাই জনপ্রিয় রূপ লাভ করে।
তিন বছর ধরে তারা নিরাহারে, কখনো অল্পাহারে, পশুবলির মাধ্যমে সংযতচিত্তে দেবীকে তুষ্ট করলেন। দেবী পূজার পর দেবীর আশীর্বাদের সুরত রাজা রাজ্য ফিরে পেলেন। তিনি দেবীর কাছে তিনি ভোগ কামনা করেছিলেন। সমাধি বৈশ্য আত্মীয় পরিজনদের কাছে আর ফিরে যেতে চাইলেন না। তিনি যোগপথকে বেশি কাম্য মনে করলেন। দেবী তাকে সেই পথ দান করলেন।
সমাধি বৈশ্য ও রাজা সুরথ যেমন জীবনের সংকটকালে দেবীর আশ্রয় লাভ করে উদ্ধার পেয়েছিলেন। লঙ্কেশ্বর রাবণকে পরাজিত করতে শ্রীবিষ্ণুর রামকে চন্ডী বা দুর্গা বন্দনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই সময় রাবণের ভাই বিভীষণ রামকে একশো আটটি নীলকমল সহযোগে দেবী দুর্গার বন্দনা করার কথা বলেন। রামের নির্দেশে বজরংবলী দেবিদহা থেকে ১০৮টি নীলকমল এনে দেন। কিন্তু পুজোর সময় ১০৭টি নীলকমল পেয়ে চিন্তিত হন রাম। তখন তিনি একটি নীলকমলের পরিবর্তে নিজের নীলকমল সম চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হলে দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হন। শ্রীরামের আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাকে জয়যুক্ত হওয়ার আশীর্বাদ দেন। বিশ্বাস করা হয়, সাধারণ মানুষও সংকটকালে একাগ্র চিত্তে দেবীর স্মরন মনন কীর্তন করলে দেবী কৃপায় সংকটমুক্ত হবেন।
পৌরাণিক বর্ণনাকে ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় ডিসেম্বরের শেষ অংশ থেকে শুরু করে জুনের শেষাংশ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রাক বর্ষা পর্যন্ত (সূর্যের উত্তরায়ণের সময়) দেবদেবীর আরাধনার সবচেয়ে পবিত্র ও উপযুক্ত সময়। শাস্ত্র বলে উত্তরায়ণের সময় দেব-দেবীরা জাগ্রত ও সক্রিয় থাকেন। এই সময় দিন বড়, রাত ছোট হয়। শাস্ত্র অনুযায়ী চৈত্র মাসে দেবী দুর্গার আরাধনা নির্ধারিত।
অন্যদিকে শরৎকাল বা দক্ষিণায়নের সময়টি হল দেবদেবীর বিশ্রামের সময়। ভৌগলিক ব্যাখ্যা বলে, এই সময় পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে আর উত্তর গোলার্ধে আগমন ঘটে শীতের।ফলে উত্তরগুলোতে দিন ছোট ও রাত বড় হয়। পুরান অনুযায়ী, দক্ষিণায়নের সময় অসুরদের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। দুর্গাকে যেহেতু পুরানের প্রথার বাইরে গিয়ে দক্ষিণায়নের সময় শরৎকালে আবাহন করা হয়েছিল, তাই আজও এই পূজার রীতি অকালবোধন নামে পরিচিত।
অন্য একটি ধারণা বলে মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্র দুর্গার অকালবোধন করেন। অন্যদিকে রামের আবাহনের ঠিক আগে ব্রহ্মাও একই উদ্দেশ্যে অসময়ে দুর্গাকে আবাহন করেন। তাই আজও অকালবোধনের পুজোতে দেবী দুর্গার অষ্টশক্তির (উগ্রচণ্ডা, প্রচণ্ডা, চণ্ডোগ্রা, চণ্ডনায়িকা, চণ্ডা, চণ্ডবতী, চণ্ডরূপা এবং অতিচণ্ডিকা) পূজা করা হয়।
পৌরাণিক সব তথ্য বা গল্প সঠিক প্রচার/ প্রসারের অভাবে অজানা থেকে গেছে, ক্রমশই হারিয়ে যেতে বসেছে, তাই অসাধারণ প্রয়াস প্রশংসনীয়।
Ashis Kumar Banerjee রাজা সুরথ আর বৈশ্য সারথির গল্প আমরা ছোট বয়স থেকে মহালয়াতে শুনে আসছি। কিন্তু কি কারণে তাঁরা মহাশক্তির আরাধনা করেছিলেন, সেটা সঠিকভাবে শুনি না। তাই এই লেখার মধ্যে দিয়ে প্রয়াস করলাম কারণ বলার।
Onek kichu janlam