বেদের মধ্যে যজুর্বেদের বিভাজন নিয়ে একটি কাহিনী শোনা যায়। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের শিষ্য ছিলেন। বৈশম্পায়ন যজুর্বেদ রচনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বৈশম্পায়ন যজুর্বেদকে ২৭টি শাখায় বিভক্ত করেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের যজুর্বেদের শিক্ষা দেন এবং এই সাতাশটি শাখা তার বিভিন্ন শিষ্যদের দান করলেন। বৈশম্পায়ন সমস্ত শিষ্যদের মধ্যে ব্রহ্মরাত ঋষির পুত্র যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল, সক্ষম, সত্যবাদী এবং মেধাবী। যাজ্ঞবল্ক্য সর্বদা গুরুসেবাপরায়ণ ছিলেন। তাই বৈশম্পায়ন তাকে যজুর্বেদের একটি শাখা দান করেছিলেন।
তখনকার ঋষি সমাজে নানা ঋষি সম্মেলন হতো। ঋষিরা সেখানে শাস্ত্র আলোচনা করে শাস্ত্রকে সজীব রাখতেন। একবারই ঋষিরা ঠিক করলেন আমাদের মহামেরুস্থিত সমাজে যে আজ আসবেন না সেই ঋষি সপ্তরাত্রির পর ব্রহ্মহত্যা পাপে লিপ্ত হবেন। সেদিন মহামেরুস্থিত সমাজে সকলে উপস্থিত হলেন কেবল বৈশম্পায়ন যেতে পারলেন না। সপ্তরাত্রির পর ওই শাপের ফলে বৈশম্পায়ন নিজের ভাগ্নেকে ভুলক্রমে পা দিয়ে মাড়িয়ে মেরে ফেললেন।
এই দুর্ঘটনার পর বৈশম্পায়ন নিজের শিষ্যদের ডেকে বললেন, ‘শিষ্যগণ তোমরা সকলে আমার জন্য ব্রহ্মহত্যা পাতক ও বিনাশক ব্রত উদযাপন কর’।
গুরুর আদেশ শুনে যাজ্ঞবল্ক্য বলে উঠলেন, ‘প্রভু এসব ব্রাহ্মণ অধিক তেজ ধারণ করেন না। সুতরাং এদের বৃথা ক্লেশ দিয়ে লাভ নেই। আমি একাকী এই ব্রতচারণ করি।’
যাজ্ঞবল্ক্যর এই গর্বভাব দেখে বৈশম্পায়ন খুবই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি রেগে গিয়ে বললেন, ‘ওরে বিপ্রদের অবমাননকারী অহংকারী! তুমি আমার শিষ্য হওয়ার যোগ্য নও, জ্ঞান লাভেরও যোগ্য নও। তুমি এতদিন আমার কাছে যা অধ্যয়ন করেছ, তা এখনই ফেরত দাও। যে শিষ্য ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ দের অবমাননা করে, সেই আজ্ঞালঙ্ঘনকারী শিষ্যের আমার কোন প্রয়োজন নেই’।
গুরু বৈশম্পায়নের মুখে তিরস্কার শুনে যাজ্ঞবল্ক্য উত্তেজিত হলেন। তিনিও ক্রোধে রক্তিম হয়ে বললেন, ‘ব্রাহ্মণ আপনার প্রতি ভক্তিবসত আমি এই কথা বলেছি। আমারও আপনার মধ্যে ব্রাহ্মণহত্যাকারি গুরুর প্রয়োজন নেই। আপনার কাছে আমি যা উদ্ধার করেছি, তা ফেরত দিচ্ছি আপনি গ্রহণ করুন।’
এই বলে যাজ্ঞবল্ক্য নিজের ভেতর থেকে রক্তবমন করে যজুর্বেদ উদগীরণ করলেন। যেহেতু বেদ পবিত্র, তাই বৈশম্পায়ণ চাননি যে বমিটি মাটিতে পড়ে যাক।
বৈশম্পায়নের নির্দেশে তাঁর অন্যান্য শিষ্যরা তিতির পাখির রূপ ধরে তা গ্রহণ করলেন। ব্রাহ্মণেরা তিতির পাখির রূপ ধরে এই শাস্ত্র গ্রহণ করেছিলেন বলে যজুর্বেদ শাখা ‘তৈত্তিরীয়’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যেহেতু এটি কালো বমি আকারে বেরিয়ে এসেছিল, তাই এটি কৃষ্ণযজুর্বেদ নামেও পরিচিতি লাভ করে।
আর যে ব্রাহ্মণগন বৈশম্পায়নের আদেশে ব্রহ্মহত্যা নিবারণের জন্য পাপনাশক ব্রত করলেন, তাদের অতীতবিদ্যা চরকাধূর্য্য নামে খ্যাত হল।
বৈশম্পায়নের কাছে অভিশপ্ত হয়ে ব্রহ্মরাত পুত্র যাজ্ঞবল্ক্য বেদের জ্ঞান উদগীরণ করতে বাধ্য হলেন। গুরু রুষ্ট হলেও তিনি কিন্তু পরাজয় স্বীকার করলেন না।
এরপর যাজ্ঞবল্ক্য আর কোন মানুষকে তাঁর গুরু হিসেবে গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। যজুর্বেদের জ্ঞান ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি স্বয়ং আদিত্যের (সূর্যদেব) কাছে ধ্যান, প্রাণায়ামের মাধ্যমে শুদ্ধ হয়ে স্তুতি করতে লাগলেন। আদিত্য যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রথমে দেবী সরস্বতীর পূজা করতে বলেন। যাজ্ঞবল্ক্য দেবী সরস্বতীকে সন্তুষ্ট করার জন্য কঠিন তপস্যা করেন এবং তাঁর জন্য একটি সুন্দর স্তূতি রচনা করেন । অবশেষে মা সরস্বতী যাজ্ঞবল্ক্যকে আশীর্বাদ করেন।
যাজ্ঞবল্ক্যর স্তুতিতে তুষ্ট হয় সূর্য বাজিরূপে অর্থাৎ ঘোড়ার রূপ ধারণ করে তাকে দেখা দিলেন। তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে বললেন, ‘আমি তোমার প্রার্থনায় তুষ্ট হয়েছি।তোমার মনমত বর প্রার্থনা কর’।
যাজ্ঞবল্ক্য দিবাকরকে প্রণাম করে বললেন, ‘আমার গুরুও যা জানেন না, এমন যজুর্বেদ জ্ঞান আমাকে দান করুন।’
সূর্য সেই বাজিরূপেই ‘অযাতযাম’ নামে যজুর্বেদের একাংশের জ্ঞান দান করলেন। সূর্যদেব বাজিরূপে এই জ্ঞান দান করেছিলেন বলে, যে সব ব্রাহ্মণ যজুর্বেদের এই অংশটি নিয়ে জ্ঞান লাভ করেন, তাদের নামের আগে ‘বাজি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
বৈশম্পায়ণ যে কৃষ্ণ যজুর্বেদ শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাতে সংহিতা এবং ব্রাহ্মণ অংশ একসাথে মিশে গিয়েছিল, কিন্তু আদিত্য যে যজুর্বেদ শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাতে সংহিতা স্পষ্টভাবে পৃথক হয়ে গিয়েছিল। আদিত্য কর্তৃক যজুর্বেদের এই সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর এটি শুক্লা যজুর্বেদ নামে পরিচিত হয়। আদিত্য যাজ্ঞবল্ক্যকে বজ (ঘোড়া) আকারে এটি শিক্ষা দেওয়ার পর শুক্লা যজুর্বেদ এই শাখাটিকে বাজসনেয়কও বলা হত।
কথিত আছে যে, যাজ্ঞবল্ক্যও পরবর্তীতে একজন গুরু হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের সাথে বিতর্কে উৎসাহিত করেছিলেন। এই যাজ্ঞবল্ক্যই প্রথমবারের মতো শুক্ল যজুর্বেদে ‘গুরু কে?’ তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
যিনি গুরুর ভূমিকা পালন করেন, তাঁর নির্দিষ্ট কিছু কর্তব্য আছে। বৈশম্পায়ণ যদি একজন প্রকৃত গুরু হতেন, তাহলে তিনি হয়তো যাজ্ঞবল্ক্যের সৎ উদ্দেশ্যকে অহংকার হিসেবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে তাঁকে উপলব্ধি করতে পারতেন।
আদিত্য কি সত্যিই স্বর্গ থেকে এসেছিলেন যাজ্ঞবল্ক্যকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, নাকি এটা বলার একটা উপায় ছিল যে তার নিজের ভেতরের আদিত্য (আলোই) তাকে যজুর্বেদ প্রকাশ করেছিল। বৈশম্পায়ণের ছাত্ররা কি সত্যিই পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে যাজ্ঞবল্ক্যের বমি করা যজুর্বেদ খেয়ে ফেলেছিল? নাকি এটা প্রকাশ করার একটি কাব্যিক উপায় ছিল যে, বাকি ছাত্ররা যাজ্ঞবল্ক্য তার গুরুর আশ্রম ত্যাগ করার আগে তাঁর পঠিত শ্লোকগুলি মুখস্থ করেছিল।
শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন “গুরু নেবে বাজিয়ে”। এর অর্থ হলো, গুরু নির্বাচনের সময় খুব সতর্ক হতে হবে, যাচাই-বাছাই করে, তাঁর চরিত্র, জ্ঞান, এবং আধ্যাত্মিকতা বিচার করে তবেই দীক্ষা নিতে হবে। হুট করে বা আবেগের বশে গুরু গ্রহণ করা উচিত নয়।
গুরু “শব্দের “গু” শব্দের অর্থ অন্ধকার এবং অজ্ঞতা। “রু” শব্দের অর্থ অন্ধকার বা অজ্ঞতার নির্মূল। অতএব, যাঁর অন্ধকার দূর করে জীবনে আলো আনার ক্ষমতা আছে, তাকেই গুরু বলা উচিত। গুরু অর্থাৎ যিনি লঘু নন বরং লঘুকে তিনি গুরু করে তোলেন।
মানুষের জন্ম মুহূর্ত থেকেই গুরুকরণ শুরু হয়ে যায়। গুরু কৃপা ছাড়া শিষ্যের মুক্তির পথ নেই। তার প্রয়োজনীয়তা শুধু আধ্যাত্মিক জগতের জন্য নয়, সাংসারিক ক্ষেত্রেও জরুরী। যদিও সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু হলেন মা। গুরুরূপী পথপ্রদর্শকে সাহায্য ছাড়া কিছুই হওয়ার নয়।
একবার আমরা বুঝতে পারি যে একজন গুরু যে কেউ হতে পারেন এবং ব্যক্তিগত গুরুকে “অনুসরণ” করার পরিবর্তে, আমরা তাঁকে “পরীক্ষা” করি এবং অবশেষে গুরু যা দিতে চান তা “গ্রহণ” করি। এটাই হবে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ এবং যোগানন্দের নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং শিক্ষার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কনক, কান্তা ও কীর্তির ঝড়ো হাওয়া তাকে ওড়াতে না পারে, তিনি যেন অস্থির অব্যবস্থিত মনের মানবের জন্য মাগ দর্শক হয়ে থাকেন। গুরুপূজা অর্থাৎ ধ্যেযের পূজা। গুরুর জীবন কেবল ধ্যেয় মূর্তি নয় বরং বলা যায় ধ্যেয়র সাকার স্বরূপ। মানব জীবনে ধ্যেয়র আগমনে সংযম আসে, সংযমে-ই শক্তি সংগ্রহ হয়, আর সেই শক্তিশালী মন তার সাক্ষাৎলাভ করে।
আমাদের প্রত্যেকের ভিতরের যাজ্ঞবল্ক্য জাগ্রত হোক!