ভোট মিটলো, পালিয়ে গেল লম্বা সাদা দাড়ি, ঘূর্ণিঝড়ে রাত জাগবে পঁয়ষট্টির নারী! অর্পন দত্ত নামে একজন টুইটারে লাইনদুটো লিখেছিল। কার লেখা কি বিত্তান্ত জানিনা, তবে টুইটারে লাইনদুটো দেখে বেশ পছন্দ হলো। ঠিক এক বছর আগে ২০২০ সালের ২০ মে হয়েছিল আমফান। লন্ডভন্ড হয়ে গেছিল কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো সঙ্গী ছিল করোনা। ঠিক একবছর পরেও সেই একই দৃশ্য। নবান্নে এবার সেই হাওয়াই চটি পাহাড়ায়। সামনে ইয়াস/যশ/’ইআস’। ইআস শব্দের বাংলা করলে দাঁড়ায় মধুমতি। মনে আছে ঝড় তোলা বিখ্যাত গান ছিল আশাজীর কণ্ঠে—মনেরও নাম মধুমতি, আর এখন ঝড় মধুমতি বাংলার উপকণ্ঠে। যা বাংলা ভাষায় মধুমতি ফুল তাই আরবী ভাষায় ‘ইআস’।
যত ভয়ঙ্কর সব ঘূর্ণিঝড় কি বঙ্গোপসাগরেই হয়? বিশ্বের প্রতি চারজন মানুষের একজন থাকে বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলিতে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে রেখেছে যে তটরেখা, সেখানে বাস করে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। বিশ্বের ইতিহাসে যতসব ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হেনেছে, তার বেশিরভাগই হয়েছে এই বঙ্গোপসাগরে। ‘ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামের একটি ওয়েবসাইটে বিশ্বের ৩৫টি সবচাইতে ভয়ঙ্কর মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তালিকা রয়েছে। এই তালিকার ২৬টি ঘুর্ণিঝড়ই বঙ্গোপসাগরে। আবহাওয়াবিদ বব হেনসন বলেছেন, সামূদ্রিক জলোচ্ছাস সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে অবতল আকৃতির অগভীর বে বা উপসাগরে। ‘এরকম ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের টেক্সটবুক উদাহারণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগর।’ তবে বঙ্গোপসাগর-এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন সমূদ্রের উপরিতল বা সারফেসের তাপমাত্রা। বলছেন ভারতের আবহাওয়া দফতরের প্রধান ডি. মহাপাত্র। এটি পরিস্থিতিকে আরও বিপ্পজনক করে তোলে। তিনি এও বলছেন, ‘বঙ্গোপসাগর খুবই উষ্ণ এক সাগর’। কিন্তু বিশ্বের আর যে কোনও উপকূলের চাইতে বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূল এই ধরনের সার্জ বা জলোচ্ছ্বাসের সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে আছে’।

দাপুটে গোবিন্দরামের অখ্যয় কীর্তি ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’।
১৮৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়টার দিকে তাকালে দেখা যায় এই সময়ের মধ্যে ৪৮টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে আরব সাগরে, যার মধ্যে সাইক্লোনের আকার নিয়েছে ২৪টি। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন ঝড়ের সংখ্যা ছিলো ৩০৮টি, যার মধ্যে সাইক্লোনের আকার নিয়েছিল ১০৩টি। এঢ় থেকেই বোঝা যায় পশ্চিম থেকে ভারতের পূর্ব উপকূলকে কতটা বেশি ঝাপটা সইতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, আরব সাগরে তৈরি হওয়া ঝড়ের মাত্র ২৫ শতাংশ উপকূলে এসে আছড়ে পড়ে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের ক্ষেত্রে বর্ষার আগেকার সময়ে ৩০ শতাংশ এবং বর্ষা পরবর্তী সময়ের ঝড়গুলির ৫৮ শতাংশই স্পর্শ করে উপকূল। স্বাভাবিকভাবেই এই সব উপকূলের কাছে থাকা মানুষদের দুর্গতির শেষ নেই। গত দু’দশক ধরে এই সাইক্লোনের গতিপ্রকৃতিতে এসেছে অনেক নতুন পরিবর্তন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে ৩২ শতাংশ। শুধু ২০১৮ সালেই বঙ্গোপসাগর দেখেছে চারটি ঘূর্ণিঝড়। যেখানে আরব সাগরে ঝড়ের সংখ্যা তিন।
২
তখন কলকাতা শহরের বুকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জমানা চার দশকও হয় নি। সাহেবদের বুকের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন ছোট-বড়ো-মাঝারি মাপের জমিদারেরা। এদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন গোবিন্দরাম মিত্র। সাহেব জমিদারের অধীনে ‘ব্ল্যাক ডেপুটি’ই হর্তাকর্তাবিধাতা। লাগামছাড়া ক্ষমতার সঙ্গে আমদানিও বিপুল। হলওয়েল অনেক চেষ্টা করেও তাঁর গায়ে আঁচড় কাটতে পারেননি, সাহেবদের নাকের ডগায় আজীবন ছড়ি ঘুরিয়েছেন গোবিন্দরাম মিত্র। দাপুটে গোবিন্দরামের অখ্যয় কীর্তি ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’। ১৭৩০-এ চিতপুর রোডের ওপর কুমোরটুলিতে বানালেন এই মন্দির, এই মন্দিরের মূল চূড়ার উচ্চতা ছিল আজকের শহিদ মিনারের থেকেও উঁচু। ১৭৩৭-এর ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে সেই মন্দির খুব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একেবারে ভেঙে পড়েনি। সে কালের কলকাতার অন্যতম প্রধান দ্রষ্টব্য ছিল এই ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’। ২৮৩ বছর পেরিয়েও গোবিন্দরামের মন্দির আজও আংশিক ভাবে টিকে আছে।
এ কে সেনশর্মার বই ‘গ্রেট বেঙ্গল সাইক্লোন অব ১৭৩৭’ তে বিপর্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ আছে। ঐতিহাসিক প্রমাণ বলছে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক খুব প্রাচীনকাল থেকেই। সবচেয়ে প্রাচীন ঘূর্ণিঝড়ের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬৯৯ সালে। সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ৫০,০০০ লোক মারা গিয়েছিল। তার মাত্র ৩৮ বছরের মাথায় ঘূর্ণিঝড় আর ভূমিকম্প একসঙ্গে দেখেছিল কলকাতা। সেটা ছিল কার্যত মহাপ্রলয়। এর উল্লেখ পাই ওল্ডহ্যামের সেই তথ্য নির্ভর লেখার মধ্যে। ওল্ডহ্যামের সেই বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে ১৭৩৭ সালের ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পে সেন্ট অ্যান চার্চ ধ্বংস হয়ে যায়। আজ যেখানে মহাকরণ, সেখানে ছিল সেন্ট অ্যানের গির্জা। ইংরেজদের তৈরি সেই আদি উপাসনাস্থল চুরমার হয়ে ভেঙে পড়েছিল। আজ এর কোনও অস্তিত্ব নেই। ১৭০০ থেকে ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত এই গীর্জার মাঠেই ছিল ইংরেজদের মূল কবরস্থান। সেই বিবরণে উল্লেখ রয়েছে যে ১৭৩৭ সালের ১১ অক্টোবরের সন্ধ্যাবেলায় শেষবারের মতো সেন্ট অ্যান চার্চটিকে দেখা যায়। ভূমিকম্প ও প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ে সেটা ভেঙে পড়ে।

১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর বাংলার বুকে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড়
ওল্ডহ্যামের সেই লেখাতে আছে : “On September 30, last happened a furious Hurricane in the Bay of Bengal, attended with a very heavy Rain which raised 15 Inches of Water in 6 Hours, and a violent Earthquake, which threw down [an] abundance of Houses; and as the Storm reached 60 Leagues [»300 km] up the River Ganges, it is computed that 20,000 Ships, Barks, Sloops, Boats, Canoes, &c have been cast away. A prodigious Quantity of Cattle of all Sorts, a great many Tygers, and several Rhinoceroses were drowned; even a great many Caymans [crocodiles] were stifled by the furious Agitation of the waters, and an innumerable Quantity of Birds was beat down into the River by the Storm. Two English ships of 500 Tons were thrown into a Village above 200 Fathom [309 m] from the bed
of the River Ganges, broke to Pieces, and all the People drowned pellmell among the Inhabitants and Cattle. Barks of 60 Tons were blown two leagues [»10 km] up into the Land over the tops of the trees. The Water rose in all 40 Foot higher than usual. The English ships drove ashore and broke to Pieces were the Decker, Devonshire and Newcastle; and the Pelham is missing. (The Gentleman’s Magazine, Historical Chronicle, June 1738. Volume 8 Page 321)। ইতিহাসবিদ রঞ্জন চক্রবর্তীর গবেষণায় ১৭৩৭ সালের ওই ঘূর্ণিঝড়ের বিশদ বিবরণ ও বিশ্লেষণ রয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ডে কেবল কলকাতাতেই ৩,০০০ মানুষের মৃত্যুর খবর রয়েছে। মাথায় রাখতে হবে, সেইসময় জনসংখ্যা ছিল বেশ কম। সব মিলিয়ে বাংলায় মৃত্যু হয়েছিল ৩,০০,০০০ থেকে ৩,৫০,০০০ মানুষের। এর মধ্যে জাহাজের ক্রু সদস্যরাও যেমন ছিলেন, তার পাশাপাশি বাংলায় স্থানীয় মানুষরাও ছিলেন। যা তখনকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মোট জনসংখ্যার ১ %।
কতটা ভয়ঙ্কর ছিল সে রাতের জলোচ্ছ্বাস? গাঙ্গেয় বদ্বীপের ৬ লিগ অবধি উঠেছিল জলস্তর। ১ লিগ মানে সাড়ে পাঁচ কিমি। বোঝাই যায় কতটা বীভৎস ছিল জলের প্রাচীর। গাঙ্গেয় বদ্বীপ সংলগ্ন ৩৩০ কিমি এলাকা বিধ্বস্ত হয়েছিল ঝড়ের তাণ্ডবলীলায়। আজকের প্রেক্ষিতে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর অবধি প্লাবিত হয়েছিল। সাগরের বদ্বীপ অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছিল ৪০ ফিট অবধি। হিসেবমতো এই উচ্চতা আজকের চারতলা বাড়ির সমান। ৬ ঘণ্টা ধরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৮১ মিলিমিটার। গঙ্গার তীব্র জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড হয়ে যায় গঙ্গার ঘাটগুলি। দেশীয় ডিঙি নৌকোর পাশাপাশি উধাও হয় বিদেশি বণিকদের জাহাজও।
এর পর ১২৭ বছর বাদে আবার, ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর বাংলার বুকে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড়। তবে সে বার কলকাতার বদলে ঝড়ের আঘাত সব থেকে মারাত্মক ছিল খেজুরিতে। সে সময় খেজুরি ছিল সম্পন্ন বন্দর। ঝড়ের অভিঘাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল খেজুরি ও হিজলি বন্দর। মুখ থুবড়ে পড়েছিল ব্যবসার প্রধান মাধ্যম আমদানি ও রফতানি।
ঝড়ের প্রভাবে কলকাতা-সহ বাংলার বিভিন্ন বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ হয় ভেসে গিয়েছিল, নয়তো মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কলকাতার কয়েক হাজার মাটির বাড়ি ধসে পড়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল একশোর বেশি পাকা বাড়ি। এই প্রলয়ের পরের কয়েক মাস ধরে আবার তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়েছিল কলকাতাকে।
ঋণস্বীকার : ১. কলিকাতার রাজপথ সমাজে ও সংস্কৃতিতে: অজিতকুমার বসু, ২. কলিকাতা দর্পণ: রাধারমণ মিত্র, ৩. এ হিস্ট্রি অব ক্যালকাটাজ স্ট্রিটস: পি থঙ্কপ্পন নায়ার, ৪. টেন ওয়াকস ইন ক্যালকাটা: প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, ৫. এ জে ওয়াকার্স গাইড টু ক্যালকাটা: সৌমিত্র দাস ও চান্দ্রেয়ী নিয়োগী
nice write up, write more
খুব ভালো লেখা ।এমন আরও চাই ।