ব্রিটিশ আমলের সামরিক পূর্ত বিভাগে চাকরি করতেন শ্যামাচরণ লাহিড়ি। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল রাণীক্ষেত। হঠাৎই একদিন তাঁকে রানীক্ষেত থেকে বদলি করা হল দানাপুরে। দানাপুরে এসে তিনি অফিসের কাজে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু কাজে মন দিতে পারলেন না। দ্রোণগিরিতে থাকার সময় যোগ-সিদ্ধ গুরুর কৃপায় তিনি যে যোগসাধন শুরু করেছিলেন—সেটাই তখন তাঁর জীবনে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। তাঁর সামনে আধ্যাত্মজীবনের শতদল যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে।
তাঁর দানাপুর অফিসের উপরওয়ালা ছিলেন একজন ইংরেজ সাহেব। এই সাহেবও জানতেন, শ্যামাচরণ লাহিড়ি একজন প্রচ্ছন্ন সাধক, তিনি আদর করে উদাসীন-প্রকৃতির শ্যামাচরণকে ‘পাগলাবাবু’ বলেই ডাকতেন। আবার এই উপরওয়ালা সাহেবের জন্যই একদিন শ্যামাচরণের প্রচ্ছন্ন যোগবিভূতি গোপনীয়তার আবরণ ভেদ করে প্রকাশ্যে এসে পড়েন। সেই ঘটনাটাই এখন বলছি।
হঠাৎই একদিন লাহিড়ি মশাই অফিসে এসে দেখলেন, সদা হাস্যময় ইংরেজ সাহেবের মুখ ভার—কেমন যেন উদ্বেগের কালো ছায়া তাঁর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে আছে। এরকম তো কখনও হয় না। কিন্তু সাহেবকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করারও কোনও সুযোগ নেই। তাই, এমন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নজরে পড়লেও তিনি এ বিষয়ে প্রথমদিন চুপচাপই রয়ে গেলেন।
কিন্তু ব্যাপারটা একদিনেই শেষ হল না। লাহিড়িমশাই এবং অফিসের অন্যসকলেই লক্ষ করে দেখলেন, সদা-প্রসন্ন সাহেব পরপর কয়েকদিন ধরেই সদা-বিষণ্ণ। কারোর সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলেন না, কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে তিনি ‘হ্যাঁ’ ‘হুঁ’ বলেই কাজ শেষ করেন। সব সময় কেমন যেন চিন্তার সমুদ্রে তলিয়ে থাকেন।
শেষপর্যন্ত শ্যামাচরণ এগিয়ে গেলেন। তিনিও সাহেবকে খুব ভালোবাসেন। লাহিড়িমশাইয়ের সমবেদনা ও সহানুভূতি সাহেবের অন্তরকেও স্পর্শ করে। তাই তাঁর প্রশ্নের জবাবে সাহেব জানালেন, তাঁর পত্নী ইংলন্ডে খুব কঠিন অসুখে আক্রান্তা—মেমসাহেব এতটাই পীড়িতা যে, তাঁর প্রাণরক্ষা হবে কিনা, সে বিষয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সাহেবের উৎকণ্ঠা বেড়ে গিয়েছে এইজন্য যে, তিনি গত কয়েকদিন ধরে ইংলন্ড থেকে কোনও পত্র পাননি। ফলে, মেমসাহেবের সর্বশেষ খবরও তিনি জানেন না। সেইজন্যই তিনি অত্যন্ত চিন্তিত।
সাহেবের এই করুণ অবস্থা দেখে শ্যামাচরণের মন করুণায় ভরে উঠল। তিনি মনে মনে তাঁর কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। তারপর সাহেবকে বললেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না স্যার, আমি আজই মেমসাহেবের খবর এনে দেব।’
লাহিড়িমশাইয়ের কথা শুনে সাহেব ভাবলেন, বোধহয় ‘পাগলাবাবুর’ মাথাটা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে। তাই এমন উদ্ভট ও হাস্যকর কথাবার্তা বলছেন। একদিনে ইংলন্ড থেকে মেমসাহেবের খবর নিয়ে আসবে—এটা কি ম্যাজিক। এতসব কথা ভাবছেন ঠিকই, তবু তিনি লাহিড়িমশাইয়ের আন্তরিকতা ও সমবেদনার সুরটুকুকে একেবারে উপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি এক দৃষ্টিতে শ্যামাচরণের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু কোনও কথা বললেন না।
সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে শ্যামাচরণ গিয়ে ঢুকলেন অফিসেরই এক নির্জন ঘরে। ভিতর থেকে ঘরটিকে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তিনি যোগাসনে বসে ধ্যানাবিষ্ট হলেন। ধ্যান যখন শেষ হল, ততক্ষণে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত। তিনি গিয়ে ঢুকলেন সাহেবের ঘরে। সাহেব তখন উদ্বেগে ও উৎকণ্ঠায় ঘরে বসেই অস্থির হয়ে উঠেছেন। শ্যামাচরণকে আবার ফিরে আসতে দেখে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন তাঁর প্রিয় ‘পাগলাবাবু’র দিকে। শ্যামাচরণ শান্ত, অথচ স্থিরকণ্ঠে সাহেবকে বললেন, ‘স্যার, আমি জানতে পেরেছি, মেমসাহেব ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আপনি এ নিয়ে আর অযথা দুশ্চিন্তা করবেন না। মেমসাহেব কয়েকদিনের মধ্যেই নিজের হাতে আপনাকে চিঠি লিখে সব খবর দেবেন।’ এখানেই শেষ নয়, সাহেবকে হতবাক করে দিয়ে তিনি আরও বলে দিলেন, মেমসাহেবের ওই চিঠির বয়ান ও ভাষাটা কীরকম হবে।
সাহেব শুনেছিলেন, ‘পাগলাবাবু’ যোগ সাধনা করেন। তিনি ভারতীয় যোগীদের নানারকম অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডের কথাও শুনেছিলেন। কিন্তু তাই বলে এরকম একটা অসম্ভব ব্যাপারকে যে একজন যোগী সম্ভব করে দিতে পারেন, সে কথা সাহেব যেমন মেনে নিতে পারছিলেন না, তেমনি বিশ্বাস করতেও পারছিলেন না। তবুও কিন্তু শ্যামাচরণের এমন সহজ সরল আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তাকে সাহেব উপেক্ষা করতে পারছিলেন না। আর নিজের অজান্তেই সেই কথার উপর ভরসা করে সাহেব যেন মানসিক দিক থেকে বেশ কিছুটা শান্ত হলেন।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই ইংলন্ড থেকে মেমসাহেবের চিঠি এল। চিঠিটা পেয়ে সাহেব শুধু যে নিশ্চিন্ত হলেন, তা-ই নয়, তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। শ্যামাচরণ কী করে জানতে পারলেন—মেমসাহেব চিঠি লিখেছেন এবং সেই চিঠিতে কী আছে। এ সব কথা ভাবতে ভাবতে সাহেব এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা লাভের আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁর অফিসের ‘পাগলাবাবু’ যে সাধারণ মানুষ নন, সোও সাহেব অনুভব করলেন এই ঘটনার মাধ্যমে।
ইতিমধ্যে মাস তিনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। মেমসাহেব সুস্থ হয়ে ইংলন্ড থেকে স্বামীর কর্মস্থল দানাপুরে এসেছেন। মেমসাহেবকে পেয়ে সাহেবও উৎফুল্ল। সেদিন একটা কাজের প্রয়োজনে লাহিড়িমশাই এসেছেন ওই সাহেবর বাংলোতে, বসেছেন বৈঠকখানা ঘরে। পর্দার আড়াল থেকে মেমসাহেব এক ঝলক দেখলেন লাহিড়িমশাইকে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। তারপর ভাল করে দেখলেন আরেকবার, নিজের মনেই বললেন এবার, এ-ও কি সম্ভব? ছুটে গেলেন স্বামীর কাছে, বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে বললেন, ‘ওগো, এই মহাত্মাকেই যে ইংলন্ডে পীড়িত অবস্থায় আমি একদিন দর্শন করেছিলাম। ডাক্তাররা তখন আমার জীবনের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন ইনিই সেদিন আমার রোগশয্যায় পাশে এসে দাঁড়িয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। জানো, এই মহাত্মার কৃপাতেই আমার জীবন ফিরে পেয়েছি। সেদিন থেকে এঁকে আমি কত খুঁজেছি—কিন্তু কোথাও দেখা পাইনি। আজ দানাপুরে আসা আমার সার্থক হল।’
সাহেব তখন যবতীয় ইতিবৃত্ত মেমসাহেবকে বললেন। লাহিড়িমশাইয়ের এই বিস্ময়কর যোগবিভূতি সেদিন এক বিদেশী দম্পতিকে শ্রদ্ধায় অভিভূত করে দিয়েছিল।
শ্যামাচরণের পিতা গৌরমোহন (সরকার) লাহিড়ির বাস ছিল নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহর সন্নিহিত ঘূর্ণীতে। নিজের গ্রামে তিনি এক শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে ঘূর্ণীর শিবতলায় সেই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়। শিবের কৃপাতেই ১৮২৮ সালের আশ্বিন মাসে শিবকল্প শ্যামাচরণ আবির্ভূত হন। শৈশবেই তিনি মাতৃহারা হন এবং পিতার সঙ্গে স্থায়ীভাবে কাশীতে এসে বসবাস করতে থাকেন। যখন আঠেরো বছর বয়স, তখন আট বছরের কন্যা কাশীমণির সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। তেইশ বছর বয়সে সরকারি পূর্তদপ্তরে চাকরি গ্রহণ করেন। এই কর্মসূত্রেই নানাস্থানে ঘুরতে ঘুরতে তিনি আসেন দানাপুরে। তারপর কর্মসূত্রে তিনি যখন রানীক্ষেতে আসেন, তখনই অপরিমেয় যোগীবিভূতির অধিকারী গুরু ‘ত্র্যাম্বক বাবা’র কৃপালাভ করেন।
দানাপুরে থাকার সময়ই শ্যামাচরণ লাহিড়ি যোগাচার্যের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। ‘কাশীর বাবা’ বা ‘যোগীরাজ’ নামেই তখন তাঁর পরিচিতি। নিরক্ষর সিপাই বৃন্দা ভকত যেমন তাঁর আশ্রয়ে এসে যোগসিদ্ধ মহাপুরুষে রূপান্তরিত হন, তেমনি আবদুল গফুর খাঁ নামের এক গরিব মুসলমান ভক্তও তাঁর কৃপা পেয়ে উন্নততর জীবনের অধিকারী হন। তাঁর অন্যতম শিষ্য আব্দুল গফুর খাঁ ছিলেন মুসলমান। লাহিড়ীমশাই বলতেন, ‘হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান কেউ ম্লেচ্ছ নয়। মনই ম্লেচ্ছ।’ একদিকে সাধারণ মানুষ এসে তাঁর পদপ্রান্তে উপস্থিত হতেন, অন্যদিকে কাশীর নৃপতি ইশ্বরী নারায়ণ সিংহের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও তাঁর করুণা প্রত্যাশী হয়ে ভিড় জমাতেন। ভারতের শ্রেষ্ঠ অধ্যাত্মকেন্দ্র কাশীধামের বুকে যোগীরাজের অলৌকিক লীলা ও মহিমা সর্বশ্রেণীর মানুষকেই আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করে।
চন্দ্রমোহন দে ডাক্তারি পাস করেছেন। মৃত ও জীবিতের পার্থক্য সম্পর্কে তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী। কিন্তু একদিন সেই ডাক্তার লাহিড়িমশাইয়ের দেহ পরীক্ষা করে একেবারে হতবাক। শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার কোন লক্ষণ নেই, হৃৎপিণ্ড নিশ্চল, দেহে প্রাণের কোনও লক্ষণ নেই—অথচ লাহিড়ি মশাই বেঁচে আছেন।
এরকম অসংখ্য লীলাকাহিনী তাঁর জীবন জুড়ে। সেই মহাজীবন শরীর ত্যাগ করেন ১৮৯৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর।