ঝড়ের খবর হলেই সুন্দরবনের কথা মনে পড়ে খুব। হ্যাঁ, সুন্দরবন। কারণ, ওখানেই কেটেছে আমার স্কুলে চাকরির দশ বছর আট মাস। সময়টা বেশ দীর্ঘ—তাই, অভিজ্ঞতাও হয়েছে ঝুলি ভোরে। ২০১০ অগাস্ট মাসে যখন প্রথম চাকরিতে জয়েন করলাম তখন ভরা বর্ষা আসি আসি করছে। সেই প্রথম দিন, যেদিন এক হাঁটু কাদা ভেঙে, তিন চার বার প্রায় আছাড় খেয়ে আমি আর আমার একান্ত নিরুপায় জীবন সাথী পৌঁছাই আমার স্কুলের দরজায়, সেদিনই কোথাও যেন ঘোষণা হয়—এটা সুন্দরবন বন্ধু, এখানে হয় খুঁটে খেতে শেখো, নয় মানে মানে পাততাড়ি গোটাও।
না, পাততাড়ি আমি গোটাইনি, খুঁটে খেতে শিখলাম একটু একটু করে। শুরু হোলো প্রকৃতির বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র মানুষের অসম লড়াই। শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে ২১০ কিমি পথ যাতায়াত করে চাকরিটা আমি করবো সিদ্ধান্ত নিলাম। পাশে অবশ্যই ছিল আমার পরিবার। সেই পরিবারের টান, বাড়ির টান ছেড়ে এক রাতও থাকবোনা ওখানে এ আমার জেদ, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলাম সুন্দরবনের আদিমতাকে। আমি—আমরা প্রায় কম, বেশি ১৫/২০ জন আদ্যন্ত শহুরে অভ্যাসে বেড়ে ওঠা নারী-পুরুষ একে, অন্যের বোঝা লাঘব করার মন্ত্রে যেন দীক্ষিত হলাম নিঃশব্দে। যারা ওখানে থেকে এতদিন গুমড়েছে, পরিবারকে না পাওয়ার জ্বালা সয়েছে, তারাও যোগ দিলো আমাদের দলে। শুরু হোলো দীর্ঘ লড়াই।

প্রথমে ছিলাম দুই—শিখাদি, আর আমি। শিখাদি এপথে একটু পুরোনো, বেশী অভিজ্ঞ। আমায় শেখালো কিভাবে সময় বাঁচাতে দীর্ঘ ৪০ কিমি পথ (যাওয়া, আসা মিলে) বাইক ব্যবহারে সংক্ষিপ্ত হয়। ইন্দ্রনীল দার বাইক (ভাড়া করা বাইক কিন্তু তার সাথে দায়িত্ববান, আন্তরিক, নির্ভরযোগ্য লোকাল দাদা) করে আমরা দুই বীরাঙ্গনা অজানা সুন্দরবনের আঁকাবাঁকা পথের বুক চিরে রোজ দু-বেলা নারীশক্তির বিজয়কেতন ওড়াতাম। বিপদ? সেতো সবথেকে পাকা সঙ্গী। তিনজনের জার্ণি, চাকা দুই। আর কাদা! ওখানে এতো পিছল যে বাইক-এর চাকাকে বুকে টেনে নিতে তার মুহূর্ত লাগবে না। কতো দিন বাইক-এর সামনে এসে পড়েছে ছাগল, মুরগি, কুকুর, বা মানুষের অবোধ শিশু। একমাত্র—রাখে হরি মারে কে, ছাড়া আর কোনও মন্ত্র জানা ছিল না।
তখন পুল হয়নি। হাসনাবাদে ইছামতি পার হওয়া। ইছামতি ছারা লেবুখালীতে কালিন্দী, রায়মঙ্গল আর আর একটা নাম না জানা সুন্দরবনের নদীর মিলন স্থল পারতাম। ঝোড়ো হাওয়ায় নৌকোর দুলুনি? সে যে না অনুভব করেছে, তাকে ভাষায় বোঝানো আমার কাজ নয়। মাঝি হেঁকে বলতো, ‘বাঁচতে চান তো সব বসে যান নৌকোর উপর।’ বসে যেতাম ণীল ডাউন হওয়া বাচ্চাদের মতো। আর একের ছাতার জলে অন্যে স্নান করতো রেইন কোটের ফাঁক-ফোকর দিয়ে। সে ঝোড়ো হওয়ার গতি, সে জলের ধার ভোলা যাবে না। আধ ভেঁজা বা কাক ভেঁজা হয়ে আরও ৮০ কিমি পথ চলতে ঠিক কেমন লাগে কাকে বোঝাবো বলুন তো?
সত্যি বলতে স্কুলে পড়াতে এসে আমি বা আমরা যেটা করেছি সেটা মানুষের কাজ না, দেবতা তো নয়ই বরং অপদেবতা বলতে পারেন বিলক্ষন। একবার স্কুলের পথে চলেছি। দিদিমনি বলে স্ট্যান্ড থেকে এলাকায় সবাই কম বেশি পরিচিত। সেদিন আকাশের মুখ ভার। বেশ বৃষ্টি হয়েছে আগের দিন। খানিক দূর রিজার্ভ গাড়িতে গিয়েই জানতে পারি আগের রাত থেকে যে তুমুল বৃষ্টি হয়েছে তাতে নদীবাঁধে ফাটল ধরেছে, জল ঢুকছে গ্রামে। কী ভাবলেন ভয় পেয়ে পিছু হাঁটলাম? প্রশ্নই নেই। আগেরদিন রাত থেকে টিফিন গুছিয়ে, সংসার সামলে, সকাল ৬টা ৫৬ মিনিটের হাসনাবাদ লোকাল ধরে প্রায় সত্তর কিমি চলে এসেছি যখন ফিরবো না কোনোমতে। গাড়ি থেকে নেমে দু-পায়ের ওপর ভর করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। আমরা শিক্ষিকা ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে নিজেরাও যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছি প্রকৃতির থেকে।

দূরে ধান খেতে জলের রেখা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ততদিনে ভরসা হয়ে গেছে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশ্বকর্মাদের ওপর। কোনও সরকার যাদের কথা সেই ভাবে ভাবে না তারা যখন হাত লাগিয়েছে বাঁধ মেরামত হবেই। নিজেদের বাঁচার তাগিদেই তারা বাঁধ বাঁধবে। না হলে যেটুকু আছে তাও যে সর্বসান্ত হয়ে যাবে। আমরা শহুরে কাদা ঘাঁটতে ঘাঁটতে এগিয়ে চলেছি। কোথাও কোথাও পায়ের তলা দিয়ে কুলকুল শব্দ। চোখ তবু স্থির লক্ষ্যের দিকে। হঠাৎ পায়ে জ্বালা, জ্বালা। যা ভেবেছি তাই। পা কেটে রক্ত ঝরছে বেশ। এবার উপায়? ময়দান তো ছাড়া চলবে না বস। আবার কৃষ্ণ হাজির তার রথ নিয়ে। এক দাদার ভাঙাচোরা বাইকে চেপে বসলাম। উতরে গেলাম। টাকা খরচ হলো ঠিক তবু তো পৌঁছলাম। সারা রাস্তায় লাল রক্তের ফোঁটায় আঁকা থাকলো আমাদের জয়ের বার্তা। গেলাম যথা সময়ে, class করলাম, বাড়ি ফিরলাম— পরের দিন আবার গেলাম সুন্দরবন। যে গ্রামের মানুষগুলো বাঁধটা সারিয়ে ফেলেছিলো সারাদিনের পরিশ্রমে তাঁদের কুর্নিশ। ওরা আছেন তাই চাকরি করতে পেরেছি, লড়াই করে গেছি দশটা বছর।
না, এ লড়াই সম্ভব হতো না কিছু নাম না জানা মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া। তাঁদের কারো নাম স্বপনদা, কারো সইদুল, কিংবা বিনয়, বাপিদা, সেলিমদা বা পিন্টু। আরও আরও অনেক লম্বা সেই লিস্ট। নামি, দামী, খবরের কাগজে জায়গা করা ঝড় বা নামহীন অসংখ্য ঝড় যারা জীবনকে টালমাটাল করেছে বারংবার তাদের কোথাও না কোথাও হারিয়ে দিয়েছি আমরা এদের হাত ধরেই। সামনে অন্ধকার নেমে আসছে, মেঘ বুঝি ভেঙে পড়বে এবার, ঝোড়ো হাওয়াকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ছুটে চলেছে বিনয়ের লাল ছোট্ট চারচাকা, চোখ স্থির পথের দিকে, আমরা শ্বাস বন্ধ রেখে শুধু ঘড়িতে চোখ। পথের ধুলো উড়িয়ে হাওয়া উঠছে চারপাশে, সেলিম দার বাইক তবু নিরন্তর, ম্যাডাম শক্ত হয়ে বসুন। বড় ফোটা, ছোট ফোটা, ঝোড়ো হাওয়া, ঘন মেঘ, কে.সি পাল যেখানে উল্টে শিক বের করে মূর্ছা যায়, সেখানে পিন্টুর অটো চলে ইমার্জেন্সি আলো জ্বালিয়ে। বলতেই পারেন ওরা রোজগার করে। কিন্তু এই বাপিদা যখন বারবার রাতে ফোন করে আগাম ঝড়ের খবর দেয়, বলে, ম্যাডাম কাল আসবেন না ঝড়ের মাইকিং হচ্ছে বা ঠিকমতো পৌঁছেছেন ঘরে? মনে হয়, আপনজন তো এমনি হয় তাই না? এর বেশী আর কী দেবে এই সুন্দরবনের নামহীন, কপর্দকহীন সাধারন মানুষগুলো।
আসুক ঝড়। তবু বাঁচবে সুন্দরবন। বিশ্বকর্মারাতো আছেই সেখানে হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ভালো থাকো সুন্দরবন। তোমার সব হিংস্রতা নিয়ে, বন্যতা নিয়ে তুমি থাকো নিজের মতো। যারা আজও লড়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনে চাকরি করতে গিয়ে তাঁদের কষ্ট লাঘব হবে শিগগির এই বাসনা রাখি মনের কোনায়। তবে আমরা সবাই স্বীকার করি সুন্দরবন জীবনটাকে বাঁচতে শিখিয়েছে, লড়তে শিখিয়েছে, হেরে না যেতে শিখিয়েছে, মুখোশহীন বন্ধু দিয়েছে সারাজীবনের সম্পদ হিসাবে। জীবনের কাছে এর বেশী দাবি করা কী ঠিক হবে?
লেখিকা : শিক্ষিকা, আগে ছিলেন হিঙ্গলগঞ্জ লেবুখালি কালিতলা হাই স্কুল বর্তমানে বারাসাত নবপল্লী বয়েজ হাই স্কুল