‘শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে, / হে আরম্ভ, বৃথা তব অহংকার তবে। / আরম্ভ কহিল ভাই, যেথা শেষ হয় / সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়।’
আজ ইংরেজী বছরের শেষ। নানা সমাপ্তি। যদিও এটি নতুন কিছু নয়, চিরকালই হয়ে এসেছে। যে ভাবে একটা করে গোটা বছর পেরিয়ে আসি, অবিকল সেই ভাবেই কেটে যায় জীবৎকাল। তবু ‘মন্দ-ভালোর দ্বন্দ্বে খেটে গেছে তো দিন অনেক কেটে, অলস-বেলায়’ সেগুলি জাবর কাটতে মন টানে।

যেমন ধরুন, ভোটপুজোর কথা। প্রতিবছর হয়। আর আমাদের জীবনে রাজনীতিটা যেন ধর্মের মতোই ভাতের হাঁড়ির মধ্যে দিয়ে ঢুকে গেছে। আপনারাই তো বলেন, ভোট দেওয়া হলো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এমনিতে আমাদের মতো আমজাম মানুষের মতামতের কোন মূল্য নেই, তাই ভোটপুজো এলেই সেজেগুজে কাঠফাটা রোদে একটু পুণ্যের লোভে দাঁড়িয়ে পরি অধিকারের লাইনে। অভিযোগের উপশমের আশায়। কিন্তু যখন কেষ্ট-বিষ্টুরা আপনার সামনে দুটি হাত জোড়া করে ভোট ভিক্ষা করে তখন সব রাগ-ক্ষোভ-হতাশা কোথায় যেন উড়ে গিয়ে মেঘ-বৃষ্টিতে পরিণত হয়। তাই হয়তো ‘চলে যাওয়া’ বা ‘থেকে যাওয়া’-র খেলায় খেসারত দিতে হয় আমাদেরকেই। থাক, বছরের এই শেষ দিনে পুরোন কাসুন্দি ঘেঁটে ঘেঁটে মনটাকে আর না বিষিয়ে তোলাই ভালো।
আবার দেখুন, ‘অতীতের সব ভালো’ এই ভ্রান্তিবিলাস যদি একবার মনে গেঁথে যায়, তবে তা আর বিচারের পথে হাঁটে না। যেমন ধরুন, পুরোন দিনের মানুষদের ব্যক্তিগত জীবনের কোন কেচ্ছা কাহিনী না জেনেই সার্টিফিকেট দেওয়া হয় ভালো বলে। এমনকি রুপোলি পর্দার নায়ককে বানাই দেবতা আর নায়িকা দেবী। সঙ্গে যদি স্পিরিচুয়াল টাচ থাকলে তাহলে তো কথাই নেই। যেন স্বয়ং ভগবান নেমে এসেছে ধরাধামে। সত্যি কী ব্যাপারটা তাই! মনস্তত্ত্ব বলে, যা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থাকে তাই হয়ে ওঠে মহৎ।

একদিন আমাদের বাড়ীর ছোট্ট মেয়ে আরাধ্য প্রশ্ন করলো, ‘আই, আমি কী আর স্কুলে যাবো না?’ কী উত্তর দিলে ঠিক হবে বুঝতে পারছিলাম না। তবু বললাম, ‘যাবি, একদিন ঠিক যাবি’। কী বুঝলো জানিনা, হেডফোন আর মোবাইল নিয়ে অনলাইনে ক্লাস করার জন্য চলে গেলো ঘরে। অনলাইন স্কুলিংয়ের এই ছোটবেলাটা বেশ আলাদা। পঠন পাঠনের ধরন, পরীক্ষা, বন্ধুসঙ্গ….স্কুলজীবনের খোলনলচেই বদলে গিয়েছে। মোবাইলের স্ক্রিনটাই ওর এখন ক্লাসরুম। ওখান থেকেই ওর মর্নিং প্রেয়ার, মার্ক টোয়েন, রবীন্দ্রনাথ, ১২-র ঘরের নামতার সঙ্গে লিংক শুরু হয়। ওখান থেকেই জানতে পারে পাস্ট-প্রেজেন্ট-ফিউচার টেনস, ডাইজেস্টিভ সিস্টেম বা হিমালয়ের কথা। হলদি ঘাঁটি যুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে যদি লিংক চলে যায়, বিরক্তিকর হয়ে চিৎকার করে ওঠে। কোথাও যেন এক পিছিয়ে পড়ার ভয় ওকে গ্রাস করে ।

প্রায় দুই বছর হতে চললো স্কুলে যাওয়া বন্ধ। একা থাকতে থাকতে কিছুটা খিটখিটে হয়ে উঠেছে। কোন সময় মনে হয় ওরা বড়ো একা, ওই মোবাইলটার মতো। বদলে যাচ্ছে ওদের খুনসুটি করার হাত, সবুজ মাঠে দৌড়োতে থাকা ছোট্ট দুটি পা, টিফিন বাক্স থেকে ভাগ করে টিফিন খাওয়ার আনন্দ কিংবা প্রাণ খুলে হাসার। ইচ্ছা করলেও এখন পেন দিয়ে বন্ধুর স্কুলের জামায় দাগ কাটতে পারে না, পারেনা চুল টেনে পালিয়ে যেতে। আবার কখনো মনে হয়, এই শুয়ে, বসে, অনিয়মের জীবনে থেকে বাস্তব জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করার ইচ্ছাটাই ধীরে ধীরে চলে গেছে। আসক্তি বেড়েছে মোবাইল আর ইন্টারনেটের প্রতি। এইভাবেই একা থাকতে ওরা ভালোবাসে।
বোধহয় আমরা সবাই একা থাকতেই ভালোবাসি। খেয়াল করলে দেখা যাবে সেই কোনকাল থেকে পুরোন বছরের শেষে, নতুন বছরের গোড়ায় নানা রেজোলিউশন নিয়ে থাকি। লাইফস্টাইল মডিফিকেসন করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, রাত-বিরেতে জেগে থাকা, জাঙ্কফুড হ্যাবিট, এক্সারসাইজ না করা…

এইসব ভুলের আর পুনরাবৃত্তি হবে না। মেনে চলা হয় দশ, বিশ, খুব বেশি ত্রিশ দিন। ব্যস, সব প্রতিজ্ঞাই ভেঙেচুরে গুঁড়ো হয়ে যায়…. যথাপুর্বং তথাপরং গয়ংগচ্ছ … আবার একটি বছরের আবর্তন।
শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন, ‘হেরে গেছো বলে কী গালে হাত দিয়ে বসে থাকবে? পিছন ফিরে চেয় না। কত ভুল করেছো, কী ভুল করেছো— এসব না ভেবে সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে এগিয়ে যাও।’ দুরারোগ্য ক্যান্সারের যন্ত্রনা থাকা সত্ত্বেও জীবনরসে পরিপূর্ণ ছিলো তাঁর জগৎ। জীবনকে প্রতিক্ষণে প্রতি মুহূর্তে উপভোগ করার অমোঘ কৌশল আমাদের শিখিয়ে গেছেন পরমপুরুষ রামকৃষ্ণদেব। তাঁর মন্ত্রের আলোয় আলোকিত হোক নতুন বছর। ভালো থাকুন সকলে। ভালো থাকাও কিন্তু একটি জীবনদর্শন।।

“ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে ॥ / দীনতা হতে অক্ষয় ধনে, সংশয় হতে সত্যসদনে, / জড়তা হতে নবীন জীবনে নূতন জনম দাও হে ॥”
ছবি : সুব্রত ঘোষ-এর সংগ্রহ থেকে নেওয়া হয়েছে।
খুবই ভালো লেখা। মিঠির জয়।
Dhonyobad ????
Darun. Didi
থ্যাঙ্ক ইউ
Bah
থ্যাঙ্ক ইউ
চমৎকার। খুব ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ????
যথার্থ সময়োপযোগী রচনা, যথাপুর্বং যেন না ঘটে,গয়ংগচ্ছ থেকে সত্যিই মুক্তি চাই।
ঠিক বলেছ।থ্যাংক ইউ????